উপিআইয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঙ্কের কেনাকাটায় মাশুল বসানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে সরব হল বিরোধীরা। তাদের অভিযোগ, মার্কিন চাপের কাছে নতিস্বীকার করে এই পদক্ষেপ করেছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। কেন্দ্র অবশ্য সেই অভিযোগ উড়িয়ে জানিয়েছে, ভারতের লেনদেননীতি স্বাধীনভাবেই নির্ধারিত হয়। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে দু’হাজার টাকার বেশি ব্যবসায়িক ইউপিআই লেনদেনে ০.৪ শতাংশ হারে মাশুল চালু হওয়ার কথা।

বুধবার লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে আত্মসমর্পণ করেছেন মোদী। নতুন মাশুলকে ‘ইউপিআই কর’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি। রাহুলের বক্তব্য, দেশের আর্থিক লেনদেনের পরিকাঠামো রক্ষার খরচ সরকারের বহন করা উচিত; সেই দায় মানুষের ঘাড়ে চাপানো অনুচিত।

কংগ্রেসের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন স্বার্থরক্ষার প্রশ্ন। রাহুলের দাবি, নতুন ব্যবস্থায় ভারতীয়দের উপর আর্থিক বোঝা চাপবে এবং বিপুল অর্থ আমেরিকায় যাবে। দলের নেতারা মাশুল চালুর সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তবে মার্কিন চাপেই এই সিদ্ধান্ত হয়েছে, এমন প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি; এটি বিরোধীদের রাজনৈতিক অভিযোগ, যা কেন্দ্র নাকচ করেছে।

অর্থ মন্ত্রক জানিয়েছে, বিদেশি প্রভাবের দাবি অসত্য। সবার নাগালের মধ্যে থাকা, সাশ্রয়ী এবং নিজের খরচ নিজে বহনে সক্ষম একটি লেনদেনব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের উদ্দেশ্য। মন্ত্রকের ব্যাখ্যায়, গ্রাহকদের জন্য ইউপিআই বিনামূল্যেই থাকছে। বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়কে টাকা পাঠানোয় কোনও মাশুল নেই; দোকানে মূল্য মেটানোর সময়ও ক্রেতাকে আলাদা মাশুল দিতে হবে না।

নতুন মাশুলের পোশাকি নাম ‘মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট’, সংক্ষেপে এমডিআর। এটি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে আদায় করা হবে। নির্ধারিত ছাড়ের বাইরে থাকা কোনও ব্যবসায়ী ইউপিআইয়ে দশ হাজার টাকা পেলে ০.৪ শতাংশ হিসাবে মাশুল হবে চল্লিশ টাকা। অর্থাৎ ব্যবসায়ীর প্রাপ্য থেকে পরিষেবার খরচ কাটা হবে; ক্রেতার হিসাব থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অতিরিক্ত চল্লিশ টাকা কাটার নিয়ম হচ্ছে না। বিরোধীরা ‘কর’ বললেও এটি মূলত অর্থপ্রদান পরিষেবার মাশুল। তাই সরকারি রাজস্ব হিসেবে গোটা লেনদেনের উপর কর বসানো এবং এমডিআর আদায়কে একই বিষয় বলা ঠিক হবে না।

ছোট ব্যবসায়ীদের সুরক্ষার কথাও জানিয়েছে সরকার। ইউপিআইয়ের মাধ্যমে মাসে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থ গ্রহণকারী ছোট বিক্রেতারা মাশুলমুক্ত থাকবেন। দু’হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যবসায়িক লেনদেনেও মাশুল লাগবে না। অর্থ মন্ত্রকের হিসাবে, ব্যবসায়ীদের পাওয়া ইউপিআই লেনদেনের ৯৫ শতাংশের বেশি এই সীমার নীচে। ফলে সংখ্যার বিচারে অধিকাংশ দৈনন্দিন লেনদেন নতুন মাশুলের বাইরে থাকছে।

কিন্তু ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির আশঙ্কা, উৎসবের মরসুমে এই বাড়তি খরচ নগদ লেনদেনে ফেরার প্রবণতা বাড়াতে পারে। রিটেলার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার আপত্তি, মাসে এক লক্ষ টাকা আদায়ের সীমা অনেক ছোট ব্যবসার বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বছরে তার পরিমাণ মাত্র বারো লক্ষ টাকা। এই সীমা বাড়ানোর দাবি তুলেছে সংগঠনটি।

ক্রেতার উপর শেষ পর্যন্ত খরচ চাপবে কি না, সেটিই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিরোধীদের আশঙ্কা, দোকানদার পণ্যের দামের সঙ্গে মাশুলের খরচ যোগ করলে পরোক্ষে ক্রেতাকেই তা বইতে হবে। অর্থ মন্ত্রক জানিয়েছে, ব্যবসায়ীরা যাতে এই মাশুল গ্রাহকদের উপর চাপাতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে ব্যাঙ্কগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইউপিআইয়ের অ্যাপগুলিও আলাদা পরিষেবা মাশুল নিতে পারবে না।

বিতর্কের মধ্যেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ ইউপিআইয়ের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন। সরকারের যুক্তি, বিপুল সংখ্যায় লেনদেন সামলাতে পরিকাঠামো ও নিরাপত্তায় বিনিয়োগ প্রয়োজন। উচ্চমূল্যের ব্যবসায়িক লেনদেন থেকে পাওয়া অর্থ সেই কাজে এবং ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলে ইউপিআই পরিষেবার প্রসারে ব্যয় করা হবে।

সরকারি সূত্র অবশ্য জানিয়েছে, সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নেই। ফলে একদিকে আর্থিকভাবে টেকসই পরিষেবার পক্ষে কেন্দ্রের সওয়াল, অন্যদিকে ব্যবসা ও সংসারের খরচ বাড়ার আশঙ্কা—এই দুই প্রশ্নেই ইউপিআই মাশুল নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।