দিল্লির খামারবাড়িতে জ্ঞানচর্চার বিরল ঠিকানা

যা জানা জরুরি
- তিমিরেন্দু রায়চৌধুরী: দিল্লির বিদ্বৎসমাজের অনেকের বাড়িতেই ব্যক্তিগত বইয়ের সম্ভার রয়েছে।
- কিন্তু সেই সংগ্রহ সাধারণ পাঠক কিংবা গবেষকদের নাগালের বাইরে থাকাই স্বাভাবিক।
- এই চেনা ছবিটি বদলে দিয়েছেন অধ্যাপক মধু খান্না।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
শিল্পকলা, প্রত্নতত্ত্ব, ভারততত্ত্ব, ধর্ম এবং আন্তর্মহাদেশীয় সংস্কৃতি নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁদের বিশেষভাবে স্বাগত জানায় এই পাঠাগার। তবে এটি নিছক বইয়ে ঠাসা কোনও ঘর নয়। অধ্যাপক খান্নার দীর্ঘ গবেষণাজীবন, সযত্নে সংরক্ষিত একটি স্থাপত্য এবং দিল্লি থেকে দ্রুত হারিয়ে যেতে থাকা খামার-পরিবেশ—এই তিনের সম্মিলন ঘটেছে এখানে।
মধু খান্না ভারতের তন্ত্রচর্চার অগ্রগণ্য গবেষকদের অন্যতম। দেবীকেন্দ্রিক শাক্ত ঐতিহ্য তাঁর বিশেষ গবেষণার বিষয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারততত্ত্ব ও ধর্মচর্চা নিয়ে গবেষণার সময়ে তাঁর শিক্ষক ছিলেন বিশিষ্ট সংস্কৃতজ্ঞ অ্যালেক্সিস স্যান্ডারসন। পরে তিনি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার তুলনামূলক ধর্ম ও সভ্যতাচর্চা কেন্দ্রের অধিকর্তা হন। জাতীয় সংগ্রহশালায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাতীয় বৃত্তিও পেয়েছেন। ব্রিটিশ মিউজিয়াম থেকে নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট—বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য তন্ত্রশিল্পের প্রদর্শনী আয়োজন করেছেন তিনি। তাঁর লেখা একাধিক বই এখন এই বিষয়ের মান্য পাঠ্য।
এই দীর্ঘ অধ্যয়ন ও সংগ্রহের ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে তন্ত্র ফাউন্ডেশন এবং তার পাঠাগার। সেটির ঠিকানা খান্না পরিবারের ‘হরি ভরি ফার্ম’। এক সময় ছত্তরপুর ছিল মূলত কৃষিজমি। নগরায়ণ ও জমির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার বহু খামার সঙ্কুচিত হয়েছে। তবু অধ্যাপক খান্নার বাড়ির পিছনের জমিতে এখনও চাষ হয়; পাঠাগার থেকে বেরোলেই ছাদের বদলে দিগন্ত পর্যন্ত খোলা মাঠ দেখা যায়।
বাড়িটিও দিল্লির স্থাপত্য-ইতিহাসের একটি চিহ্ন। সত্তরের দশকের খামারবাড়িগুলির মতোই সেখানে মাটির কাছাকাছি রং, চুনাপাথরের দেওয়াল, সরল রেখা এবং কোটা পাথরের মেঝে। ছাদের কাচঘেরা আলোকপথটি পুরনো রোশনদানের আধুনিক রূপ। নিম, কারিপাতা, অমলতাস ও বোগেনভিলিয়া গাছকে অতিরিক্ত ছাঁটাই না করে স্বাভাবিকভাবে বাড়তে দেওয়া হয়েছে।
বসার ঘরের দেওয়ালে শাক্তধারার কালীঘাট চিত্রের পাশাপাশি রয়েছে তন্ত্রপ্রভাবিত নানা শিল্পকর্ম। এক দিকে গ্রন্থাগারিকের ঘর ও বইয়ের তাক, অন্য দিকে খোলা বারান্দা। নিচের বৈঠকখানা বাগানের দিকে মুখ করা। বাংলার এক কারিগরের বোনা লোহার চেয়ারও সেখানে স্থান পেয়েছে। বাড়িটি অধ্যাপক খান্না মূলত নিজেই দেখাশোনা করেন।
তন্ত্র ফাউন্ডেশন লাইব্রেরি তাই কেবল একজন পণ্ডিতের ব্যক্তিগত সংগ্রহকে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নয়। এটি দেখায়, জ্ঞানচর্চার জন্য বইয়ের পাশাপাশি স্থিরতা, প্রকৃতি ও দিগন্তেরও প্রয়োজন। দ্রুত বদলে যাওয়া দিল্লিতে অধ্যাপক খান্নার বাড়ি সেই দুর্লভ অবকাশটুকুই ধরে রেখেছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



