International

ইরানের ‘না’ আমেরিকাকে

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে বিভিন্ন দেশের উপর চাপ বাড়াচ্ছে আমেরিকা।
  • তারই মধ্যে মিশরের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ‘ব্যাঙ্ক মিসর’-এর সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ছ’টি শাখাকে মার্কিন ডলার-ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে ওয়াশিংটন।
  • পাল্টা তেহরানের অভিযোগ, এই পদক্ষেপ ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ এবং ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে বিভিন্ন দেশের উপর চাপ বাড়াচ্ছে আমেরিকা। তারই মধ্যে মিশরের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ‘ব্যাঙ্ক মিসর’-এর সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ছ’টি শাখাকে মার্কিন ডলার-ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে ওয়াশিংটন। পাল্টা তেহরানের অভিযোগ, এই পদক্ষেপ ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ এবং ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’। বিশ্বের অন্য দেশগুলিকেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানিয়েছে ইরান।

শুক্রবার ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনও দেশই আমেরিকার একতরফা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে বাধ্য নয়। বরং এমন নিষেধাজ্ঞায় অংশ নেওয়া মানে একটি দেশের ‘বেআইনি ইচ্ছা’ অন্য স্বাধীন রাষ্ট্রের উপর চাপিয়ে দিতে সহযোগিতা করা। তেহরানের দাবি, এই নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে—স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পরিষেবা সবই এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং তার সদস্য দেশগুলিকে আন্তর্জাতিক আইনের শাসন রক্ষায় এগিয়ে আসারও আবেদন জানিয়েছে ইরান।

‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর ছ’মাস পূর্ণ হওয়ার মুখে নতুন আর্থিক চাপের অভিযান শুরু করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট এই অভিযানকে বলেছেন ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’।

ওয়াশিংটনের বার্তাও স্পষ্ট—ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে গেলে শুধু তেহরান নয়, সংশ্লিষ্ট দেশ বা সংস্থাকেও দ্বিতীয় স্তরের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে।

নতুন পদক্ষেপের মূল নিশানায় ব্যাঙ্ক মিসরের আমিরশাহি শাখাগুলি। মার্কিন অর্থ দফতরের অভিযোগ, এই ছ’টি শাখা ইরান সরকারের ডলার পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ইরানের ছায়া-ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার অংশ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, এমন ১০৩টি সংস্থার হয়ে প্রায় ১৮০ কোটি ডলারের লেনদেন করেছে ওই শাখাগুলি।

আমেরিকার আর্থিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ একটি নতুন বিধি প্রস্তাব করেছে। সেটি চূড়ান্ত হলে ব্যাঙ্ক মিসরের আমিরশাহির শাখাগুলি মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারবে না।

তবে নিষেধাজ্ঞার আওতা আপাতত কেবল আমিরশাহির শাখাগুলিতেই সীমাবদ্ধ। কায়রোর প্রধান কার্যালয় এবং প্যারিস, ফ্রাঙ্কফুর্ট, রিয়াধ, বৈরুত ও জিবুতির শাখাগুলি এর আওতায় পড়ছে না। মিশরের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কও জানিয়েছে, মার্কিন পদক্ষেপ মূলত ওই শাখাগুলির ডলার লেনদেনকেই লক্ষ্য করেছে। বিষয়টি নিয়ে কায়রো ইতিমধ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে।

ব্যাঙ্ক মেল্লিও নিশানায়

শুধু মিশরের ব্যাঙ্ক নয়। ইরানের ব্যাঙ্ক মেল্লির আমিরশাহির শাখার ব্যবস্থাপক রেজা মহম্মদ তায়েদি এবং হংকংয়ের একটি সংস্থার বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আমেরিকা।

মার্কিন অভিযোগ, হংকংয়ের ওই সংস্থা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি ইরানি বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানের হয়ে অর্থ পাচারে সাহায্য করেছে।

মার্কিন বিদেশ দফতরের দাবি, ব্যাঙ্ক মেল্লি ইরানের সশস্ত্র বাহিনী, ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের কুদস বাহিনী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে।

অর্থনীতি কতটা চাপে?

নতুন নিষেধাজ্ঞা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুদ্ধ এবং নৌ-অবরোধের চাপে ইরানের অর্থনীতি কার্যত বিপর্যস্ত।

গত মাসে দেশটির বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধির হার ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের দাবি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানি বন্দরগুলির উপর নৌ-অবরোধের জেরে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে গিয়েছে।

মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবং বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় সংহতি ক্ষুণ্ণ করতে পারে—এমন মন্তব্য বা পদক্ষেপ থেকে সরকারি কর্তাদের বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা মোজতবা খামেনেই।

সরকারের অন্দরে আশঙ্কা, অর্থনৈতিক দুর্দশা আরও বাড়লে তা নতুন করে গণবিক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।

হরমুজেই আটকে শান্তি

এর মধ্যে যুদ্ধ থামানো এবং হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক নৌ-চলাচল ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে কাতার ও পাকিস্তান।

যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহণ করা হত। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মহম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানি তেহরান সফরে গিয়ে ইরানি নেতৃত্বকে যুদ্ধ-পূর্ব অবাধ নৌ-চলাচল ফিরিয়ে আনার অনুরোধ জানিয়েছেন।

ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সেই আলোচনাকে ‘সৃজনশীল’ বলে বর্ণনা করলেও তেহরানের অবস্থান স্পষ্ট—আমেরিকাকে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের নীতি ছেড়ে আলোচনার টেবিলে ফিরতে হবে।

ইরানের শর্তও কম নয়। বন্দরগুলির উপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তেহরান।

ওয়াশিংটন অবশ্য হরমুজ প্রণালী খোলা রয়েছে বলে দাবি করছে। ইরান সেই দাবি অস্বীকার করেছে। তেহরানের অনুমতি ছাড়া চলাচলকারী জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারির জেরে অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ এখনও এই জলপথ এড়িয়ে চলছে।

পরিসংখ্যানেও তার ছাপ স্পষ্ট। বৃহস্পতিবার মাত্র সাতটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী পার হয়েছে। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১৭।

অর্থাৎ, এক দিকে নতুন আর্থিক নিষেধাজ্ঞায় ইরানের উপর চাপ বাড়ছে, অন্য দিকে হরমুজে অচলাবস্থা বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহকে অনিশ্চিত করে তুলছে। এমন পরিস্থিতিতে শান্তির আলোচনা শুধু কূটনৈতিক সমঝোতার বিষয় নয়—তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে অর্থনীতি, জ্বালানি এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তাও।

তেহরান বলছে, চাপ নয়, আলোচনাই পথ। ওয়াশিংটনের বার্তা আবার উল্টো—চাপই আলোচনার দরজা খুলবে। এই দুই বিপরীত অবস্থানের মাঝেই আটকে রয়েছে যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles