International

আকাশে আগুন, মাটিতে যুদ্ধ

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ যেন নতুন এক ভয়াবহ পর্যায়ে ঢুকে পড়েছে।
  • রণাঙ্গনে অগ্রগতি সীমিত হলেও আকাশপথে হামলা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
  • দু’পক্ষের হাতেই বেড়েছে ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ যেন নতুন এক ভয়াবহ পর্যায়ে ঢুকে পড়েছে। রণাঙ্গনে অগ্রগতি সীমিত হলেও আকাশপথে হামলা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। দু’পক্ষের হাতেই বেড়েছে ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত। কিন্তু সেই তুলনায় আকাশ প্রতিরক্ষা এখনও অপ্রতুল। ফল—বাড়ছে ধ্বংস, ছড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধের অভিঘাত, ঝরছে অসামরিক মানুষের প্রাণ।

গত সপ্তাহেই রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঝাঁক আছড়ে পড়ে কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায়। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল একটি শিশু হাসপাতাল, স্কুল, আবাসন এবং গুদাম। প্রাণ হারান অন্তত ১৬ জন। প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি থাকায় রাশিয়ার ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোও কঠিন হয়ে পড়ে ইউক্রেনের পক্ষে।

জবাব এসেছে কিয়েভের দিক থেকেও। বুধবার ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় নিঝনি নভগোরদের কাছে রাশিয়ার অন্যতম বড় তেল শোধনাগারে ভয়াবহ আগুন লাগে। মধ্য রাশিয়ার তাম্বভ অঞ্চলে আগুন ধরে যায় অনলাইন বিপণন সংস্থা ওয়াইল্ডবেরিজের একটি বড় গুদামেও।

অর্থাৎ, আকাশপথ এখন কার্যত আর এক যুদ্ধক্ষেত্র।

মস্কোর লক্ষ্য স্পষ্ট—ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের উপর এমন চাপ তৈরি করা, যাতে দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি রাজনৈতিক আত্মসমর্পণের দিকে ঠেলে দেয়। কিয়েভের হিসাবও কম কঠিন নয়। রাশিয়ার তেলশিল্প, সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং যুদ্ধ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় আঘাত হেনে মস্কোর যুদ্ধ চালানোর ক্ষমতাকেই চাপে ফেলতে চাইছে তারা।

কিন্তু সমস্যা হল, কোনও পক্ষই এখনও ভেঙে পড়ার মতো অবস্থায় পৌঁছয়নি। যুদ্ধ যত নির্মম হচ্ছে, শান্তির পথ ততই যেন দূরে সরে যাচ্ছে।

রাশিয়ার তেলশিল্পে ইউক্রেনের হামলার জবাবে আরও বিস্তৃত পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গত সপ্তাহে তাঁর কটাক্ষ, “কিয়েভের শাসকগোষ্ঠী আমাদের অর্থনীতির ক্ষতি করতে নেমেছিল। কী করল তারা? নিজেরাই এই বিপদের বাক্স খুলে দিল।”

যন্ত্রণা দিয়ে জয়?

রাশিয়া ও ইউক্রেন দু’পক্ষই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দূরপাল্লার হামলা চালাচ্ছে। তবে লক্ষ্য এক হলেও কৌশল আলাদা।

২০২২ সালের শরৎ থেকেই ইউক্রেনের জ্বালানি পরিকাঠামোকে নিশানা করে পরিকল্পিত হামলা শুরু করে রাশিয়া। রণাঙ্গনে অগ্রগতি থমকে যাওয়ার পর শীতের আগে কিয়েভকে অন্যভাবে চাপে ফেলাই ছিল উদ্দেশ্য—বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে, শহরগুলিকে ঠান্ডা ও অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের মনোবল ভেঙে দেওয়া।

চারটি শীত পেরিয়ে সেই কৌশল পুরোপুরি সফল হয়নি।

ইউক্রেনীয়রা বিদ্যুৎ সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মেরামত, রক্ষা এবং প্রয়োজনমতো প্রতিস্থাপন করে শহরগুলিকে সচল রেখেছেন। যদিও প্রতি বছরই দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে।

এ বার অবশ্য নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি নিয়ে। আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বজুড়েই এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জোগান কমেছে। এর মধ্যে রাশিয়ার দূরপাল্লার হামলায় চলতি গ্রীষ্মে ইউক্রেনে শত শত অসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। প্রাণহানির বড় অংশের জন্য দায়ী ইস্কান্দার-এম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।

