যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় রাজ্যের বলে মন্তব্য করেছে কলকাতা হাই কোর্ট। প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভিট্ঠলরাও ঘুগে ও বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেঞ্চ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নেওয়া পদক্ষেপ জানিয়ে হলফনামা দিতে বলেছে।

শুনানিটি ছাত্র ঋষভ সাহার আবেদনের ভিত্তিতে চলা একটি জনস্বার্থ মামলার অংশ। ২০২৫ সালে তিনি রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে নিরাপত্তা চেয়ে মামলা করেছিলেন। নতুন আবেদনে ১৯ ও ২০ আগস্টের মধ্যরাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাঙচুর ও বহিরাগত প্রবেশের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

আবেদনে বলা হয়েছে, বড় একটি দল ক্যাম্পাসে ঢুকে ছাত্রদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে, প্রশাসনিক ভবন অরবিন্দ ভবনে আগুন লাগানোর চেষ্টা করে এবং প্রধান ছাত্রাবাসের ফটক ক্ষতিগ্রস্ত করে। নিরাপত্তারক্ষীরা নীরব দর্শক ছিলেন বলেও অভিযোগ। এগুলি মামলাকারীর বক্তব্য; পুলিশি তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নয়।

যাদবপুরের বিধায়ক শর্ব্বরী মুখোপাধ্যায়ের কিছু মন্তব্যও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সারারাত ভাঙচল চলার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। বিধায়ক বা অন্য কোনও ব্যক্তির ফৌজদারি দায় এই শুনানিতে নির্ধারিত হয়নি। আদালতের লক্ষ্য আপাতত ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

বেঞ্চ রাজ্য ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে মামলাটিকে প্রতিপক্ষের লড়াই হিসেবে না-দেখে একসঙ্গে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, রাষ্ট্র নিজের দায়িত্ব পালন না-করলে আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। পরবর্তী শুনানি ৫ অক্টোবর।

একই মামলায় ২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আদালত বহিরাগত ও সমাজবিরোধীদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছিল। সুপারিশের মধ্যে অতিরিক্ত নজরদারি-ক্যামেরা, প্রাক্তন সেনাকর্মীকে নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে নিয়োগ, প্রতিটি প্রবেশপথে পরিচয় পরীক্ষা এবং ছুটির সময়ে অননুমোদিত প্রবেশ বন্ধ রাখা ছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যাদবপুর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে আদালতকে জানিয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস আবার সাধারণ সরকারি দপ্তর নয়। ছাত্র, গবেষক, প্রাক্তনী, অতিথি ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির জন্য তার একটি খোলা চরিত্র থাকে। অতিরিক্ত পুলিশি নিয়ন্ত্রণ শিক্ষার স্বাধীনতা ও প্রতিবাদকে সংকুচিত করতে পারে। তাই নিরাপত্তার নামে নির্বিচারে নজরদারি বা রাজনৈতিকভাবে বাছাই করে প্রবেশ আটকানোও গ্রহণযোগ্য নয়।

ক্যামেরা ও রক্ষী প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু নিরাপত্তার আসল পরীক্ষা ঘটনার সময়ে কার নির্দেশে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ ও উচ্চশিক্ষা দপ্তরের দায়িত্ব আলাদা করে লিখিত প্রটোকল না-থাকলে প্রত্যেকে পরে অন্যকে দায়ী করবে।

হলফনামায় শুধু ক্যামেরার সংখ্যা নয়, কতটি সচল, ফুটেজ কত দিন রাখা হয়, অভিযোগে কত সময়ে সাড়া দেওয়া হয় এবং আহত ছাত্রকে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা কী—তা থাকা উচিত। ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বসহ স্বাধীন নিরাপত্তা-পর্যালোচনা গড়ে তুললে ‘নিরাপদ ক্যাম্পাস’ এবং ‘মুক্ত ক্যাম্পাস’-এর কৃত্রিম বিরোধ কিছুটা এড়ানো সম্ভব।