আরব সাগরে ভারত-পাক যুদ্ধজাহাজে ধাক্কা, ক্ষতিগ্রস্ত ‘হুনাইন’

যা জানা জরুরি
- উত্তর আরব সাগরে ভারত ও পাকিস্তানের দুই যুদ্ধজাহাজের সংঘর্ষ ঘিরে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
- ভারতীয় সূত্রের বক্তব্য, ওমান উপসাগর থেকে প্রায় ১২০ নটিক্যাল মাইল, অর্থাৎ ২২২ কিলোমিটার দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় দুই জাহাজের ধাক্কা লাগে।
- এর প্রতিবাদে বুধবার নয়াদিল্লিতে পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে বিদেশ মন্ত্রক।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
উত্তর আরব সাগরে ভারত ও পাকিস্তানের দুই যুদ্ধজাহাজের সংঘর্ষ ঘিরে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ঘটনাটি ঘটে। ভারতীয় সূত্রের বক্তব্য, ওমান উপসাগর থেকে প্রায় ১২০ নটিক্যাল মাইল, অর্থাৎ ২২২ কিলোমিটার দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় দুই জাহাজের ধাক্কা লাগে। এর প্রতিবাদে বুধবার নয়াদিল্লিতে পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে বিদেশ মন্ত্রক। ইসলামাবাদও ভারতীয় কূটনীতিককে ডেকে পাল্টা প্রতিবাদ জানিয়েছে।
ভারতীয় সরকারি সূত্রকে উদ্ধৃত করে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, পাকিস্তানি জাহাজটির নাম পিএনএস হুনাইন। সংঘর্ষে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নিজের বন্দরের দিকে ফিরে যায়। অন্যদিকে, ভারতীয় যুদ্ধজাহাজের কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি; সেটি নির্ধারিত নজরদারির কাজ চালিয়ে যায়। ভারতের জাহাজটির নাম প্রকাশ করা হয়নি। ভারতীয় সূত্রের অভিযোগ, হুনাইন দ্রুত গতিতে কাছে এসে নিরাপদে এবং সময়মতো গতিপথ বদলাতে পারেনি। তার ফলেই ধাক্কা লাগে।
বিদেশ মন্ত্রক পাকিস্তানের নৌবাহিনীর আচরণকে অগ্রহণযোগ্য এবং পেশাদারিত্বের পরিপন্থী বলে বর্ণনা করেছে। মন্ত্রকের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলেও ঘটনাটিকে হালকা করে দেখছে না ভারত। পাকিস্তানি কূটনীতিককে ভারতের আপত্তির কথা জানিয়ে বলা হয়েছে, সমুদ্রে দায়িত্ব পালনকারী সামরিক জাহাজগুলির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা এবং স্বাক্ষরিত চুক্তির প্রতি সম্মান প্রত্যাশিত। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই বার্তা পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে।
দিল্লির অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৯১ সালের এপ্রিলে স্বাক্ষরিত ভারত-পাকিস্তান চুক্তির দশম অনুচ্ছেদ। সামরিক মহড়া, বাহিনীর চলাচল এবং সেনা সমাবেশ সম্পর্কে আগাম তথ্য আদানপ্রদানের এই চুক্তিতে সমুদ্রে দুর্ঘটনা ঠেকানোর নির্দিষ্ট বিধানও রয়েছে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলের সময় দুই দেশের যুদ্ধজাহাজ ও ডুবোজাহাজকে পরস্পরের থেকে অন্তত তিন নটিক্যাল মাইল দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কিলোমিটারের হিসাবে এই ব্যবধান প্রায় সাড়ে পাঁচ।
১৯৯১ সালের ৬ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে স্বাক্ষরিত চুক্তিটির উদ্দেশ্য ছিল, এক দেশের সামরিক তৎপরতাকে অন্য দেশ ভুল বুঝে যাতে সঙ্কট তৈরি না করে। বড় মহড়ার ধরন, এলাকা ও সময়কাল সম্পর্কে আগাম জানানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়। ফলে বিষয়টি শুধু দুটি জাহাজের গায়ে ধাক্কা লাগার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্ঘটনা ও ভুল বোঝাবুঝি ঠেকাতে তৈরি পারস্পরিক সুরক্ষাব্যবস্থা কার্যক্ষেত্রে কতটা মানা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
চুক্তিতে বড় নৌমহড়ার সংজ্ঞাও দেওয়া আছে। ডেস্ট্রয়ার বা ফ্রিগেটের সমান কিংবা তার চেয়ে বড় অন্তত ছয়টি জাহাজ একসঙ্গে মহড়া চালিয়ে অন্য দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ঢুকলে এই বিধান প্রযোজ্য হয়। পাশাপাশি, বাহিনী জমায়েত, মহড়ার বিস্তার, অভিমুখ এবং স্থায়িত্ব নিয়ে অন্য পক্ষের কাছে সময়মতো ব্যাখ্যা চাওয়ার অধিকারও রয়েছে। অর্থাৎ সামরিক তৎপরতা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা কমানোর জন্য একাধিক পথ চুক্তিতে খোলা রাখা হয়েছে।
