অরুণাচল সীমান্তে ভারত-চিন বৈঠক, কলকাতা ও লখনউয়ে চালু হতে পারে হটলাইন

যা জানা জরুরি
- অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি জেলার তাকসিং এলাকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা ঘিরে নতুন করে উত্তেজনার খবরের মধ্যেই ভারত ও চিনের উচ্চপদস্থ সেনাকর্তারা বৈঠকে বসতে চলেছেন।
- গত কয়েক সপ্তাহে স্থানীয় স্তরে একাধিক বৈঠক হলেও সমস্যা পুরোপুরি মেটেনি।
- সেই কারণে এ বার কোর কমান্ডার পর্যায়ে আলোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা হবে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি জেলার তাকসিং এলাকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা ঘিরে নতুন করে উত্তেজনার খবরের মধ্যেই ভারত ও চিনের উচ্চপদস্থ সেনাকর্তারা বৈঠকে বসতে চলেছেন। গত কয়েক সপ্তাহে স্থানীয় স্তরে একাধিক বৈঠক হলেও সমস্যা পুরোপুরি মেটেনি। সেই কারণে এ বার কোর কমান্ডার পর্যায়ে আলোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা হবে। পাশাপাশি সীমান্তে কোনও ঘটনা ঘটলে যাতে দ্রুত যোগাযোগ করা যায়, তার জন্য কলকাতা ও লখনউয়ে ভারতীয় সেনার দুই কমান্ড সদর দফতরে চিনের সঙ্গে সরাসরি হটলাইন চালুর প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।
ভারতের পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা লেফটেন্যান্ট জেনারেল গিরিশ কালিয়ার। তিনি সেনাবাহিনীর তৃতীয় কোর বা ‘স্পিয়ার কোর’-এর কমান্ডার। নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরের কাছে রঙ্গাপাহাড়ে এই কোরের সদর দফতর। নাগাল্যান্ড, মণিপুর এবং অরুণাচল প্রদেশের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর সামরিক অভিযানের দায়িত্ব মূলত এই বাহিনীর উপর। গিরিশ কালিয়া তাঁর চিনা সমকক্ষ এবং পিপলস লিবারেশন আর্মির অন্য পদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে শীঘ্রই আলোচনায় বসবেন বলে জানা গিয়েছে। বৈঠকের দিন ও স্থান অবশ্য এখনও সরকারি ভাবে ঘোষণা করা হয়নি। মূল লক্ষ্য তাকসিং এলাকার উত্তেজনা প্রশমন এবং পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা।
বৈঠকের আগে সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরজ শেঠ স্পিয়ার কোর পরিদর্শন করেছেন। সেনাবাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলির যুদ্ধপ্রস্তুতি, সীমান্ত পরিকাঠামোর অগ্রগতি এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন। তাকসিং ঘিরে উত্তেজনার খবরের সঙ্গে সেনাপ্রধানের এই সফরকে মিলিয়ে দেখছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞেরা। তবে ঠিক কী ধরনের ঘটনা ঘটেছে বা দুই দেশের সেনা মুখোমুখি হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সরকারি ভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
এই সামরিক তৎপরতার কূটনৈতিক পটভূমিও গুরুত্বপূর্ণ। গত ২৫ আগস্ট বেজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই সীমান্ত প্রশ্নে বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের ২৫তম বৈঠক করেন। সেখানে দুই দেশ সীমান্ত নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দ্রুত কিছু দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটানো, পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে দুটি নতুন সামরিক হটলাইন স্থাপন এবং উচ্চপদস্থ সেনাকর্তাদের বৈঠকের জন্য আরও দুটি স্থান চিহ্নিত করার বিষয়ে সম্মত হয়। সীমান্ত সমস্যার একটি ‘ন্যায্য, যুক্তিসঙ্গত ও পারস্পরিক ভাবে গ্রহণযোগ্য’ সমাধান খোঁজার আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছে দুই পক্ষ। ২০২৭ সালে ভারতে পরবর্তী বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক হবে।
প্রস্তাবিত হটলাইনগুলির একটি যুক্ত হবে কলকাতার পূর্বাঞ্চলীয় সেনা কমান্ডের সদর দফতরের সঙ্গে। অন্যটি থাকবে লখনউয়ের মধ্যাঞ্চলীয় কমান্ডে। এগুলির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় সেনাকর্তারা তাঁদের চিনা সমকক্ষদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারবেন। সীমান্তে টহলদারি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি, মুখোমুখি অবস্থান কিংবা কোনও স্থানীয় ঘটনার দ্রুত নিষ্পত্তিতে এই যোগাযোগব্যবস্থা বিশেষ কার্যকর হতে পারে।
উত্তরাখণ্ডের যোশীমঠে নতুন সীমান্ত-কর্মী বৈঠককেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। মধ্যাঞ্চলের জন্য যোশীমঠ এবং পূর্বাঞ্চলের জন্য অরুণাচলের তাওয়াংকে বৈঠকের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে কোর কমান্ডার বা সমপর্যায়ের সেনাকর্তারা আলোচনা করতে পারবেন। পূর্ব লাদাখে বর্তমানে ভারতের চুশুল এবং চিনের মলডো কেন্দ্র ব্যবহার করে দুই দেশের সেনাকর্তাদের বৈঠক হয়। আলোচনা পর্যায়ক্রমে সীমান্তের দুই পাশে আয়োজিত হয়। নতুন কেন্দ্রগুলি চালু হলে একই ব্যবস্থা মধ্য ও পূর্বাঞ্চলেও বিস্তৃত হবে। স্থানীয় ঘটনাকে দীর্ঘ সামরিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ঠেলে না দিয়ে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কমান্ডারদের সরাসরি কথা বলার সুযোগ দেওয়াই এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য।
২০২০ সালে পূর্ব লাদাখে সংঘর্ষের পর ভারত-চিন সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছিল। দীর্ঘ চার বছরের অচলাবস্থার পরে ২০২৪ সালের অক্টোবরে সেনা সরানোর সমঝোতা হয়। তার পর থেকে সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পারস্পরিক সন্দেহ কাটেনি। সীমান্তও এখনও চূড়ান্ত ভাবে চিহ্নিত নয়। ফলে কলকাতা ও লখনউয়ের হটলাইন এবং যোশীমঠের বৈঠককেন্দ্র সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান নয়; এগুলি মূলত সংঘর্ষ ঠেকানোর নিরাপত্তাবেষ্টনী। তাকসিংয়ের ঘটনাই মনে করিয়ে দিচ্ছে, শীর্ষস্তরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা দেওয়া হলেও সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ এবং সতর্ক সামরিক প্রস্তুতি—দুই-ই জরুরি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



