খবর

৪২ বছর পরে ব্রুনেইয়ে সুকুমার কুরুপের ‘সন্ধান’, ছবির ব্যক্তিকে ঘিরে নতুন রহস্য

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: প্রায় ৪২ বছর ধরে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বেড়ানো কেরলের কুখ্যাত ফেরার আসামি সুকুমার কুরুপকে নাকি ব্রুনেইয়ে দেখা গিয়েছে—একটি মালয়ালম সংবাদমাধ্যমের এই…
  • তবে সংবাদমাধ্যমটি কুরুপ বলে যে বৃদ্ধের ছবি দেখিয়েছিল, তার পরিচয় নিয়ে ইতিমধ্যেই বড় প্রশ্ন উঠেছে।
  • ত্রিশূরের একটি পরিবার দাবি করেছে, ছবির মানুষটি সুকুমার কুরুপ নন; তিনি তাদের আত্মীয় দামোদর মেনন।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: প্রায় ৪২ বছর ধরে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বেড়ানো কেরলের কুখ্যাত ফেরার আসামি সুকুমার কুরুপকে নাকি ব্রুনেইয়ে দেখা গিয়েছে—একটি মালয়ালম সংবাদমাধ্যমের এই দাবি ঘিরে ফের চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তবে সংবাদমাধ্যমটি কুরুপ বলে যে বৃদ্ধের ছবি দেখিয়েছিল, তার পরিচয় নিয়ে ইতিমধ্যেই বড় প্রশ্ন উঠেছে। ত্রিশূরের একটি পরিবার দাবি করেছে, ছবির মানুষটি সুকুমার কুরুপ নন; তিনি তাদের আত্মীয় দামোদর মেনন।

১৯৮৪ সালের ২১ জানুয়ারি এক অপরিচিত ব্যক্তিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা, নিজের গাড়ির চালকের আসনে তাঁর দেহ বসিয়ে গাড়িতে আগুন লাগানো এবং সেই দেহকে নিজের বলে চালিয়ে আট লক্ষ টাকার জীবনবিমার অর্থ আদায়ের চেষ্টা—সুকুমার কুরুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল এমনই ভয়াবহ। কেরল পুলিশের দীর্ঘতম ব্যর্থ অনুসন্ধানগুলির অন্যতম হয়ে ওঠা এই ঘটনা লোককথার মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। ২০২১ সালে দুলকর সলমন অভিনীত ‘কুরুপ’ চলচ্চিত্রও এই ঘটনা থেকেই অনুপ্রাণিত।

চলতি সপ্তাহে মালয়ালম সংবাদ চ্যানেল ‘২৪ নিউজ’ দাবি করে, কুরুপকে ব্রুনেইয়ে দেখা গিয়েছে। তাদের বক্তব্য, সেখানে তিনি ছদ্মনামে বসবাস করছিলেন, নির্মাণক্ষেত্রে কাজ করতেন এবং খুব একটা কারও সঙ্গে মেলামেশা করতেন না। কিন্তু তাঁর কথার টান শুনে কয়েকজন কেরলবাসীর সন্দেহ হয়, ওই ব্যক্তিই সম্ভবত সুকুমার কুরুপ।

কেরলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ চেন্নিথালা অবশ্য জানিয়েছেন, সংবাদমাধ্যমের দাবি যাচাই করে দেখা হবে। তিনি বলেন, ‘‘এ নিয়ে নানা গুজব শোনা যাচ্ছে। আমি অপরাধ দমন শাখার অতিরিক্ত পুলিশ মহানির্দেশক এইচ ভেঙ্কটেশকে বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছি। সত্যতা যাচাই করতে রাজ্য পুলিশ ইন্টারপোলের সঙ্গেও যোগাযোগ করবে।’’

১৯৮৪ সালের চাকো হত্যাকাণ্ড

কেরলের আলাপ্পুঝা জেলার চেরিয়ানাড গ্রামের বাসিন্দা সুকুমার কুরুপ আবু ধাবির একটি পেট্রোলিয়াম সংস্থায় কাজ করতেন। হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি ছুটিতে বাড়ি ফিরেছিলেন।

পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালের ২১ জানুয়ারি কুরুপ তাঁর ভগ্নিপতি ভাস্কর পিল্লাই-সহ তিন সহযোগীকে নিয়ে কে জে চাকো নামে ৩১ বছর বয়সি এক ব্যক্তিকে অপহরণ ও হত্যা করেন। কুরুপের সঙ্গে চেহারার মিল রয়েছে, এমন কাউকে খুঁজছিল ওই দলটি। সেই সময় তাদের সঙ্গে চাকোর দেখা হয়। চলচ্চিত্র পরিবেশনা সংস্থার প্রতিনিধি চাকো বাড়ি ফেরার জন্য তাদের গাড়িতে উঠেছিলেন।

হত্যার মাত্র এক বছর আগে চাকোর সঙ্গে সান্থাম্মার বিয়ে হয়েছিল। তখন সান্থাম্মা ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তাঁদের ছেলে জিথিনের জন্মের আগেই বাবাকে হত্যা করা হয়। চার দশকেরও বেশি সময় পরেও সান্থাম্মা ও জিথিন বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।

অভিযোগ, গাড়ির ভিতরেই চাকোকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। পরে তাঁর দেহ কুরুপের গাড়ির চালকের আসনে বসিয়ে আলাপ্পুঝার মাভেলিকারা থানা এলাকার একটি ধানখেতে গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর সময় দেহটি এতটাই পুড়ে গিয়েছিল যে তা শনাক্ত করা সম্ভব ছিল না।

