প্রেসিডেন্সি জেলে আফতাব আনসারির সেলে তল্লাশি, উদ্ধার আইফোন, রাউটার ও নগদ টাকা

যা জানা জরুরি
- কলকাতার প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ফের গুরুতর প্রশ্ন উঠল।
- ২০০২ সালের কলকাতা আমেরিকান সেন্টার হামলা মামলায় দোষী সাব্যস্ত আফতাব আহমেদ আনসারির কারাকক্ষ থেকে তিনটি স্মার্টফোন, দু’টি রাউটার, তারহীন অন্তর্জাল সংযোগের সরঞ্জাম এবং ৩১…
- উদ্ধার হওয়া মুঠোফোনগুলির মধ্যে একটি দামি আইফোনও রয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কলকাতার প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ফের গুরুতর প্রশ্ন উঠল। ২০০২ সালের কলকাতা আমেরিকান সেন্টার হামলা মামলায় দোষী সাব্যস্ত আফতাব আহমেদ আনসারির কারাকক্ষ থেকে তিনটি স্মার্টফোন, দু’টি রাউটার, তারহীন অন্তর্জাল সংযোগের সরঞ্জাম এবং ৩১ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া মুঠোফোনগুলির মধ্যে একটি দামি আইফোনও রয়েছে। জেলের মতো কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত জায়গায় এতগুলি নিষিদ্ধ সামগ্রী কীভাবে পৌঁছল, তা জানতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
আফতাব বর্তমানে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের ১৪ নম্বর কারাকক্ষে বন্দি। সংশোধনাগার সূত্রে জানা গিয়েছে, কারাগারে বসে তিনি মুঠোফোন ব্যবহার করছেন এবং অন্তর্জালে যোগাযোগ রাখছেন—এমন নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর ২৩ আগস্ট তাঁর কারাকক্ষে আচমকা তল্লাশি চালানো হয়। তাঁর পোশাক ও বিছানার মধ্যে লুকিয়ে রাখা তিনটি মুঠোফোন উদ্ধার করেন কারাকর্মীরা। পরে গোটা কক্ষ খুঁজে পাওয়া যায় দু’টি রাউটার, একটি বহনযোগ্য তারহীন অন্তর্জাল-সংযোগ যন্ত্র, তিনটি সিমকার্ড, দু’টি কার্ড রিডার, একটি পেন ড্রাইভ, তারহীন কানে শোনার যন্ত্র, ওটিজি সংযোগকারী এবং একাধিক তার।
এক কারা আধিকারিক জানিয়েছেন, আফতাবের কক্ষ থেকে ৫০০ টাকার নোটে মোট ৩১ হাজার টাকা পাওয়া গিয়েছে। কারাগারে বন্দির কাছে এত নগদ অর্থ রাখাও নিয়মবিরুদ্ধ। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর তালিকা প্রস্তুত করার পর সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষ হেস্টিংস থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। শুক্রবার সেই অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু করেছে পুলিশ।
এক প্রবীণ পুলিশ আধিকারিক বলেন, আফতাবের কক্ষ থেকে কয়েকটি বৈদ্যুতিন যোগাযোগের সরঞ্জাম উদ্ধার হয়েছে। মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তিনি ওই যন্ত্রগুলি কত দিন ধরে ব্যবহার করছিলেন, কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং যোগাযোগের উদ্দেশ্য কী ছিল—সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের বিশেষ উদ্বেগ, আফতাব ওই মুঠোফোন ও অন্তর্জাল-সংযোগ ব্যবহার করে দেশের বাইরে কারও সঙ্গে কথা বলেছিলেন কি না। উদ্ধার হওয়া সিমকার্ডগুলির নথিভুক্ত মালিকের পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে। মুঠোফোনের কলের বিবরণ, বার্তা, অন্তর্জাল ব্যবহারের ইতিহাস এবং পেন ড্রাইভে রাখা তথ্যও পরীক্ষা করা হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তিনি বিদেশে কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন বলে নিশ্চিতভাবে জানায়নি পুলিশ।
একই সঙ্গে খোঁজা হচ্ছে, মুঠোফোন, রাউটার ও নগদ টাকা আফতাবের কাছে পৌঁছে দিল কে। সংশোধনাগারের এক বা একাধিক কর্মী, বাইরের দর্শনার্থী অথবা কোনও বন্দির সাহায্য ছাড়া এতগুলি সামগ্রী একটি উচ্চ নিরাপত্তার কারাকক্ষে পৌঁছনো সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রবেশপথে তল্লাশি এবং নজরদারি ব্যবস্থা এড়িয়ে কীভাবে ওই সব জিনিস ভিতরে গেল, তা-ও তদন্তের অন্যতম বিষয়।
কয়েক মাস আগেই বন্দিদের মুঠোফোন ব্যবহারের অভিযোগে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের সুপার এবং মুখ্য নিয়ন্ত্রককে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। গত ১৫ মে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের ভিতরে স্মার্টফোন-সহ মুঠোফোনের যথেচ্ছ ব্যবহার চলছে এবং কারা দফতরের একাংশের কর্মী এর সঙ্গে যুক্ত। কারা কর্তৃপক্ষ ও কলকাতা পুলিশের যৌথ অভিযানে জেল চত্বর থেকে ২৩টি মুঠোফোন উদ্ধারের কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ ছিল, রাজ্যের অপরাধচক্রের একাংশ কারাগারের ভিতর থেকে পরিচালিত হচ্ছে। মুঠোফোন ও সিমকার্ড কীভাবে সংশোধনাগারে ঢুকছে, তা অনুসন্ধানের জন্য তিনি সিআইডি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই পদক্ষেপের কয়েক মাসের মধ্যেই আফতাবের কক্ষ থেকে যোগাযোগের এত সরঞ্জাম উদ্ধার হওয়ায় নিরাপত্তা সংস্কার কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি হয়েছে।
২০০২ সালের ২২ জানুয়ারি কলকাতার আমেরিকান সেন্টারের সামনে মোটরসাইকেলে আসা দুই বন্দুকধারী নিরাপত্তারক্ষীদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালায়। সেই হামলায় চার পুলিশকর্মী-সহ পাঁচজন নিহত এবং ২০ জন আহত হন। হামলার ষড়যন্ত্রে মূল ভূমিকা নেওয়ার অভিযোগে আফতাব আনসারি দোষী সাব্যস্ত হন। তিনি বর্তমানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
এমন এক দণ্ডিত বন্দির কাছে আইফোন, একাধিক সিমকার্ড, রাউটার ও নগদ টাকা উদ্ধারের ঘটনাকে সাধারণ কারাবিধি লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন না তদন্তকারীরা। কারাগারের ভিতরের সম্ভাব্য সহযোগী চক্র শনাক্ত করার পাশাপাশি আফতাবের বৈদ্যুতিন যোগাযোগের সম্পূর্ণ গতিপথ বার করাই এখন পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



