রান্নাবাটির বদলে যুদ্ধবিমান: লিঙ্গবৈষম্য ভাঙতে পাঞ্জাবের পাঠ্যবইয়ে নতুন পাঠ

যা জানা জরুরি
- কিন্তু দাদু তার আবদারে সাড়া না দিয়ে তাকে প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ দেখতে বলেন।
- কিছুটা অনিচ্ছা নিয়েই টেলিভিশনের সামনে বসে সিধক।
- হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় আকাশে উড়ে চলা যুদ্ধবিমানে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সিধক একটি রান্নাবাটির খেলনা চেয়েছিল। তার সব বন্ধুর কাছেই এমন খেলনা রয়েছে। কিন্তু দাদু তার আবদারে সাড়া না দিয়ে তাকে প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ দেখতে বলেন। কিছুটা অনিচ্ছা নিয়েই টেলিভিশনের সামনে বসে সিধক। হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় আকাশে উড়ে চলা যুদ্ধবিমানে। বিমানটি চালাচ্ছেন এক মহিলা বৈমানিক। জাতীয় পতাকার উদ্দেশে তাঁর অভিবাদন দেখে সিধকের অভিমান মুহূর্তে উধাও হয়ে যায়। সে জানতে চায়—এত বড় বিমান কি সেও একদিন চালাতে পারবে? শেষ পর্যন্ত রান্নাবাটির বদলে দাদুর কাছ থেকে উপহার হিসেবে একটি ছোট যুদ্ধবিমান পায় সে।
‘এ গিফট ফর সিধক’ নামে এই গল্পটি এখন পাঞ্জাবের সরকারি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ইংরেজি পাঠ্যক্রমের অংশ। গল্পটির উদ্দেশ্য কেবল একটি শিশুকে যুদ্ধবিমান চালানোর স্বপ্ন দেখানো নয়। মেয়েদের জন্য রান্নাবাটি আর ছেলেদের জন্য গাড়ি বা বিমান—শিশুদের খেলনা বেছে দেওয়ার মধ্যেও যে লিঙ্গভিত্তিক ধারণা কাজ করে, সেই প্রচলিত ছকটিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়েছে।
পাঞ্জাবের বিদ্যালয় শিক্ষা দফতর ২০২১ সালে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ব্রেকথ্রু এবং আবদুল লতিফ জামিল পোভার্টি অ্যাকশন ল্যাবের দক্ষিণ এশিয়া শাখার সঙ্গে যৌথভাবে লিঙ্গ-সংবেদনশীল পাঠ্যক্রম তৈরির কাজ শুরু করে। পাঁচ বছর পরে তার প্রভাব এখন রাজ্যের পাঠ্যবইয়ের পাতায় স্পষ্ট। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইতেই সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যক্রমেও কয়েকটি সংশ্লিষ্ট বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বর্তমানে পাঞ্জাবের ৬,২৫০টি বিদ্যালয়ে এই পাঠ্যক্রম চালু রয়েছে।
ষষ্ঠ শ্রেণির ইংরেজি বইয়ের ‘এ ফরগটেন উইশ’ গল্পটিতে বিবাহিত মেয়েকে ‘পরের বাড়ির মানুষ’ মনে করার ধারণার বিরোধিতা করা হয়েছে। গল্পের প্রধান চরিত্র খোয়াহিশ নিজের অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা করতে চায়। কিন্তু তার মা মনে করেন, বিয়ের পরে মেয়ের স্থান স্বামীর সংসারেই। বিদেশে থাকা ছেলে ফিরতে না পারায় শেষ পর্যন্ত খোয়াহিশই মায়ের চোখের অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করে এবং তাঁর সেবা করে। গল্পটি বোঝায়, বিবাহিত মেয়েও ছেলের মতো বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে পারে; সে পরিবারের বোঝা বা অপরিচিত কেউ নয়।
অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি বইয়ের ‘স্ম্যাশিং দ্য গ্লাস সিলিং’ গল্পে রয়েছে পরমজিৎ ও গীতের কথা। পরমজিতের মা গীতদের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতেন। পঁচিশ বছর পরে দুই নারীর ফের দেখা হলে জানা যায়, স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী গীত সংসারের আপত্তিতে কোনও পেশায় যোগ দিতে পারেননি। অন্যদিকে তুলনায় কম শিক্ষিত পরমজিৎ নিজের কম্পিউটার ব্যবসা গড়ে তুলে আত্মনির্ভর হয়েছেন। শেষে গীতই পরমজিতের কাছে কাজ চান। যোগ্যতা ও প্রতিভা লিঙ্গনির্ভর নয়—গল্পটি সেই বার্তাই দেয়।
পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের নারীদের উপস্থাপনও বদলেছে। দিল্লির প্রথম ও একমাত্র মুসলিম মহিলা শাসক রাজিয়া সুলতানকে আর শুধু ইলতুৎমিশের কন্যা বলে পরিচয় করানো হচ্ছে না। তাঁর সামরিক প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব এবং রক্ষণশীল সমাজের বিরুদ্ধে লড়াইকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাঠের শেষে পড়ুয়াদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে—রাজিয়া আজকের যুগে জন্মালে শাসক হওয়ার পথে কী ধরনের বাধার মুখে পড়তেন? তিনি নারীদের সম্পর্কে কোন বদ্ধমূল ধারণাগুলি ভেঙেছিলেন?
