কারণ না-জানিয়ে এক মাস আটক: মুর্শিদাবাদের বাসিন্দাকে নিয়ে রাজ্যকে ভর্ৎসনা হাই কোর্টের

যা জানা জরুরি
- প্রতিবেদন: মুর্শিদাবাদের এক বাসিন্দাকে এক মাসের বেশি সময় আটক রেখেও তার কারণ লিখিতভাবে না-জানানোয় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কলকাতা হাই কোর্ট।
- বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য রাজ্যকে শনিবারের মধ্যে আটক-সংক্রান্ত স্মারক ওই ব্যক্তির আইনজীবীর হাতে দিতে বলেছেন।
- রানিনগর থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিককে দু’সপ্তাহে হলফনামা এবং মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপারকে দশ দিনের মধ্যে পৃথক প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রতিবেদন: মুর্শিদাবাদের এক বাসিন্দাকে এক মাসের বেশি সময় আটক রেখেও তার কারণ লিখিতভাবে না-জানানোয় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কলকাতা হাই কোর্ট। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য রাজ্যকে শনিবারের মধ্যে আটক-সংক্রান্ত স্মারক ওই ব্যক্তির আইনজীবীর হাতে দিতে বলেছেন। রানিনগর থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিককে দু’সপ্তাহে হলফনামা এবং মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপারকে দশ দিনের মধ্যে পৃথক প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
মামলাকারী সাহিদুল শেখ মুর্শিদাবাদের দুবাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। গত ৮ আগস্ট রানিনগর থানার পুলিশ তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর থেকে তিনি বিদেশি নাগরিক নিবন্ধন আধিকারিকের হেফাজতে রয়েছেন। সাহিদুলের স্ত্রী দেজিনা বিবি হাই কোর্টে অভিযোগ করেন, তাঁর স্বামীকে বাংলাদেশি সন্দেহে বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়েছে।
পরিবারের আইনজীবীর দাবি, সাহিদুল ভারতীয় নাগরিক। তাঁর নাম ২০২৬ সালের বিশেষ নিবিড় ভোটার-তালিকা সংশোধনের সময়ে যাচাই করে তালিকায় রাখা হয়েছে। তাঁর ভোটার পরিচয়পত্র, প্যান ও আধারও রয়েছে। আইনজীবীর বক্তব্য, নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকলে বিদেশি আইন অনুসারে প্রক্রিয়া চালানো যেতে পারে, কিন্তু কারণ না-জানিয়ে অনির্দিষ্টকাল আটক রাখা যায় না।
রাজ্যের আইনজীবী পাল্টা বলেন, সাহিদুল নিজেকে বাংলাদেশি নাগরিক বলে স্বীকার করেছিলেন এবং বহু বছর আগে ভারতে ঢুকে মৃত এক স্থানীয় বাসিন্দার ছেলে পরিচয়ে বিশ্বাসযোগ্য দেখতে ভারতীয় নথি সংগ্রহ করেন। ভোটার তালিকাতেও গোপনে নাম তুলেছেন বলে অভিযোগ। এই দাবির তদন্ত চলছে।
আদালত জানতে চায়, কথিত স্বীকারোক্তি পুলিশের সামনে দেওয়া, না বিদেশি নিবন্ধন আধিকারিকের সামনে—সেটিই যখন স্পষ্ট নয়, তখন আটক কত দিন চলবে। কোনও সরকারি নথি দেখতে আসল বলে মনে হওয়া এবং সেটি জাল প্রমাণিত হওয়া এক নয়। পরিচয়পত্রের বৈধতা নিয়ে সন্দেহ থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি-প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ও যাচাইপ্রক্রিয়াও তদন্ত করতে হবে।
আটকের স্মারক প্রকাশে সরকারি গোপনীয়তা আইনের যুক্তি দিয়েছিল রাজ্য। আদালত সেই আপত্তি মানেনি। বিচারপতির প্রশ্ন, একজন মানুষকে ৮ আগস্ট থেকে আটক রেখে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত তাঁর আইনজীবীকেও কারণ জানানো হবে না কেন। মামলাটি আবার ৮ অক্টোবর শুনবে আদালত।
১৯৭০ ও ’৮০-এর দশকে সীমান্ত পেরিয়ে বহু মানুষ এই অঞ্চলে এসেছেন—এই ঐতিহাসিক বাস্তবতার উল্লেখ করে বিচারপতি প্রশ্ন করেন, সবাইকে কি একইভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে আটক করা হবে? তবে এই পর্যবেক্ষণ কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতীয় নাগরিক ঘোষণা করে না। সাহিদুলের নাগরিকত্বও এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি।
বিশ্লেষণ: মামলার মূল প্রশ্ন সাহিদুল ভারতীয় না বাংলাদেশি—শুধু সেটি নয়। রাষ্ট্র কারও স্বাধীনতা কেড়ে নিলে তাকে দ্রুত কারণ জানাতে, আইনজীবীর সহায়তা নিতে দিতে এবং সিদ্ধান্তটি বিচারিক পরীক্ষার সামনে আনতে হয়। বৈধ পরিচয়পত্র সন্দেহজনক হলে তদন্ত চলবে; তদন্তের সুবিধার জন্য মৌলিক প্রক্রিয়াই তুলে দেওয়া যায় না।
ভোটার তালিকায় নাম থাকাও নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, আবার পুলিশের মৌখিক দাবিও বিদেশি পরিচয়ের প্রমাণ নয়। আগামী প্রতিবেদনে রাজ্যকে দেখাতে হবে কে আটক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোন তথ্যের ভিত্তিতে, কোন আইনে এবং মুক্তি বা পরবর্তী শুনানির নির্দিষ্ট ব্যবস্থা কী। সীমান্ত-জেলায় নিরাপত্তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ভারসাম্য অনুমানের বদলে নথি দিয়েই রক্ষা করতে হবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



