দিল্লির কারাগারে আর যৌনকর্মী বা যৌনপল্লির পরিচালক হিসেবে চিহ্নিত মহিলা বন্দিদের অন্য মহিলা বন্দিদের থেকে আলাদা রাখা যাবে না। সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে দেশের কারাগারগুলিতে বৈষম্যমূলক বিধান চিহ্নিত করার প্রক্রিয়ায় আপত্তি ওঠার পরে দিল্লি সরকার তিনটি সংশ্লিষ্ট বিধান বাদ দিয়েছে। জুলাই মাসে একই ধরনের বিধান প্রত্যাহার করেছিল হিমাচলপ্রদেশ। এখনও অন্তত ১৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের কারাবিধিতে এই ঔপনিবেশিক মানসিকতার উত্তরাধিকার রয়ে গিয়েছে।

দিল্লি কারাবিধি, ২০১৮-র ১৪৩৪(৩) নম্বর বিধিতে যৌনকর্মী ও যৌনপল্লির পরিচালকদের অন্য মহিলা বন্দিদের থেকে পৃথক রাখার কথা বলা হয়েছিল। ৯২(২৫) নম্বর বিধি আবার ‘পরিচিত দুশ্চরিত্র’ বন্দিদের আলাদা করার অনুমতি দিত। দিল্লি কারাগার আইন, ২০০০-এর ২৮(২) ধারায় অনৈতিক পাচার প্রতিরোধ আইন, ১৯৫৬-র অধীনে অভিযুক্ত বা দোষী সাব্যস্ত মহিলা এবং ‘গুরুতর নৈতিক অধঃপতন’-সংক্রান্ত অপরাধে অভিযুক্ত মহিলাদের অন্য বন্দিদের থেকে পৃথক রাখার নির্দেশ ছিল। তিনটিই এখন বাদ দেওয়া

কিন্তু প্রশ্ন হল, যৌনকর্মীদের ‘দূষিত প্রভাব’ থেকে অন্য বন্দিদের বাঁচানোর এই ধারণা এল কোথা থেকে?

এর উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হয় উনিশ শতকের ব্রিটিশ ভারতে। সে সময় ব্রিটিশ প্রশাসনের অন্যতম উদ্বেগ ছিল ভারতীয় সেনাছাউনিতে কর্মরত ইউরোপীয় সৈন্যদের মধ্যে সিফিলিস ও গনোরিয়ার মতো যৌনরোগের বিস্তার। রোগের জন্য সৈন্যদের আচরণ বা পুরুষ খদ্দেরদের দায়ী না করে ঔপনিবেশিক প্রশাসন তার সম্পূর্ণ দায় চাপিয়েছিল ভারতীয় যৌনকর্মীদের উপর।

১৮৬৮ সালের ভারতীয় সংক্রামক রোগ আইন এই নজরদারিকে আইনি ভিত্তি দেয়। সেনাছাউনি ও তার আশপাশে বসবাসকারী যৌনকর্মীদের নাম নথিভুক্ত করতে হত। পুলিশ কোনও মহিলাকে যৌনকর্মী বলে সন্দেহ করলেই তাঁকে বাধ্যতামূলক শারীরিক পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারত। যৌনরোগ ধরা পড়লে তাঁকে তথাকথিত ‘লক হাসপাতাল’-এ আটকে রাখা হত। অথচ তাঁদের কাছে যাওয়া পুরুষ সৈন্যদের ক্ষেত্রে এমন পরীক্ষা বা বন্দিত্বের কোনও সমান্তরাল ব্যবস্থা ছিল না। অর্থাৎ জনস্বাস্থ্যের নামে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য ছিল কেবল নারীর শরীর।

দিল্লির ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছিল। ইতিহাসবিদ স্টিফেন লেগের গবেষণা দেখায়, শহরের যৌনপল্লিগুলি নথিভুক্ত করা, যৌনকর্মীদের পরীক্ষা করা এবং প্রশাসনের নিয়মের বাইরে থাকা মহিলাদের শাস্তি দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কাছাকাছি থাকা ব্রিটিশ সেনাদের স্বাস্থ্যরক্ষা। নারীটি অপরাধী কি না, পাচারের শিকার কি না, কিংবা তাঁর সম্মতি ছিল কি না—এই প্রশ্নগুলি ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় প্রায় অপ্রাসঙ্গিক ছিল। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের নজরদারির একটি ‘বিপজ্জনক শ্রেণি’।

