টাকার বিনিময়ে ডিগ্রি বিক্রির অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গের অন্তত ৪৫০টি বিএড কলেজকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠাল রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতর। রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, সরকারি পরিদর্শনে দেখা গিয়েছে, তালিকাভুক্ত ৬০২টি বিএড কলেজের মধ্যে ৫৩টির বাস্তবে কোনও অস্তিত্বই নেই। কোথাও কলেজের ঠিকানায় অন্য কাজ চলছে, কোথাও আবার তালাবন্ধ ভবন ছাড়া কিছু পাওয়া যায়নি। ১৭টি কলেজের অনাপত্তি শংসাপত্র দেওয়া হয়েছিল বসতবাড়ির ঠিকানায়।

বৃহস্পতিবার সাংবাদিক বৈঠকে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জানান, গত জুলাই ও অগস্ট মাসে রাজ্যের ৬০২টি বিএড কলেজেই পরিদর্শন চালানো হয়েছিল। কলেজগুলির পরিকাঠামো, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপস্থিতি, পঠনপাঠনের ব্যবস্থা, নজরদারি ক্যামেরা এবং অন্যান্য আবশ্যিক সুযোগ-সুবিধা খতিয়ে দেখা হয়। একশো নম্বরের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হলে কলেজগুলির গড় প্রাপ্ত নম্বর দাঁড়ায় মাত্র ৫১.৫।

পরিদর্শন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২৬৫টি প্রতিষ্ঠানকে ‘অচল’ বা কার্যত অকেজো বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানগুলির কোনওটি ভুয়ো, কোনওটির প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নেই, আবার কোনওটির বৈধ বিশ্ববিদ্যালয়-অনুমোদনই নেই। ১২১টি কলেজের পরিকাঠামোর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় বলে ধরা পড়েছে। ১১৪টি কলেজ একশোর মধ্যে তিরিশেরও কম নম্বর পেয়েছে।

অন্য দিকে, মাত্র ১৫১টি কলেজ ৬৫ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে নম্বর পেয়েছে। এই কলেজগুলিতেই যথাযথ পরিকাঠামো, শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং সচল নজরদারি ক্যামেরা পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ, সরকারি হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যের মোট বিএড কলেজের মাত্র এক-চতুর্থাংশের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে।

উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর অভিযোগ, গত ১৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গে বিপুল সংখ্যক বিএড কলেজ গজিয়ে উঠেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলির একাংশ নিয়মিত পঠনপাঠনের পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে ডিগ্রি দেওয়ার ব্যবসায় নেমেছিল। শুধু বিএড নয়, কিছু আইন, পলিটেকনিক, শিল্প প্রশিক্ষণ এবং ওষুধবিদ্যা কলেজের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ উঠেছে। তবে এই অভিযোগগুলির চূড়ান্ত সত্যতা এখনও প্রশাসনিক তদন্ত ও কলেজগুলির জবাবের উপর নির্ভরশীল।

সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রতি বছর ৬২ হাজারের বেশি বিএড ডিগ্রি দেওয়া হয়। গোয়া, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং কয়েকটি প্রতিবেশী রাজ্যের বহু শিক্ষার্থীও পশ্চিমবঙ্গের কলেজগুলিতে নাম নথিভুক্ত করেন। অধিকাংশ কলেজে বাংলা মাধ্যমে পড়ানো হলেও বাংলা না-জানা এত শিক্ষার্থী কী ভাবে সেখানে নিয়মিত ক্লাস করে সফল হচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মন্ত্রী।

তদন্তের সূত্রপাত হয়েছিল একটি প্রতিবেশী রাজ্যের মুখ্যসচিবের চিঠির পরে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিবকে পাঠানো সেই চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, সংশ্লিষ্ট রাজ্যের শিক্ষার্থীরা সেখানে পড়াশোনা না করে পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি পেশাভিত্তিক কলেজ থেকে অর্থের বিনিময়ে ডিগ্রি কিনছেন। এর ফলে ওই রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অভিযোগ পাওয়ার পরেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার সব বিএড কলেজে সরেজমিন পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়।

কারণ দর্শানোর নোটিস পাওয়া কলেজগুলিকে জবাব দেওয়ার জন্য ২১ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। তাদের জানাতে হবে, পরিদর্শনে ধরা পড়া অনিয়ম দূর করতে কী কী সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জবাবে সরকার সন্তুষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট কলেজের বিশ্ববিদ্যালয়-অনুমোদন প্রত্যাহার করা হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী।

তবে অনুমোদন প্রত্যাহারের আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষক-শিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধি মেনে পদক্ষেপ করতে হবে। কলেজগুলির বক্তব্য শোনার সুযোগ দেওয়াও প্রশাসনিক ন্যায়ের অঙ্গ। ফলে নোটিস পাঠানোর অর্থ এখনই কোনও প্রতিষ্ঠানকে দোষী ঘোষণা করা নয়; এটি তদন্ত ও সম্ভাব্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রাথমিক ধাপ।

রাজ্যের পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে শিক্ষাক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া কথিত দুর্নীতি নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে বলেও জানিয়েছেন জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, উচ্চশিক্ষাকে সামনে রেখে কারা ব্যবসা চালিয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশ্যে আনা হবে। তদন্তের ফল বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের কাছেও পাঠানো হবে।

এই অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক অবশ্য রাজনৈতিক অভিযোগ নয়, শিক্ষক-প্রশিক্ষণের মান। বিএড ডিগ্রিধারীরাই ভবিষ্যতে বিদ্যালয়ে পড়ানোর দায়িত্ব পান। কলেজে উপস্থিত না থেকেও যদি অর্থের বিনিময়ে সেই ডিগ্রি পাওয়া যায়, তবে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানে। তাই অভিযুক্ত কলেজগুলির বিরুদ্ধে প্রমাণসাপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বৈধ কলেজের বর্তমান শিক্ষার্থী ও সদ্য পাশ করা প্রার্থীরা যাতে নির্বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেই ভারসাম্যও সরকারকে রক্ষা করতে হবে।