পাঠ্যাংশে বলা হয়েছে, পুরুষ সেনাপতিরা একজন নারীর নেতৃত্ব মেনে নিতে চাননি। রাজিয়া পর্দা ত্যাগ করেছিলেন, সামরিক পোশাক পরেছিলেন এবং প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর পরিণতির মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছে, পুরুষকে স্বাভাবিক নেতা মনে করা হলেও শাসন ও রাজনীতিতে জায়গা পেতে নারীকে অনেক বেশি লড়াই করতে হয়।
একইভাবে নুরজাহানকেও শুধু জাহাঙ্গিরের স্ত্রী হিসেবে দেখানো হয়নি। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রাজাদেশ জারি, নিজের নামে মুদ্রা প্রচলন, স্থাপত্য পরিকল্পনা এবং বন্দি জাহাঙ্গিরকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, সৌন্দর্য ও দাম্পত্য পরিচয়ের আড়াল থেকে তাঁকে দক্ষ প্রশাসক ও কৌশলী হিসেবে সামনে আনা হয়েছে।
পাঞ্জাব শিক্ষা দফতরের লিঙ্গ-সংবেদনশীল পাঠ্যক্রমের প্রধান সুনীতা প্রভাকর জানিয়েছেন, শুধু বই বদলালেই সামাজিক মনোভাব বদলায় না। তাই শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সংসারের কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ এবং নারীর পেশাগত আকাঙ্ক্ষার প্রতি পরিবারের সমর্থন—এই বিষয়গুলি শ্রেণিকক্ষে কীভাবে আলোচনা করতে হবে, তাও শেখানো হয়েছে।
সরকারি বিদ্যালয়ের অধিকাংশ পড়ুয়া তুলনামূলকভাবে অনগ্রসর পরিবার থেকে আসে। ফলে তাদের পেশা সম্পর্কে ধারণার পরিসর অনেক সময় সীমিত থাকে। মেয়েরা প্রায়ই মনে করে, শিক্ষকতা বা সেবিকার কাজের বাইরে তাদের সামনে বিশেষ সুযোগ নেই। সেই আত্মবিধ্বংসী ধারণা ভাঙাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
ব্রেকথ্রুর প্রকল্পপ্রধান রশ্মি দ্বিবেদীর মতে, লিঙ্গ-সংবেদনশীলতা শুধু মেয়েদের শিক্ষা নয়; ছেলেদের মনোভাব বদলানোও সমান জরুরি। রাজিয়া বা নুরজাহান কার কন্যা কিংবা কার স্ত্রী ছিলেন, নতুন পাঠ্যক্রমে সেটি মুখ্য নয়। নিজেদের কাজ ও লড়াইয়ের মাধ্যমে তাঁরা কী স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছিলেন, পড়ুয়াদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে সেটিই। রান্নাবাটি থেকে যুদ্ধবিমান—পাঞ্জাবের পাঠ্যবইয়ের এই পরিবর্তন তাই কয়েকটি নতুন গল্প সংযোজনমাত্র নয়; শৈশব থেকেই সমতার নতুন ভাষা শেখানোর এক সুপরিকল্পিত প্রয়াস।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