পাকিস্তান অবশ্য এই সংঘর্ষ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিবরণ দিয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের দাবি, তাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নৌমহড়া চলার সময় ঘটনাটি ঘটে। ভারতীয় জাহাজই বিপজ্জনকভাবে কাছে এসে আক্রমণাত্মক আচরণ করেছে বলে অভিযোগ ইসলামাবাদের। পাকিস্তানও আন্তর্জাতিক আইন এবং ১৯৯১ সালের চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। ভারতীয় কূটনীতিককে তলব করে ঘটনাটিকে অত্যন্ত উসকানিমূলক ও অগ্রহণযোগ্য বলে জানানো হয়েছে। অতএব, সংঘর্ষের দায় নিয়ে দুই সরকারের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।
নয়াদিল্লির প্রতিবাদ শুধু পাকিস্তানি দূতকে তলব করার মধ্যেই সীমিত থাকছে না। ইসলামাবাদে ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকেও পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকে একই প্রতিবাদ জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক সম্পর্কের স্তর নামিয়ে আনার পর থেকে দুই রাজধানীতেই হাইকমিশনের নেতৃত্বে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধানেরা। সেই ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই এ বার সমুদ্রের সংঘর্ষ নিয়ে অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ আদানপ্রদান হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পাকিস্তানি জাহাজ হুনাইন সমুদ্রে টহল দেওয়ার উপযোগী একটি আধুনিক নৌযান। নির্মাতা ডামেনের তথ্য অনুযায়ী, রোমানিয়ার গালাতি জাহাজ নির্মাণকেন্দ্রে এটি তৈরি হয়। ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জাহাজটিকে জলে নামানো হয়েছিল। পাকিস্তানের জন্য ডামেনের তৈরি টহলজাহাজগুলির ধারাবাহিকতায় হুনাইন এসেছে; এর আগে ২০২০ সালে ইয়ারমুক ও তাবুক সরবরাহ করেছিল সংস্থাটি। ফলে এটি পাকিস্তানের নৌবহরের তুলনামূলক নতুন সংযোজন।
ভারত-পাকিস্তানের নৌজাহাজ বিপজ্জনকভাবে কাছাকাছি চলে আসার নজির আগেও রয়েছে। ২০১১ সালের ১৬ জুন এডেন উপসাগরে পাকিস্তানের পিএনএস বাবর ভারতের আইএনএস গোদাবরীর গা ঘেঁষে চলে যায়। ভারতীয় জাহাজের হেলিকপ্টার ব্যবহারের জায়গার নিরাপত্তাজাল সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখনও ভারত আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছিল। পাকিস্তান হাইকমিশনের নৌবিষয়ক উপদেষ্টাকে তলব করা হয় এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি সংসদে বিষয়টি নিয়ে বিবৃতি দেন।
বর্তমান ঘটনাটির বাড়তি গুরুত্ব রয়েছে দুই দেশের সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার কারণে। গত বছর ভারত-পাকিস্তানের চার দিনের সংঘর্ষ বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছিল; পরে যুদ্ধবিরতি হয়। সেই পটভূমিতে সমুদ্রে এমন একটি ঘটনা দ্রুত রাজনৈতিক তাৎপর্য পেয়ে যায়। যুদ্ধজাহাজের গতিপথ নিয়ে ভুল হিসাব কিংবা বিপক্ষের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভুল ধারণা যাতে নতুন সংঘাতে গড়ায় না, তার জন্যই পারস্পরিক দূরত্ব ও যোগাযোগের বিধান জরুরি।
ঘটনাস্থলের সুনির্দিষ্ট অবস্থান দুই সরকারের কেউই প্রকাশ করেনি। ফলে প্রকাশিত বিবরণ থেকে জাহাজ দুটির চলার পথ পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। পাকিস্তানি জাহাজের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত পরীক্ষার ফলও সামনে নেই। ভারতীয় সূত্রের দেওয়া প্রাথমিক বিবরণ এবং চূড়ান্ত অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত তাই আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
তবে এখনও পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে এই ধাক্কাকে পরিকল্পিত সামরিক আক্রমণ বলে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নয়াদিল্লির আধিকারিকেরা ঘটনাটিকে নিরাপত্তাবিধি ও নির্ধারিত দূরত্ব লঙ্ঘনের গুরুতর দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। আপাতত মূল প্রশ্ন, দুটি জাহাজ এত কাছে এল কীভাবে এবং ভবিষ্যতে সেই পরিস্থিতি এড়াতে দুই নৌবাহিনী কী ব্যবস্থা নেবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