তবে ঘটনাস্থলে পাওয়া কয়েকটি সূত্র পুলিশের সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়। ধানখেত থেকে একটি দেশলাইয়ের বাক্স, রাবারের দস্তানা এবং একাধিক ব্যক্তির পায়ের ছাপ উদ্ধার হয়েছিল। তা থেকে বোঝা যায়, ঘটনার সময় সেখানে একাধিক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ছিল তদন্তের মোড় ঘোরানো সূত্র। জানা যায়, গাড়িতে আগুন লাগানোর আগেই ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর ফুসফুসে ধোঁয়া বা ছাইয়ের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ জীবন্ত অবস্থায় গাড়িতে আগুন লাগলে যে ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢোকার কথা, তা ঘটেনি।

প্রথম দিকে পুলিশ-সহ সকলেই ধরে নিয়েছিলেন, মৃত ব্যক্তি সুকুমার কুরুপ। এমনকি তাঁর শেষকৃত্যও সম্পন্ন হয়েছিল। পরে জানা যায়, পুড়ে যাওয়া দেহটি কুরুপের নয়; সেটি চাকোর। তিনি বাড়ি ফেরার জন্য ওই গাড়িতে উঠেছিলেন।

পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে উধাও

তদন্ত এগোতেই পুলিশ জানতে পারে, কুরুপ জীবিত এবং কোচিতে আত্মগোপন করে রয়েছেন। তাঁর নামে আট লক্ষ টাকার জীবনবিমা থাকার কথাও সামনে আসে। তদন্তকারীদের ধারণা, সেই বিমার টাকা হাতানোর জন্যই নিজের মৃত্যুর প্রমাণ তৈরি করতে চাকোকে হত্যা করা হয়েছিল।

কিন্তু পুলিশ পৌঁছনোর আগেই কুরুপ পালিয়ে যান। তাঁর ভগ্নিপতি ভাস্কর পিল্লাই এবং অন্য দুই সহযোগী পন্নাপ্পন ও শাহুকে গ্রেফতার করা হয়। পরে শাহু রাজসাক্ষী হন। ভাস্কর ও পন্নাপ্পনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। সাজা শেষ করে তাঁরা পরবর্তী সময়ে মুক্তি পান।

অন্য দিকে কুরুপের সন্ধানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ইন্টারপোলকেও সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু যাবতীয় চেষ্টা সত্ত্বেও কুরুপের নাগাল পাওয়া যায়নি।

১৯৮৮ সালে তদন্তকারীদের সামনে একটি সম্ভাব্য সূত্র আসে। কুরুপের গ্রাম চেরিয়ানাডের এক তরুণী নার্স বোকারোর একটি হাসপাতালে তাঁর মতো দেখতে এক ব্যক্তিকে দেখেছিলেন বলে জানা যায়। হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যার কথা জানিয়ে ‘জোশি’ নামে ওই ব্যক্তি হাসপাতালে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ পৌঁছনোর আগেই তিনি হাসপাতাল থেকে রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যান।

ব্রুনেইয়ের দাবি এবং ছবির বিভ্রান্তি

বৃহস্পতিবার ‘২৪ নিউজ’ দাবি করে, সুকুমার কুরুপ দীর্ঘদিন ধরে ছদ্মনামে ব্রুনেইয়ে বসবাস করছিলেন। তিনি নির্মাণশিল্পে কাজ করতেন এবং নিভৃতে জীবন কাটাতেন। কিন্তু তাঁর মালয়ালম উচ্চারণের বিশেষ টান থেকে কয়েকজন প্রবাসী কেরলবাসীর সন্দেহ হয়।

দাবির সমর্থনে চ্যানেলটি এক বৃদ্ধের ছবি দেখায়। এক প্রাক্তন পুলিশ আধিকারিকের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়। ওই আধিকারিকের দাবি, অতীতে মামলাটির যথেষ্ট গভীর তদন্ত হয়নি। কুরুপ এখনও জীবিত এবং পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও রয়েছে। চ্যানেলে দেখানো বৃদ্ধের ছবিটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু শুক্রবারই ঘটনায় নতুন মোড় আসে। ত্রিশূরের একটি পরিবার জানায়, ছবির বৃদ্ধ সুকুমার কুরুপ নন। তিনি তাদের আত্মীয় দামোদর মেনন, যিনি প্রায় ৪০ বছর আগে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন।

দামোদরের ছোট ভাই করুণাকর মেনন বলেন, ‘‘তিনি পরিবারের সঙ্গে মালয়েশিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।’’

ত্রিশূরের ওই পরিবারের সঙ্গে দেখা করা এক পুলিশ আধিকারিকও জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ছবির ব্যক্তিকে দামোদর মেনন বলেই শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, বর্তমানে মেনন অসুস্থ এবং তাঁকে ব্রুনেইয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ।

ব্রুনেইয়ে ভারতীয় হাইকমিশন সম্প্রতি মেননের দুরবস্থার কথা অনাবাসী কেরলবাসীদের কল্যাণে গঠিত কেরল সরকারের সংস্থা ‘নোরকা রুটস’-কে জানিয়েছিল এবং তাঁকে দেশে ফেরানো বা সহায়তা দেওয়ার জন্য হস্তক্ষেপ চেয়েছিল। গত মাসেই নোরকা বিষয়টি কেরল সরকারের নজরে আনে।

ফলে ব্রুনেইয়ে দেখা বৃদ্ধ সত্যিই সুকুমার কুরুপ কি না, সেই দাবি আপাতত গুরুতর প্রশ্নের মুখে। যে ছবিকে ঘিরে চার দশকের পুরনো রহস্যের সমাধানের আশা তৈরি হয়েছিল, সেটিই এখন পরিচয়-বিভ্রাটের নতুন কাহিনি হয়ে উঠেছে। পুলিশ ও ইন্টারপোলের যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত সুকুমার কুরুপের অবস্থান নিয়ে রহস্য থেকেই যাচ্ছে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles