ভারত দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ১৫ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষের বয়স ষাট বছর বা তার বেশি। রাষ্ট্রপুঞ্জের জনসংখ্যা তহবিলের পূর্বাভাস, ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৩৪ কোটি ৭০ লক্ষে পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ, তখন দেশের প্রতি পাঁচজন নাগরিকের একজন হবেন প্রবীণ। ২০৪৬ সালের মধ্যেই প্রবীণ মানুষের সংখ্যা শূন্য থেকে ১৫ বছর বয়সি শিশুদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। অথচ এই বিরাট জনসংখ্যার স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন সম্পর্কে ভারতের সরকারি তথ্যভান্ডার এখনও অসম্পূর্ণ।

প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যবিমার আওতা বাড়ানো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। আয়ুষ্মান ভারত কিংবা বিভিন্ন রাজ্যের স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পে কতজন ষাটোর্ধ্ব বা সত্তরোর্ধ্ব মানুষ অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, তার হিসাবও প্রয়োজন। কিন্তু কেবল বিমার কার্ডের সংখ্যা দিয়ে প্রবীণদের স্বাস্থ্য-বাস্তবতা বোঝা যায় না। জানা দরকার, তাঁরা কোন কোন দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছেন, একই সঙ্গে একাধিক রোগ রয়েছে কি না, নিয়মিত কতগুলি ওষুধ কিনতে হয়, চিকিৎসার জন্য নিজের পকেট থেকে কত টাকা ব্যয় করেন এবং প্রয়োজনের সময়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছতে পারেন কি না।

২০২৫ সালের জাতীয় স্বাস্থ্য সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ২০১৭-১৮ সালের তুলনায় স্বাস্থ্যবিমার আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গ্রামে বিমার আওতায় থাকা মানুষের হার প্রায় ১৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৭ শতাংশ এবং শহরে ১৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৪ শতাংশ হয়েছে। তবু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার একটি ঘটনায় রোগীর নিজের পকেট থেকে গড় ব্যয় প্রায় ৩৪ হাজার টাকা। বহির্বিভাগে চিকিৎসা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং মাসের পর মাস ওষুধ কেনার খরচও প্রবীণ পরিবারের উপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বিমা প্রধানত হাসপাতালে ভর্তির ব্যয় মেটালে উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র, হৃদ্‌রোগ, বাত, শ্বাসকষ্ট কিংবা স্মৃতিভ্রংশের দৈনন্দিন চিকিৎসা তার বাইরে থেকে যেতে পারে।

এখানেই সরকারি সমীক্ষার সীমাবদ্ধতা প্রকট। অধিকাংশ সমীক্ষায় পরিবারের সদস্যের বয়স জানা হলেও প্রবীণদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ফল আলাদা করে যথেষ্ট বিশদে প্রকাশ করা হয় না। কোথাও অসুস্থতার তথ্য মাত্র পনেরো দিনের স্মৃতির ভিত্তিতে সংগ্রহ করা হয়, কোথাও হাসপাতালে ভর্তির হিসাব নেওয়া হয় গত এক বছরের। ফলে দীর্ঘস্থায়ী কিন্তু আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকা রোগ, নিয়মিত ওষুধের ব্যয়, চলাফেরার অক্ষমতা, শ্রবণ বা দৃষ্টিশক্তির হানি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা আড়ালে থেকে যায়।

ভারতে প্রবীণদের স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক অবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত উদ্যোগ ‘লংগিটিউডিনাল এজিং স্টাডি ইন ইন্ডিয়া’। ২০১৭-১৮ সালের প্রথম পর্বে ষাটোর্ধ্ব প্রায় ৩১,৯০০ মানুষের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে একই মানুষের স্বাস্থ্য ও আর্থিক অবস্থায় কী পরিবর্তন ঘটছে, তা বুঝতে নিয়মিত ব্যবধানে পরবর্তী পর্ব প্রয়োজন। তথ্য প্রকাশে দীর্ঘ বিলম্ব হলে দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতার ভিত্তিতে নীতি তৈরি করা সম্ভব নয়।

সমস্যাটি শুধু জাতীয় গড়েরও নয়। কেরল, তামিলনাড়ু বা হিমাচল প্রদেশের প্রবীণ জনসংখ্যার চেহারা উত্তরপ্রদেশ, বিহার কিংবা ঝাড়খণ্ডের মতো নয়। শহরের একা থাকা অবসরপ্রাপ্ত নাগরিকের প্রয়োজন এবং প্রত্যন্ত গ্রামের আয়হীন প্রবীণ মহিলার প্রয়োজনও এক হতে পারে না। তাই রাজ্য, জেলা, গ্রাম-শহর, লিঙ্গ, আয়, জাতি ও সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী তথ্য ভাগ করে প্রকাশ করা জরুরি। আশি বছরের বেশি বয়সি, বিধবা, একা বসবাসকারী এবং দৈনন্দিন কাজে অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হয়—এমন মানুষদের আলাদা করে চিহ্নিত করাও দরকার।

এর জন্য নতুন একটি বিরাট সমীক্ষা শুরু করার প্রয়োজন নেই। বর্তমানে চালু জাতীয় স্বাস্থ্য, পারিবারিক স্বাস্থ্য, ভোগব্যয় এবং বার্ধক্যবিষয়ক সমীক্ষাগুলির মধ্যে সমন্বয় ঘটানো যেতে পারে। প্রশ্নমালায় একই ধরনের বয়সবিভাগ রাখা, প্রবীণদের নমুনা বাড়ানো এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগ, ওষুধ, পরিচর্যা ও নিজস্ব ব্যয়ের নির্দিষ্ট প্রশ্ন যোগ করলেই অনেক ঘাটতি পূরণ হবে। তথ্য দ্রুত প্রকাশ এবং গবেষকদের ব্যবহারের সুযোগ দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

একজন প্রবীণের নামে বিমার কার্ড আছে কি না, সেটি প্রশাসনিক হিসাব। কিন্তু তিনি চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, ওষুধ কিনতে পারছেন কি না এবং অসুস্থতার কারণে পরিবার দারিদ্র্যের দিকে চলে যাচ্ছে কি না—সেটিই জননীতির আসল প্রশ্ন। বার্ধক্যের পথে এগোনো ভারতকে তাই শুধু প্রবীণদের গণনা করলে চলবে না; তাঁদের জীবন, রোগ, ব্যয় এবং পরিচর্যার প্রয়োজনও বুঝতে হবে।