ছাত্রদের প্রতিবাদে অংশ নেওয়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ থাকার পরেও এক পড়ুয়াকে নোটিস পাঠানোয় গ্রেটার নয়ডা প্রশাসনের ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। বুধবার বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হলে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এমন নোটিস জারির সাহস হল কী করে? সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে বলেও জানান তিনি। ফের সামনে এল ছাত্রদের প্রতিবাদের অধিকার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন।

ঘটনার কেন্দ্রে গৌতম বুদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র অক্ষত ত্রিপাঠী। ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির আন্দোলন ঘিরে তাঁকে ৪ সেপ্টেম্বর নোটিস দেওয়া হয়েছিল। আদালতকে জানানো হয়, পরদিনই সেটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু নোটিস তুলে নেওয়ার তথ্যেও বিষয়টি শেষ হয়ে যায়নি। শীর্ষ আদালতের নির্দেশের পরে কেন এই পদক্ষেপ করা হয়েছিল, প্রধান বিচারপতির প্রতিক্রিয়ায় সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।

ত্রিপাঠী এসএফআইয়ের উত্তরপ্রদেশ রাজ্য কমিটির সদস্য। গৌতম বুদ্ধ নগর কমিশনারেটের গ্রেটার নয়ডার তৃতীয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নোটিসে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১২৬ ও ১৩৫ ধারার উল্লেখ ছিল। পাঁচ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত মুচলেকা এবং সমপরিমাণের দুই জামিনদারের শর্ত কেন তাঁর উপর আরোপ করা হবে না, তার কারণ জানাতে বলা হয়। অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীদের সিজেপির প্রস্তাবিত ধর্নায় যোগ দিতে তিনি উসকানি দিচ্ছিলেন।

প্রবীণ আইনজীবী বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বিষয়টি প্রধান বিচারপতির সামনে তোলেন। তাঁর অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টের ১ সেপ্টেম্বরের নির্দেশের পরেও ছাত্রদের নিয়ে এমন ‘পরীক্ষানিরীক্ষা’ চলছে। তিনি আদালত অবমাননার প্রশ্ন তুলে হস্তক্ষেপ চান। প্রধান বিচারপতি জানান, গৌতম বুদ্ধ নগরের জেলাশাসক এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার জন্য ছাত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার নির্দেশ পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও এমন নোটিস কীভাবে দেওয়া হল?

এই বিতর্কের পটভূমিতে রয়েছে জুলাইয়ের ছাত্রবিক্ষোভ এবং তা ঘিরে দায়ের হওয়া মামলাগুলি। ১ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সিজেপির আন্দোলনসংক্রান্ত বহু প্রাথমিক অভিযোগপত্র বাতিল করে। এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৫ জুলাইয়ের বিক্ষোভের সূত্রে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ছাত্রদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলি বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই আন্দোলনসংক্রান্ত ঘটনায় নতুন করে মামলা না করার আশ্বাসও আদালতে দেওয়া হয়েছিল।

তবে এই সুরক্ষার পরিধি বুঝতে একটি পার্থক্য জরুরি। ওই নির্দেশকে ভবিষ্যতের সমস্ত আন্দোলন বা সব ধরনের অভিযোগ থেকে নির্বিচার ছাড় হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। সংশ্লিষ্ট জুলাইয়ের বিক্ষোভ এবং তার সঙ্গে যুক্ত মামলাই ছিল বিচার্য বিষয়। গুরুতর অপরাধের পূর্বইতিহাস থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছিল। ফলে ছাত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে আদালতের আপত্তিকে নির্দিষ্ট মামলার প্রেক্ষাপটেই দেখতে হবে।

মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগে কেন্দ্র এবং কয়েকটি রাজ্যও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানিয়েছিলেন, দিল্লি পুলিশ এবং বিহার, অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও মহারাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট আবেদন করেছে। সাংবিধানিক বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে মামলাগুলির নিষ্পত্তির আবেদন জানানো হয়। এই পদক্ষেপের তাৎপর্য ছিল, দীর্ঘ আইনি অনিশ্চয়তা থেকে আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের বের করে আনার জন্য সরকার ও আদালতের স্তরে একটি সমাধানের পথ তৈরি হওয়া।

সেই পরিস্থিতিতেই ৫ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে প্রস্তাবিত মিছিলের ডাক প্রত্যাহার করে সিজেপি। সংগঠনের প্রতিনিধি সৌরভ দাস কেন্দ্রের আশ্বাস এবং আদালতের হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ, মামলা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের সরাসরি সম্পর্ক ছিল। সেই সমঝোতার আবহে একজন ছাত্রকে নতুন নোটিস দেওয়ার খবর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার প্রশ্নটিকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

প্রতিবাদের অধিকারের সাংবিধানিক ভিত্তিও এখানে প্রাসঙ্গিক। সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদ নাগরিককে মতপ্রকাশ এবং নিরস্ত্র অবস্থায় শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার দেয়। একই সঙ্গে জনশৃঙ্খলা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার স্বার্থে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের সুযোগ রয়েছে। তাই শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং জনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রশাসনিক দায়িত্ব, দুটিকেই আইনের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বিচার করতে হয়। কোনও প্রতিবাদের রাজনৈতিক বক্তব্য অপছন্দ হওয়া এবং আইনসিদ্ধ ব্যবস্থা নেওয়ার ভিত্তি থাকা এক বিষয় নয়। এই কাঠামোয় প্রশাসনিক পদক্ষেপের আইনগত ভিত্তি যাচাই জরুরি। শুধু আন্দোলনে উপস্থিত থাকার তথ্য দিয়ে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা সম্পর্কে সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না।

মুচলেকার মতো শর্তের ব্যবহার নিয়েও ঘটনাটি একটি বাস্তব প্রশ্ন তোলে। বিশ্লেষণের দিক থেকে দেখলে, একজন পড়ুয়ার সামনে বিপুল অঙ্কের আর্থিক দায় এবং জামিনদার জোগাড়ের সম্ভাব্য বাধা তৈরি হওয়া তাঁর আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের উদ্বেগ, পড়াশোনার ক্ষতি এবং আইনি সহায়তার খরচও বিবেচনায় আসে। ফলে প্রশাসনিক নোটিসের প্রভাব তার কাগুজে ভাষার চেয়ে অনেক বড় হতে পারে।

তবে পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছে বা ছাত্রকে ওই টাকা জমা দিতেই হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ভুল হবে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এটি ছিল প্রস্তাবিত মুচলেকা সম্পর্কে কারণ দর্শানোর নোটিস। আবার আইনজীবীর আদালত অবমাননার অভিযোগও আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়। প্রশাসনের ব্যাখ্যা চাওয়ার ঘোষণাকে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের দোষী সাব্যস্ত করা বা তাঁদের শাস্তির নির্দেশ হিসেবে বর্ণনা করারও অবকাশ নেই।

ঘটনাটির বৃহত্তর তাৎপর্য এখানেই: আদালতে আশ্বাস দেওয়া এবং স্থানীয় প্রশাসনের কাজে তার প্রতিফলন ঘটার মধ্যে কোনও ফাঁক থাকলে, তার দায় নির্ধারণ প্রয়োজন। নোটিস প্রত্যাহার ছাত্রটির তাৎক্ষণিক সমস্যা মেটাতে সাহায্য করলেও কেন সেটি দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্তাদের ব্যাখ্যাতেই বোঝা যাবে, নির্দেশ বোঝা বা কার্যকর করার ক্ষেত্রে কোথায় বিচ্যুতি ঘটেছে। ছাত্রদের অধিকাররক্ষার প্রতিশ্রুতি কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটিই এখন এই বিতর্কের কেন্দ্রীয় বিষয়।