তৃণমূল কংগ্রেসের নাম, জোড়াফুল প্রতীক এবং সাংগঠনিক কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধে দুই শিবিরের বক্তব্য শুনল নির্বাচন কমিশন। শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, দিল্লিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিনিধিরা নিজেদের দাবি পেশ করেন। শুনানির পরে ঋতব্রত নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে আরও নথি চেয়েছে কমিশন। তবে কোন পক্ষ দলের নাম ও প্রতীক ব্যবহারের অধিকার পাবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়নি।

বৈঠকের পরে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত জানান, কমিশন একাধিক প্রশ্ন তুলেছিল। তাঁরা সেগুলির জবাব দিয়েছেন এবং কিছু নথি দেখিয়েছেন। কমিশন সেই নথিগুলি জমা দিতে বলেছে। শুনানি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি দাবি করেন, তাঁদের গোষ্ঠীই তৃণমূল হিসেবে স্বীকৃতি পাবে বলে তাঁরা আশাবাদী। অতিরিক্ত নথি চাওয়াকে অবশ্য কোনও পক্ষের দাবির স্বীকৃতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বিরোধ নিষ্পত্তির তাগিদ বাড়িয়েছে আসন্ন উপনির্বাচন। আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা আসনে ভোট; মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন ১৬ সেপ্টেম্বর। ইকনমিক টাইমসের খবর অনুযায়ী, ওই সময়সীমার আগেই প্রতীক সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আবেদন জানিয়েছে ঋতব্রত শিবির। কমিশন অবশ্য সেই সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে, এমন কথা ঋতব্রত জানাননি।

মমতা শিবিরের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলে ছিলেন ডেরেক ও’ব্রায়েন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সাগরিকা ঘোষ, সাকেত গোখলে এবং আইনজীবী অভিনব সিংহ। তাঁদের বক্তব্য, বিদ্রোহীদের দাবির ভিত্তিই গ্রহণযোগ্য নয়। মমতার অনুমোদিত প্রার্থী হিসেবে দলীয় প্রতীকে বিধানসভা নির্বাচনে লড়ার পর এখন তাঁর নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন এই বিধায়কেরা। মমতা শিবিরের দাবি, তাঁদের প্রত্যেককে নির্বাচনী খরচ বাবদ দল থেকে ২৫ লক্ষ টাকাও দেওয়া হয়েছিল।

বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে দলের সাংগঠনিক কমিটির মেয়াদ। নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ২২ জুন বিদ্রোহী নেতাদের বৈঠকে অরূপ রায়কে সভাপতি করে নতুন জাতীয় কার্যকরী কমিটি ঘোষণা করেন ঋতব্রত। তাঁর যুক্তি, দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ওই কমিটির মেয়াদ তিন বছর। ফলে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত কমিটির মেয়াদ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতেই শেষ হয়েছে। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই বিকল্প কমিটি গঠনের বৈধতা দাবি করে বিদ্রোহী পক্ষ।

মমতা শিবিরের পাল্টা বক্তব্য, বিদ্রোহীরা পুরনো বিধান উদ্ধৃত করছেন। সাংগঠনিক কমিটির মেয়াদ ২০০০ সালে তিন থেকে চার বছর এবং ২০০৬ সালে পাঁচ বছর করা হয়েছিল। সংশোধনগুলির কথা কমিশনকেও জানানো হয়। তাদের দাবি, ২০২২ সালে নির্বাচিত নেতৃত্বের মেয়াদ তাই ২০২৭ পর্যন্ত রয়েছে। কমিশনের ওয়েবসাইটে থাকা গঠনতন্ত্রের সংস্করণ এবং চলতি বছরে জমা দেওয়া সংস্করণেও পাঁচ বছরের বিধান রয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।

বিদ্রোহীদের কমিটি গঠনের পদ্ধতিও প্রশ্নের মুখে। মমতা শিবিরের অভিযোগ, ব্লক থেকে জেলা, রাজ্য এবং সর্বভারতীয় স্তরে কমিটি গঠনের নির্ধারিত ধাপ অনুসরণ করা হয়নি। সদস্যদের প্রয়োজনীয় বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়নি। ঋতব্রত পক্ষ অবশ্য দাবি করেছে, জুনের বৈঠক গঠনতন্ত্র মেনেই হয়েছে। ফলে উভয় পক্ষের লড়াই সাংগঠনিক বিধান ও তার প্রয়োগের ব্যাখ্যাতেও।

এদিকে অন্তর্বর্তী নির্দেশের সম্ভাবনা ঘিরেও চাপানউতোর চলছে। কল্যাণ জানিয়েছেন, কমিশন এমন নির্দেশ দিতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছিল; তাঁরা তার বিরোধিতা করেছেন। ন্যাশনাল হেরাল্ডের প্রতিবেদনে সাময়িকভাবে জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে সেটি সম্ভাবনামাত্র, ঘোষিত সিদ্ধান্ত নয়।

শুনানির পাশাপাশি নন্দীগ্রাম নিয়ে রাজনৈতিক বার্তাও দিয়েছেন ঋতব্রত। মমতা সেখানে নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়তে চাইলে তাঁর সমর্থনে নিজেদের প্রার্থী প্রত্যাহারের কথা বলেছেন তিনি। অন্যদিকে মমতা শিবির দুই আসনেই লড়ার কথা জানিয়েছে। ফলে মনোনয়নের সময়সীমা এগিয়ে আসার সঙ্গে দলের পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তা নির্বাচনী প্রস্তুতির সরাসরি প্রশ্ন হয়ে উঠছে। দুই শিবিরের বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, উপনির্বাচনে কে কোন পরিচয়ে ভোট চাইবে, সেই প্রশ্নের মীমাংসাই এখন তাদের কাছে সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।