সুপ্রিম কোর্টে আগাম জামিনের আবেদন খারিজ হওয়ার পরই শালবনির সরকারি জমি দখল ও বেআইনি বিক্রির মামলায় গ্রেফতার হলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সহায়ক সুমিত রায়। বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, তৃণমূল সাংসদের কালীঘাটের বাসভবন থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি। অভিযানে ছিল পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্সও। শীর্ষ আদালতের অন্তর্বর্তী সুরক্ষা উঠে যাওয়ায় সুমিতকে গ্রেফতারের পথে বাধা দূর হয়।

সুমিতের গতিবিধির উপর কয়েক দিন ধরেই নজর রাখছিলেন ছদ্মবেশী তদন্তকারীরা। বৃহস্পতিবার সকালে তিনি অভিষেকের বাড়িতে গিয়েছিলেন বলে খবর পায় সিআইডি। আদালতের সিদ্ধান্তের পরে বাড়ির আশপাশের গলি এবং প্রবেশপথে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সঙ্গে ছিলেন অভিযানের ভিডিওগ্রাফা। মহিলা পুলিশকর্মীদের নিয়ে তদন্তকারীরা ভিতরে ঢোকেন। গ্রেফতারের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর পরে সুমিতকে বাইরে এনে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ কলকাতা হাই কোর্টের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে রাজি হয়নি। গত ৩ অগস্ট হাই কোর্ট সুমিতের আগাম জামিনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিল। তার পরেই তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। একাধিক মামলায় সিআইডির সামনে তিনি মোট ১১ বার হাজির হয়েছিলেন এবং প্রায় ৮৮ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এর মধ্যে শালবনির মামলাতেই তাঁকে ডাকা হয়েছিল নয় বার।

গত ৬ অগস্ট সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে গ্রেফতার এবং অন্য কঠোর পদক্ষেপ থেকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিয়েছিল। সেই সুরক্ষার মেয়াদে তদন্তকারীরা তাঁকে একাধিকবার ডেকে পাঠান। বৃহস্পতিবার সুরক্ষা প্রত্যাহারের পরে গ্রেফতারি কার্যকর হয়। ইকনমিক টাইমস জানিয়েছে, সুমিতকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁকে ভবানী ভবনে এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন তদন্তকারীরা। শুক্রবার তাঁকে আদালতে হাজির করানোর কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা।

মামলার কেন্দ্রে রয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনিতে সরকারি জমিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দেখিয়ে বিক্রির অভিযোগ। তদন্তকারীদের দাবি, জমির শ্রেণি বদল, মালিকানার জাল দলিল তৈরি এবং ভুয়ো বিক্রয়চুক্তির মাধ্যমে এই লেনদেন চালানো হয়েছিল। সরকারি জমি ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। ফলে তদন্তে জমির নথির পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে টাকা কোথা থেকে এসেছে, কার হিসাবে জমা পড়েছে এবং পরে কোথায় গিয়েছে, সেই প্রশ্ন। এই মামলায় প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, জালিয়াতি, জাল নথি ব্যবহার এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীরা জমি বিক্রির সঙ্গে যুক্ত অন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং লেনদেনের পরিমাণও খতিয়ে দেখছেন বলে জানা গিয়েছে।

আগাম জামিনের বিরোধিতা করে রাজ্যের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, তদন্তের প্রয়োজনে সুমিতকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি। রাজ্যের অভিযোগ, তিনি হাজিরা দিলেও তদন্তকারীদের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দেননি। তাঁর ব্যাঙ্ক হিসাবে বিপুল নগদ জমার বিষয়টিও আদালতে তোলা হয়। রাজ্যের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫ কোটি টাকার নগদ জমার তথ্য পাওয়া গিয়েছে; প্রায় ৭১ লক্ষ টাকার একটি লেনদেনও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সুমিতের আইনজীবীরা অবশ্য অসহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, তিনি বারবার তদন্তকারীদের সামনে হাজির হয়েছেন এবং জিজ্ঞাসাবাদে সহযোগিতা করেছেন। সেই জিজ্ঞাসাবাদের দৃশ্যও ধারণ করা হয়েছে। ফলে কেবল অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে তাঁকে হেফাজতে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। শুনানিতে দুই পক্ষের বিরোধের প্রধান জায়গা ছিল, এতবার জিজ্ঞাসাবাদের পরেও গ্রেফতার করে নতুন কী তথ্য পাওয়া প্রয়োজন।

এই মামলার সূত্রপাতের পিছনে রয়েছে বাড়ি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে টাকা নেওয়ার অভিযোগ। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের জুন মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইমরান নামে এক অভিযোগকারী দাবি করেছিলেন, ২০২১ সালে সুজয় হাজরা তাঁর কাছ থেকে দশ লক্ষ টাকা নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিশ্রুত সম্পত্তি কিংবা টাকা ফেরত পাননি তিনি। পরবর্তী অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট জমি সরকারি বলে সামনে আসে। সুজয়কে জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে সুমিতের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে বলে পুলিশের দাবি।

সুমিতকে ধরতে অভিষেকের বাড়িতে পুলিশের যাওয়ার ঘটনা অবশ্য এই প্রথম নয়। জুন মাসেও সেখানে অভিযান হয়েছিল। তখন তাঁকে পাওয়া যায়নি। এর পরে ১৫ জুন পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। একই সময়ে তাঁর আইনজীবীরা আগাম জামিনের জন্য হাই কোর্টে আবেদন করেন। সেই আইনি লড়াই হাই কোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল। বৃহস্পতিবারের গ্রেফতারি সেই ধারাবাহিকতারই পরবর্তী ঘটনা।

গ্রেফতারের প্রতিক্রিয়া পৌঁছয় বিধানসভাতেও। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সুমিতের গ্রেফতারির কথা ঘোষণা করে অভিষেককে আক্রমণ করেন এবং সুমিতের বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ তোলেন। অন্যদিকে, প্রবীণ তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় দাবি করেন, সুমিত তাঁদের দলের সদস্য নন এবং কখনও ছিলেন না। রাজনৈতিক বক্তব্যের এই পাল্টাপাল্টির মধ্যেই তদন্তকারীদের সামনে রয়েছে জমির নথি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ প্রমাণ করার দায়িত্ব।

অভিযানের সময়ে অভিষেক চিকিৎসার জন্য বিদেশে ছিলেন বলে ইকনমিক টাইমস জানিয়েছে। তাঁর সহায়কের গ্রেফতারি স্বাভাবিকভাবেই ঘটনাটিকে রাজনৈতিক গুরুত্ব দিয়েছে। তবে ব্যক্তিগত সহায়কের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং সাংসদের নিজের দায় এক বিষয় নয়। কার কী ভূমিকা ছিল, তা নির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই স্থির করতে হবে। একইভাবে ব্যাঙ্ক হিসাবে টাকা জমা পড়ার তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের সম্পর্কও তদন্তে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

এখন নজর মেদিনীপুর আদালতে পরবর্তী শুনানির দিকে। সিআইডি সুমিতকে নিজেদের হেফাজতে চাইবে বলে তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে। হেফাজতের আবেদন বিবেচনার সময়ে তদন্তের প্রয়োজন এবং অভিযুক্তের বক্তব্য আদালতের সামনে আসবে। আগাম জামিন খারিজ হওয়া অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমার্থক নয়। সরকারি জমি বিক্রির অভিযোগ, অর্থের উৎস এবং অভিযুক্তদের ভূমিকা শেষ পর্যন্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বিচার্য হবে।