বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের অন্যতম রাশিয়াকে এখন ভারত থেকে পেট্রোল আমদানি করতে হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে ঘটনাটি বিস্ময়কর। কিন্তু ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় রাশিয়ার বহু তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির অপরিশোধিত তেলকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে পরিণত করার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে বিপুল তেলের ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রোলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

ইউক্রেন সাম্প্রতিক মাসগুলিতে রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার আর্থিক ও সরবরাহব্যবস্থার মূল ভিত্তি—তেল শিল্পকে নিশানা করেছে। দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে শোধনাগার, জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং রপ্তানি টার্মিনালে আক্রমণ চালানো হয়েছে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সূত্র অনুযায়ী, কোনও কোনও সময়ে রাশিয়ার প্রায় ৪০ শতাংশ শোধনক্ষমতা হামলা অথবা রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে প্রভাবিত হয়েছে। এতে পেট্রোল উৎপাদন কমেছে এবং কয়েকটি অঞ্চলে খুচরো বাজারে সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতেই রোসনেফ্ট, গাজপ্রম নেফ্ট ও লুকঅয়েলের মতো রুশ সংস্থা ভারতীয় শোধনাগারগুলির কাছ থেকে পেট্রোল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। অন্তত ৬০ হাজার টন ভারতীয় পেট্রোল রাশিয়ার উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে বলে বাণিজ্যিক সূত্রের দাবি। সরাসরি লেনদেনের পরিবর্তে মধ্যস্থতাকারী ব্যবসায়ী, জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য স্থানান্তর এবং তৃতীয় দেশের বন্দর ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে জ্বালানির উৎস ও চূড়ান্ত গন্তব্য শনাক্ত করা কঠিন হচ্ছে।

এই বাণিজ্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল তার বৃত্তাকার চরিত্র। ইউক্রেন যুদ্ধের পরে পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞা ও মূল্যসীমার সুযোগে ভারত বিপুল পরিমাণ সস্তা রুশ অপরিশোধিত তেল কিনেছে। ভারতীয় শোধনাগারে সেই তেল থেকেই পেট্রোল ও ডিজেল তৈরি হয়েছে। এখন রাশিয়ার নিজস্ব শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেই পরিশোধিত পেট্রোলের একাংশ আবার রাশিয়ায় ফিরে যাচ্ছে। অর্থাৎ রাশিয়া নিজের তেল বিদেশে পাঠিয়ে, বাড়তি খরচে তার পরিশোধিত অংশ ফের কিনছে।

রুশ সংস্থা রোসনেফ্টের ৪৯ শতাংশ অংশীদারি রয়েছে গুজরাতের ভাদিনারে অবস্থিত নায়ারা এনার্জির শোধনাগারে। জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, সেখান থেকে পেট্রোল নিয়ে কয়েকটি ট্যাঙ্কার প্রথমে ফুজাইরা বা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দিকে গিয়েছে এবং পরে রাশিয়ার পথে এগিয়েছে। তবে ভারতের পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর বক্তব্য, ভারতীয় সংস্থাগুলি সরাসরি রাশিয়াকে জ্বালানি বিক্রি করছে না; ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য সেখানে পৌঁছতে পারে।

ঘটনাটি দেখাচ্ছে, ইউক্রেনের কৌশল কেবল রাশিয়ার তেল রপ্তানি ব্যাহত করা নয়; দেশের ভিতরে জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করাও তার লক্ষ্য। ভারত থেকে পেট্রোল আমদানি আপাতত পরিমাণে সীমিত হলেও তা রাশিয়ার শোধন পরিকাঠামোর দুর্বলতা এবং যুদ্ধের পরিবর্তিত অর্থনৈতিক ভূগোলের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। আরও হামলা হলে এই নির্ভরতা বাড়তে পারে।