হিমালয়ের পাহাড়চূড়া থেকে বিশাল একটি হিমবাহ ভেঙে নীচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ার পর কয়েক দিন কেটে গিয়েছে। নেপাল ও তিব্বতে তার জেরে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার ধ্বংসলীলা কতটা ব্যাপক, সেই ছবি এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি।

তবে চিনের তুলনায় নেপালে পরিস্থিতির ছবিটা অনেক দ্রুত সামনে আসছে। চিনের অন্যতম স্পর্শকাতর অঞ্চল তিব্বত থেকে তথ্য প্রকাশের উপরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকায় সেখানে কী ঘটেছে, তা জানার পথে বাধা তৈরি হচ্ছে।

নেপাল ও চিনের তিব্বত অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত হিমালয়ের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিকে তছনছ করে দিয়েছে এই বন্যা। শুক্রবার নেপালে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫৩৮। অথচ চিনে সেই সংখ্যা মাত্র পাঁচ—যদিও গিরং সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রের আশপাশের গ্রামগুলিতে কয়েক হাজার মানুষের বাস।

নেপালে সাংবাদিকেরা বিপর্যয়স্থলের যতটা সম্ভব কাছে পৌঁছে বেঁচে ফেরা মানুষ এবং উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বন্যা যখন ঘরবাড়ির উপর দিয়ে বয়ে যায়, তখন ঠিক কী ঘটেছিল, গ্রামবাসীরা তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন। এই বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ অবশ্য বিজ্ঞানীরা এখনও খতিয়ে দেখছেন।

চিনে সরকারি সংবাদমাধ্যম বন্যা নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন সম্প্রচার করেছে। ঘটনাস্থলে নিজেদের সাংবাদিকও পাঠিয়েছে। কিন্তু সেই সব প্রতিবেদনে ধ্বংসের ব্যাপকতার চেয়ে উদ্ধারকাজের উপরেই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। তিব্বতের একটি ত্রাণকেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, সাংবাদিকের পিছনে বহু মানুষ বসে থাকলেও তিনি তাঁদের কারও সঙ্গে কথা বলছেন না।

১৯৫০-এর দশকে চিনের নিয়ন্ত্রণে আসা তিব্বত দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল। বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসন ও ধর্মীয় স্বাধীনতার দাবিতে তিব্বতিদের বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদ—যার মধ্যে আত্মদাহও রয়েছে—কঠোর হাতে দমন করেছে প্রশাসন। সরকারের কঠোরভাবে নির্ধারিত সফরসূচির বাইরে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকেরা তিব্বতে যেতে পারেন না। বহু তিব্বতিকে পাসপোর্ট দেওয়া হয় না। বাইরের জগতের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগও অত্যন্ত সীমিত। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য তিব্বতিরা শাস্তির মুখে পড়তে পারেন। তিব্বতি ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বেজিংয়ের নীতির সমালোচনা বহু বছর ধরে করে আসছে মানবাধিকার সংগঠনগুলি। অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ওই ভাষা ও সংস্কৃতির উপর আক্রমণ চলছে।

এই পরিস্থিতিতে সীমান্তের তিব্বতি অংশে আকস্মিক বন্যা কতটা ক্ষতি করেছে, তার স্বাধীন মূল্যায়ন করা কঠিন।

লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়না ইনস্টিটিউটের অধিকর্তা স্টিভ সাং বলেন, “তিব্বত-সংক্রান্ত সব কিছুকেই জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়। ফলে সর্বোচ্চ স্তরের অনুমোদন ছাড়া কেউ কিছু বলবেন না, কিছু জানাবেনও না।”

ঘটনাস্থলে থাকা যে কারও ক্ষেত্রে এর অর্থ হল, “আপনি নিজের চোখে আরও বেশি মৃতদেহ দেখলেও মৃতের সংখ্যা বেশি বলে জানাতে পারবেন না—যতক্ষণ না সরকারি বিবৃতিতে বলা হচ্ছে যে সংখ্যাটা বেড়েছে।”

তথ্যের উপর চিনের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে সে দেশের ত্রাণ ও উদ্ধারকাজও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সীমিত জায়গা পাচ্ছে। এর ফলে নিজেদের সাফল্যের কথা তুলে ধরার একটি সুযোগ হয়তো হাতছাড়া করছে চিন।

পিপলস লিবারেশন আর্মি-সহ চিনের জরুরি পরিষেবাগুলির হাতে নেপালের তুলনায় অনেক বেশি সম্পদ ও সরঞ্জাম রয়েছে। দুর্গম পার্বত্য এলাকায়, যেখানে পরিস্থিতি এখনও বিপজ্জনক, সেখানে কাজ করতে বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন। চিন কয়েকশো জরুরি পরিষেবাকর্মী পাঠিয়েছে। কিন্তু তাঁরা কী করছেন, তার বিস্তারিত তথ্য খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে।

সাং বলেন, “চিনারা একটা সুযোগ হাতছাড়া করেছে।” কিন্তু “ওদের সেই আত্মবিশ্বাস নেই। নিয়ন্ত্রণ করাই ওদের স্বভাবগত প্রতিক্রিয়া।”

তবে এই বিপর্যয় যে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়, তা জোর দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে চিন। সরকারি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, উদ্ধারকাজে নির্দেশ দিতে শুক্রবার একটি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন চিনের নেতা শি জিনপিং। তিনি কর্তৃপক্ষকে বলেন, “চিন ও বিদেশের নিখোঁজ মানুষদের খুঁজে বার করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।”

নিজের পরেই শীর্ষপদে থাকা প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংকেও দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে পাঠিয়েছেন শি। সরকারি সংবাদ সংস্থা শিনহুয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, লি “জোর দিয়ে বলেছেন যে সাধারণ সম্পাদক শি জিনপিং বিপর্যস্ত এলাকার মানুষদের নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।”