নেপালে ধ্বংসলীলা, এখনও নিখোঁজ প্রায় ২৫০০

যা জানা জরুরি
- হিমবাহ ধসের পরে তৈরি নতুন হ্রদ উপচে আবার ভয়াবহ বন্যা নামার আশঙ্কা আপাতত কিছুটা কমেছে।
- ফলে নেপাল ও চিনের তিব্বতে শুক্রবার সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখা উদ্ধার অভিযান আবার শুরু হয়েছে।
- তবে বিপর্যস্ত হিমালয় অঞ্চলে বিপদ পুরোপুরি কাটেনি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
হিমবাহ ধসের পরে তৈরি নতুন হ্রদ উপচে আবার ভয়াবহ বন্যা নামার আশঙ্কা আপাতত কিছুটা কমেছে। ফলে নেপাল ও চিনের তিব্বতে শুক্রবার সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখা উদ্ধার অভিযান আবার শুরু হয়েছে। তবে বিপর্যস্ত হিমালয় অঞ্চলে বিপদ পুরোপুরি কাটেনি। পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা বরফ, আলগা পাথর এবং ধ্বংসাবশেষ যে কোনও সময় নতুন ধস নামাতে পারে। বৃষ্টিও উদ্ধারকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
বুধবার একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ার পর পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত পাহাড়ি নদী দিয়ে নেমে এসেছিল। সেই আকস্মিক বন্যায় নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং চিনের তিব্বতের গিরং কাউন্টি বিধ্বস্ত হয়। নেপালের বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের শুক্রবারের হিসাব অনুযায়ী, সে দেশে অন্তত ৫৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১,৯২৪ জন নিখোঁজ। তিব্বতে অন্তত সাতজনের মৃত্যু এবং ৫৫৮ জনের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ, দুই দেশ মিলিয়ে এখনও প্রায় আড়াই হাজার মানুষের সন্ধান নেই। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি; তাঁদের বড় অংশ ভারতীয় তীর্থযাত্রী।
হিমবাহ ধসের সঙ্গে নেমে আসা পাথর ও কাদা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দেওয়ায় সীমান্তের উজানে একটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়। সেখানে ক্রমাগত জল জমে শুক্রবার তার ধারণক্ষমতা ২৫ লক্ষ ঘনমিটার ছাড়িয়ে যায়। বৃহস্পতিবার ওই হ্রদে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লক্ষ ঘনমিটার জল ছিল। দ্রুত জল বাড়তে থাকায় বাঁধের মতো জমে থাকা ধ্বংসাবশেষ ভেঙে নতুন বন্যা নামার আশঙ্কা দেখা দেয়।
পরে হ্রদের জল কিনারা ছাপিয়ে লেন্দে খোলা নদীতে এবং সেখান থেকে ত্রিশূলী নদীতে ঢুকতে শুরু করে। এতে নেপালের রসুয়া ও নুওয়াকোট জেলায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়ায়। নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষকে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়। উদ্ধারকারীদেরও নদী ও ধসপ্রবণ অঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। নেপালে প্রায় তিন ঘণ্টা উদ্ধারকাজ বন্ধ থাকে। চিনের দিকেও উদ্ধারকারী ও যানবাহনগুলিকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের নিরাপদ এলাকায় অপেক্ষা করতে বলা হয়।
আকাশপথে পর্যবেক্ষণ এবং ত্রিমাত্রিক মানচিত্রের সাহায্যে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পরে চিনা কর্তৃপক্ষ জানায়, হ্রদের জল উপচে পড়া বন্ধ হয়েছে এবং তাৎক্ষণিক ঝুঁকি এখন নিয়ন্ত্রণযোগ্য। দুপুরের পরে গিরংয়ে উদ্ধার অভিযান আবার শুরু হয়। নেপাল সেনার মুখপাত্র রাজা রাম বসনেত জানিয়েছেন, সতর্কতা জারির পরে অভিযান বন্ধ করা হলেও নদীর জল শেষ পর্যন্ত প্রায় দু’ফুট বেড়েছিল। তাই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সেনা, পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ফের কাজে নামে। নেপালের সেনা রসুয়ার বন্যাবিধ্বস্ত একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে দু’জনকে উদ্ধার করেছে। সেখানে আরও অনেকে আটকে থাকতে পারেন।
বন্যায় কাঠমান্ডু থেকে তিব্বতের লাসা যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বহু অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। ভেসে গিয়েছে সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঘরবাড়ি ও জনপদ। গিরং সীমান্তবন্দর কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। একুশ সদস্যের একটি চিনা উদ্ধারকারী দল পাহাড়, অরণ্য ও খাড়া খাদ পেরিয়ে দড়ির সাহায্যে প্রথম সেখানে পৌঁছয়। উদ্ধারকারী ঝৌ মিংচি জানিয়েছেন, যাওয়ার মতো কোনও রাস্তা অবশিষ্ট ছিল না; চারদিকে কেবল অরণ্য ও খাড়া পাহাড়। সীমান্তবন্দরে পৌঁছে তাঁরা “ধ্বংসস্তূপ ছাড়া কিছুই” দেখতে পাননি।
রেড ক্রসের হিসাবে, এই বিপর্যয়ে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ধ্বংসাবশেষে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু জায়গায় ত্রাণের গাড়ি পৌঁছতে পারছে না। হেলিকপ্টারে দুর্গতদের সরানোর পাশাপাশি খাদ্য, পানীয় জল ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কাদা ও পাথরের গভীর স্তরের নীচে জীবিতদের খুঁজতে ভারী যন্ত্র এবং প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করা হচ্ছে।
চিনের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব হিমবাহ-হ্রদ, ভূমিধস এবং প্রাকৃতিক বাঁধে তৈরি হ্রদগুলির উপর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সভাপতিত্বে বৈঠকে দেশি-বিদেশি সব নিখোঁজ মানুষকে খুঁজতে সর্বশক্তি প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। নেপালকে জরুরি সহায়তা এবং সীমান্তবর্তী বিপর্যয় মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাত বিপদ কমলেও উজানের হ্রদগুলির জল সম্পূর্ণ ও নিরাপদ ভাবে বেরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত স্বস্তির কারণ নেই। নতুন বৃষ্টি, বরফধস কিংবা আলগা পাথরের পতন ফের নদীর প্রবাহ আটকে দিতে পারে। তাই উদ্ধার অভিযান শুরু হলেও নদীতীরবর্তী মানুষ ও উদ্ধারকারীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, পাহাড়ের অস্থির ভূপ্রকৃতি এবং যোগাযোগব্যবস্থার বিপুল ক্ষতিই এখন নিখোঁজদের সন্ধানে সবচেয়ে বড় বাধা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



