১৮ শতরানের চূড়ায় স্মৃতি: মিতালিকে পেরিয়ে ভারতীয় ব্যাটিংয়ের নতুন ইতিহাস

যা জানা জরুরি
- হংকংয়ের বিরুদ্ধে ২০২৬ মহিলা এশিয়া কাপের ম্যাচটি স্মৃতি মন্ধানার ক্রিকেটজীবনে নিছক আর একটি শতরানের দিন হয়ে থাকল না।
- দুবাইয়ে ৬৪ বলে ১২৪ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে ভারতীয় সহ-অধিনায়ক একই সঙ্গে একাধিক বিশ্বরেকর্ড নিজের নামে লিখিয়ে নিলেন।
- আন্তর্জাতিক মহিলা ক্রিকেটে সর্বাধিক রানের মালিক হওয়ার পথে তিনি পেরিয়ে গেলেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক মিতালি রাজকে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
হংকংয়ের বিরুদ্ধে ২০২৬ মহিলা এশিয়া কাপের ম্যাচটি স্মৃতি মন্ধানার ক্রিকেটজীবনে নিছক আর একটি শতরানের দিন হয়ে থাকল না। দুবাইয়ে ৬৪ বলে ১২৪ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে ভারতীয় সহ-অধিনায়ক একই সঙ্গে একাধিক বিশ্বরেকর্ড নিজের নামে লিখিয়ে নিলেন। আন্তর্জাতিক মহিলা ক্রিকেটে সর্বাধিক রানের মালিক হওয়ার পথে তিনি পেরিয়ে গেলেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক মিতালি রাজকে। পাশাপাশি ১৮তম আন্তর্জাতিক শতরান করে টপকে গেলেন অস্ট্রেলিয়ার মেগ ল্যানিং ও দক্ষিণ আফ্রিকার লরা উলভার্টকে। দু’জনেরই শতরানের সংখ্যা ছিল ১৭।
হংকংয়ের বিরুদ্ধে নামার আগে মিতালির ১০,৮৬৮ আন্তর্জাতিক রান অতিক্রম করতে স্মৃতির প্রয়োজন ছিল ১১৩ রান। বাঁহাতি ওপেনার থামলেন ১২৪ রানে। তাঁর ৬৪ বলের ইনিংসে ছিল ১৪টি চার ও সাতটি ছক্কা; স্ট্রাইক রেট ১৯৩.৭৫। ইনিংসের শেষে তিন ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মিলিয়ে স্মৃতির রান দাঁড়ায় ১০,৮৮০। ভারতের ১৯৩ রানের ভিত গড়ে দেওয়া সেই ইনিংসের পর হংকংকে ৫৬ রানে গুটিয়ে দিয়ে ১৩৭ রানে জয় পায় ভারত।
স্মৃতির কৃতিত্বকে শুধু মোট রানের অঙ্ক দিয়ে বিচার করলে অবশ্য তাঁর উত্থানের আসল তাৎপর্য ধরা পড়বে না। মিতালি যে উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন ৩৩৩টি আন্তর্জাতিক ইনিংস খেলে, স্মৃতি সেই রেকর্ড ভাঙলেন নিজের ৩০৩তম ইনিংসে। মিতালির আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সামগ্রিক স্ট্রাইক রেট ছিল ৬৭.০২; সেখানে স্মৃতি রান করেছেন ৯২-এর বেশি স্ট্রাইক রেটে। দুই ব্যাটারের সময়, ভূমিকা এবং ক্রিকেটের পরিবেশ আলাদা। তবু এই তুলনা মহিলা ক্রিকেটের ব্যাটিং দর্শনে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনটিকেই স্পষ্ট করে। মিতালি ছিলেন ভারতীয় ব্যাটিংয়ের নির্ভরতা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের প্রতীক; স্মৃতি সেই উত্তরাধিকারকে আরও আক্রমণাত্মক, দ্রুতগামী রূপ দিয়েছেন।
মহারাষ্ট্রের সাংলিতে বড় হয়ে ওঠা স্মৃতির ক্রিকেটে হাতেখড়ি দাদা শ্রবণের অনুশীলন দেখতে দেখতে। মাত্র ন’বছর বয়সে মহারাষ্ট্রের অনূর্ধ্ব-১৫ দলে এবং এগারো বছর বয়সে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পান। ২০১৩ সালে ঘরোয়া একদিনের ক্রিকেটে গুজরাতের বিরুদ্ধে দ্বিশতরান তাঁকে জাতীয় আলোচনায় এনে দেয়। সে বছরই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের হয়ে একদিনের ও টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় তাঁর।
