মৌলিক সংখ্যার রহস্যভেদে হাত মেলাল মানুষ ও কৃত্রিম মেধা

যা জানা জরুরি
- মৌলিক সংখ্যার দুর্ভেদ্য জগতে কি এ বার গণিতবিদদের নতুন সহকারী হয়ে উঠছে কৃত্রিম মেধা?
- সাম্প্রতিক দু’টি ঘটনা অন্তত সেই সম্ভাবনাই উজ্জ্বল করেছে।
- একটিতে ‘ক্লদ’ নামের এআই রিম্যান অনুমানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা উন্নত করার নতুন যুক্তি দিয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মৌলিক সংখ্যার দুর্ভেদ্য জগতে কি এ বার গণিতবিদদের নতুন সহকারী হয়ে উঠছে কৃত্রিম মেধা? সাম্প্রতিক দু’টি ঘটনা অন্তত সেই সম্ভাবনাই উজ্জ্বল করেছে। একটিতে ‘ক্লদ’ নামের এআই রিম্যান অনুমানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা উন্নত করার নতুন যুক্তি দিয়েছে। অন্যটিতে ‘অ্যাক্সিয়মপ্রুভার’ যন্ত্রপদ্ধতির সাহায্যে যমজ মৌলিক সংখ্যা-সংক্রান্ত বিখ্যাত ‘২৪৬ উপপাদ্য’-এর প্রমাণকে যন্ত্রে যাচাইযোগ্য রূপ দেওয়া হয়েছে। তবে কোনও ক্ষেত্রেই মানুষ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়নি। বরং কৃত্রিম মেধার বিপুল অনুসন্ধানক্ষমতা এবং মানুষের বিচারবুদ্ধির যুগলবন্দিই এই অগ্রগতির আসল তাৎপর্য।
মৌলিক সংখ্যা হল সেই সব পূর্ণসংখ্যা, যেগুলিকে ১ এবং সেই সংখ্যা ছাড়া অন্য কোনও সংখ্যা দিয়ে নিঃশেষে ভাগ করা যায় না—যেমন ২, ৩, ৫, ৭ বা ১১। সংজ্ঞাটি সহজ হলেও সংখ্যারেখায় মৌলিক সংখ্যাগুলি কী ভাবে ছড়িয়ে রয়েছে, তার ভিতরের নিয়ম আজও গণিতের অন্যতম গভীর রহস্য।
এই রহস্যের কেন্দ্রে রয়েছে ১৮৫৯ সালে বার্নহার্ড রিম্যানের প্রস্তাবিত অনুমান। রিম্যান জিটা অপেক্ষকের ‘শূন্য’গুলি একটি নির্দিষ্ট উল্লম্ব রেখায় অবস্থান করে—মোটামুটি এটাই ওই অনুমানের বক্তব্য। সেটি প্রমাণিত হলে মৌলিক সংখ্যার বণ্টন সম্পর্কে বহু প্রশ্নের উত্তর মিলবে। ক্লে ম্যাথমেটিকস ইনস্টিটিউট এর সমাধানের জন্য দশ লক্ষ ডলারের পুরস্কারও ঘোষণা করেছে।
অ্যানথ্রপিকের এক কর্মী তাদের অপ্রকাশিত গবেষণামূলক ‘ক্লদ’ সংস্করণকে রিম্যান অনুমান সমাধানের চেষ্টা করতে বলেন। প্রত্যাশিত ভাবেই কৃত্রিম মেধাটি মূল অনুমান প্রমাণ করতে পারেনি। কিন্তু চেষ্টা করতে গিয়ে সম্পর্কিত একটি সমস্যায় তা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সন্ধান পায়। এত দিন নিশ্চিত ভাবে বলা যেত, রিম্যান জিটা অপেক্ষকের অন্তত ৪১.৬ শতাংশ শূন্য অনুমানে বর্ণিত রেখায় রয়েছে। ক্লদ পূর্ববর্তী কয়েক দশকের গবেষণাকে নতুন ভাবে মিলিয়ে এই ন্যূনতম সীমা ৬৭.২ শতাংশে উন্নীত করার যুক্তি হাজির করেছে। অ্যানথ্রপিকের দুই গণিতবিদ সেই কাজ পরীক্ষা করেছেন; বাইরের বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান কনরি ও ড্যান গোল্ডস্টোনও গবেষণাটি দেখেছেন। একটি যন্ত্রে যাচাইযোগ্য প্রমাণও তৈরি করা হয়েছে। তবে অ্যানথ্রপিক স্পষ্ট করেছে, এই পদ্ধতি সরাসরি রিম্যান অনুমানের পূর্ণ সমাধান দেবে—এমন প্রত্যাশা নেই।