পরবর্তী সময়ে ভারতীয় মধ্যবিত্তের একাংশের সামাজিক শুচিবায়ুও ব্রিটিশ প্রশাসনের এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মিশে যায়। যৌনকর্মীকে জনস্বাস্থ্যের বিপদ হিসেবে দেখার পাশাপাশি তাঁকে ‘নৈতিক দূষণ’-এর উৎস হিসেবেও চিহ্নিত করা শুরু হয়। সেই মানসিকতাই স্বাধীনতার বহু দশক পরে তৈরি কারাবিধিতে ‘দুশ্চরিত্র’ এবং ‘গুরুতর নৈতিক অধঃপতন’-এর মতো অস্পষ্ট শব্দের মাধ্যমে টিকে ছিল।

বিধানগুলি বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় সুপ্রিম কোর্টের ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক রায়ের সূত্র ধরে। সাংবাদিক সুকন্যা শান্তার আবেদনে আদালত বিভিন্ন রাজ্যের কারাগারে জাতের ভিত্তিতে বন্দি পৃথকীকরণ এবং নির্দিষ্ট জাতির বন্দিদের দিয়ে নিকৃষ্ট কাজ করানোর বিধান অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল। পরে আদালত জাত, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধকতা-সহ সব ধরনের কারাগার-বৈষম্য খতিয়ে দেখতে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা শুরু করে।

আদালতের সহায়ক হিসেবে নিযুক্ত প্রবীণ আইনজীবী এস মুরলীধর বিভিন্ন রাজ্যের কারাবিধি পরীক্ষা করে দেখেন, যৌনকর্মী, যৌনপল্লির পরিচালক এবং দালাল হিসেবে চিহ্নিত মহিলাদের আলাদা রাখার বিধান এখনও বহাল। তাঁর মতে, এই নিয়মের ভিত্তি হল এমন একটি অপ্রমাণিত ধারণা—এই মহিলাদের সংস্পর্শ অন্য বন্দিদের ‘খারাপ’ করে দিতে পারে। বাস্তবে পৃথকীকরণ তাঁদের সংশোধন বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না; বরং অপরাধী হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে সামাজিক কলঙ্ক আরও বাড়ায়।

সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক প্রজ্বলা বনাম ভারত সরকার রায়ও এই পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছে। আদালত বলেছে, যৌনপাচারের ক্ষেত্রে ‘অপরাধী’ ও ‘নির্যাতিতা’—এই সরল দ্বিভাজন অনেক সময় ভুল। প্রকাশ্যে খদ্দের আহ্বানের অভিযোগে যে মহিলাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, তিনিই একই সঙ্গে পাচার ও শোষণের শিকার হতে পারেন। অতএব পাচারকারীর বিচার যেমন জরুরি, তেমনই পাচারের শিকার ব্যক্তির সুরক্ষা, সহায়তা ও পুনর্বাসনও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এ পর্যন্ত দিল্লি ও হিমাচলপ্রদেশই সংশোধন কার্যকর করেছে। মহারাষ্ট্র, গোয়া, কর্নাটক ও রাজস্থান জানিয়েছে, সংশোধনের প্রস্তাব সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায়। অন্যদিকে অরুণাচলপ্রদেশ, গুজরাত, সিকিম, তামিলনাড়ু, ত্রিপুরা, উত্তরাখণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গ তখনও আদালতের সহায়কের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।

দিল্লির সিদ্ধান্ত তাই কয়েকটি শব্দ মুছে দেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে স্বীকার করা হল—কারাগারে একজন মহিলা কোন অপরাধে অভিযুক্ত, তার ভিত্তিতে নিরাপত্তাজনিত শ্রেণিবিভাগ করা যেতে পারে; কিন্তু তাঁর পেশা বা সমাজ-আরোপিত ‘চরিত্র’ বিচার করে তাঁকে নৈতিকভাবে অস্পৃশ্য ঘোষণা করা যায় না। ব্রিটিশ সেনার স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য তৈরি নারীবিদ্বেষী নজরদারি স্বাধীন দেশের কারাগারে আরও আগে বিলুপ্ত হওয়া উচিত ছিল। দিল্লি সেই কাজটি করল স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পরে।