২০১৪ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেকের পর স্মৃতির যাত্রা সব সময় মসৃণ ছিল না। চোট, ছন্দহীনতা এবং বড় প্রতিযোগিতায় প্রত্যাশার চাপ তাঁকে সামলাতে হয়েছে। ২০১৭ সালের গোড়ায় হাঁটুর গুরুতর চোটে মহিলা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সুস্থ হয়ে ফিরে সেই বিশ্বকাপেই ভারতকে ফাইনালে পৌঁছে দেওয়ার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৯০ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে অপরাজিত ১০৬ রান তাঁকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্যতম আকর্ষণীয় ব্যাটারে পরিণত করে।
স্মৃতির ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য শক্তির প্রদর্শন নয়, আঘাতের স্বাভাবিকতা। কভার ড্রাইভ, পয়েন্টের পাশ দিয়ে কাট কিংবা পায়ের ব্যবহার করে স্পিনারকে গ্যালারিতে পাঠানো—তাঁর ব্যাটিংয়ে আগ্রাসন আসে সময়জ্ঞান ও শট নির্বাচনের হাত ধরে। আধুনিক সীমিত ওভারের ক্রিকেটের চাহিদা মেনেও তিনি নিজের সহজাত সৌন্দর্য হারাননি। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার দ্রুতগতির ও বাউন্সনির্ভর পিচেও তাঁর সাফল্য সেই কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতাও তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার মহিলা বিগ ব্যাশ থেকে ইংল্যান্ডের প্রতিযোগিতা—বিভিন্ন পরিবেশে নতুন বোলিং আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছেন। পরে মহিলা প্রিমিয়ার লিগে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর অধিনায়ক হিসেবে দলকে শিরোপা এনে দিয়ে নেতৃত্বের দক্ষতাও প্রমাণ করেছেন। ব্যক্তিগত প্রতিভা থেকে দলের দায়িত্ব বহনকারী ক্রিকেটারে তাঁর উত্তরণ এভাবেই সম্পূর্ণ হয়েছে।
হংকংয়ের বিরুদ্ধে শতরানটি মহিলা এশিয়া কাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। এটি কোনও ভারতীয় ব্যাটারের সর্বোচ্চ টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক স্কোরও। মহিলা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর ৯৩তম পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস মিতালির বিশ্বরেকর্ডও স্পর্শ করেছে। তিনি আগেই মাত্র ২৮০ ইনিংসে ১০ হাজার আন্তর্জাতিক রান পূর্ণ করে দ্রুততম মহিলা ক্রিকেটারের নজির গড়েছিলেন। তিন ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শতরান করা প্রথম ভারতীয় মহিলাও স্মৃতি।
রেকর্ড ভাঙার পরে স্মৃতির প্রতিক্রিয়ায় অবশ্য উচ্ছ্বাসের চেয়ে বিস্ময়ই বেশি ছিল। এতগুলি নজির গড়ার কথা তিনি জানতেন না বলেই জানান। নিজের সাফল্য উৎসর্গ করেন পরিবারকে। অন্য দিকে মিতালি তাঁর উত্তরসূরিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, তরুণ ক্রিকেটার থেকে ভারতের অন্যতম সেরা ব্যাটার হয়ে ওঠার গোটা পথটি তিনি দেখেছেন।
মিতালিকে অতিক্রম করা তাই কোনও প্রজন্মের অবসান নয়; ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের ধারাবাহিক অগ্রগতির চিহ্ন। মিতালি যে ভিত নির্মাণ করেছিলেন, তার উপর দাঁড়িয়েই স্মৃতি ব্যাটিংয়ের নতুন সীমা নির্ধারণ করছেন। তিরিশ বছর বয়সে ১৮টি আন্তর্জাতিক শতরান এবং সর্বাধিক রানের বিশ্বরেকর্ড—এখানেই তাঁর অভিযান শেষ হওয়ার কথা নয়। বরং হংকংয়ের বিরুদ্ধে সেই ১২৪ রানের ইনিংস জানিয়ে দিল, মহিলা ক্রিকেটের রেকর্ডবইয়ের পরবর্তী কয়েকটি অধ্যায়ও সম্ভবত লেখা হবে স্মৃতি মন্ধানার ব্যাটেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