অনুসন্ধানের পরিমাণও বিস্ময়কর। প্রথমে ক্লদ প্রায় ৬৫০টি ধারণা পরীক্ষা করে ব্যর্থ হয়। পরে প্রায় ৬০টি সহায়ক কৃত্রিম মেধা-প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে দেড় দিন ধরে আরও গভীরে অনুসন্ধান চালায়। তারা ২,৪০০টি নির্দেশ কার্যকর করে, শতাধিক গণনামূলক কর্মসূচি লেখে এবং পরিচিত শূন্যগুলির উপরে হাজার হাজার পরীক্ষা চালায়। শেষ পর্যন্ত পূর্ববর্তী গবেষকদের আলাদা আলাদা ফলাফলের মধ্যে এমন একটি যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়, যা মানুষের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ‘২৪৬ উপপাদ্য’ নিয়ে। যমজ মৌলিক সংখ্যার অনুমান বলছে, মাত্র ২ ব্যবধানে থাকা মৌলিক সংখ্যার জোড়া—যেমন ৩ ও ৫, ১১ ও ১৩—অসীম সংখ্যায় রয়েছে। অনুমানটি এখনও প্রমাণিত নয়। ২০১৩ সালে ইটাং ঝাং দেখিয়েছিলেন, সর্বাধিক সাত কোটি ব্যবধানে থাকা মৌলিক সংখ্যার জোড়া অসীম সংখ্যায় রয়েছে। পরে জেমস মেনার্ড এবং টেরেন্স টাও-সহ বহু গণিতবিদের যৌথ উদ্যোগে সেই ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ২৪৬। অর্থাৎ, অসীম সংখ্যক মৌলিক সংখ্যার জোড়া রয়েছে, যাদের পার্থক্য ২৪৬-এর বেশি নয়।
অ্যাক্সিয়ম ম্যাথের ‘অ্যাক্সিয়মপ্রুভার’ এই মানবসৃষ্ট প্রমাণকে সম্পূর্ণ যন্ত্রপাঠ্য ও যন্ত্রে পরীক্ষাযোগ্য কাঠামোয় রূপ দিয়েছে। এটি নতুন করে উপপাদ্য আবিষ্কার করেনি; বরং দীর্ঘ, জটিল প্রমাণের প্রতিটি ধাপ যুক্তিসঙ্গত কি না, তা যাচাই করেছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের গবেষণায় পুনর্ব্যবহারযোগ্য মৌলিক-সংখ্যার ব্যবধান সংক্রান্ত ফলাফলের একটি ভাণ্ডারও নির্মাণ করেছে। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা-গণিতবিদ কেন ওনোর মতে, ২৪৬ উপপাদ্য বর্তমানে মৌলিক সংখ্যা সম্পর্কে মানবজ্ঞানের সীমান্তকে নির্দেশ করে।
এই দুই সাফল্য কৃত্রিম মেধার দু’টি পৃথক ক্ষমতা তুলে ধরেছে। ক্লদ পুরনো গবেষণাগুলির মধ্যে অপ্রত্যাশিত সংযোগ খুঁজে নতুন যুক্তি দিয়েছে; অ্যাক্সিয়মপ্রুভার মানুষের তৈরি যুক্তিকে কঠোর যান্ত্রিক পরীক্ষার আওতায় এনেছে। কিন্তু কোন প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কোন ফলাফল সত্যিই নতুন, প্রমাণের তাৎপর্য কী এবং কোথায় সতর্ক হওয়া দরকার—এই সিদ্ধান্ত এখনও গণিতবিদদেরই।
অতএব এটি মানুষের বদলে যন্ত্র বসানোর কাহিনি নয়। বরং মানুষ প্রশ্ন করছে, কৃত্রিম মেধা অসংখ্য সম্ভাব্য পথ খুঁজছে, আবার মানুষই সেই পথের বৈধতা ও মূল্য নির্ধারণ করছে। মৌলিক সংখ্যার বহু প্রাচীন রহস্য এখনও অমীমাংসিত; তবে তাদের দরজায় কড়া নাড়ার জন্য গণিতবিদরা এ বার এক অস্বাভাবিক দ্রুত এবং অক্লান্ত সহযোগী পেয়েছেন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