কিয়েভে এখন আশঙ্কা, শীত ঘনিয়ে এলে রাশিয়া হয়তো আরও দুর্বল জায়গায় আঘাত হানবে—শহরের জল সরবরাহ কিংবা নিকাশি ব্যবস্থায়। রাজধানীর পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠলে সাময়িকভাবে গ্রামাঞ্চলে সরে যাওয়ার কথাও ভাবছেন কেউ কেউ।

তবে তাতে রাশিয়া শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে—এমনটা বিশ্বাস করেন খুব কম মানুষই।

ভিয়েনায় কর্মরত সামরিক বিশ্লেষক এবং গ্যাডি কনসাল্টিংয়ের প্রধান ফ্রান্ৎস-স্টেফান গ্যাডির মতে, তত্ত্বটি সহজ: “যন্ত্রণা আর ক্লান্তি মিলে রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ ঘটায়।” কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। তাঁর মতে, ২০২২ সালের অভিজ্ঞতা এবং গত এক শতাব্দীর কৌশলগত বোমাবর্ষণের ইতিহাস দেখিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি আকাশ হামলা অনেক সময় সমাজকে ভেঙে দেওয়ার বদলে আরও দৃঢ় করে তোলে। ইউক্রেনেও এখনও তার বিপরীত কোনও লক্ষণ নেই।

বরং সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, মস্কোর কাছে ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার বিরোধিতা ইউক্রেনীয়দের মধ্যে আরও বেড়েছে।

ড্রোনে নতুন খেলা

রাশিয়ার লাগাতার হামলা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি শিল্পকে থামাতে পারেনি। বরং উল্টোটা ঘটেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এবং কঠোর গোপনীয়তায় পরিচালিত উৎপাদনকেন্দ্রগুলিতে এখন বছরে লক্ষ লক্ষ ড্রোন তৈরি হচ্ছে।

পশ্চিমি মিত্রদের কাছ থেকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের জোগান সীমিত। তাই একসঙ্গে বহু রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা ঠেকাতে কিয়েভকে বিকল্প কৌশল খুঁজতে হচ্ছে।

তারই একটি হল রাশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ড্রোন দিয়ে ধ্বংস করা। উদ্দেশ্য শুধু প্রতিরক্ষা ভেদ করা নয়—রুশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযানগুলিকে খুঁজে বের করে আঘাত করার পথও তৈরি করা। এমনকি তুলনামূলক কম পাল্লার ইস্কান্দার-এম উৎক্ষেপণযানও ভবিষ্যতে লক্ষ্য হতে পারে।

কিয়েভে কর্মরত সামরিক বিশ্লেষক এবং ফিলাডেলফিয়ার ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক রব লির মতে, আকাশে বিপুল সংখ্যক ড্রোন ঘুরতে থাকলে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযানগুলিকে আরও ভালোভাবে লুকিয়ে রাখতে হবে, কিংবা পিছিয়ে যেতে হবে। তাতে রাশিয়ার কাজ কঠিন হবে, যদিও সমস্যার পুরো সমাধান হবে না।

আর বিপদ শুধু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে আটকে নেই।

রাশিয়া জেট ইঞ্জিনচালিত ড্রোনের মজুতও বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানি শাহেদ ড্রোনের আদলে তৈরি গেরান-৫। রয়েছে তুলনামূলক কম খরচের বান্দেরোল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও। দাম কম হওয়ায় এগুলি বিপুল সংখ্যায় তৈরি করা সম্ভব। ফলে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার উপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

পুতিনের হিসাব

গত এক বছরে রাশিয়ার গভীরে আঘাত হানার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে ইউক্রেন। আগে তাদের হামলার মূল লক্ষ্য ছিল তেল শোধনাগার, জ্বালানি রফতানির পরিকাঠামো এবং ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা। এখন সেই তালিকায় ঢুকেছে কৃষ্ণসাগরের জাহাজ চলাচল এবং রাশিয়ার বড় অনলাইন বিপণন সংস্থা ওয়াইল্ডবেরিজ ও ওজোনের গুদামও।

এই হামলাগুলিতে অসামরিক মানুষেরও মৃত্যু হচ্ছে। তবে রাশিয়ার হামলার তুলনায় তার মাত্রা এখনও কম।

কিয়েভের লক্ষ্য মূলত তিনটি—রুশ সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থায় আঘাত করা, যুদ্ধের অর্থ জোগানো রফতানি আয় কমানো এবং দেশের অর্থনীতিতে এমন চাপ তৈরি করা, যাতে যুদ্ধের মূল্য সাধারণ রুশ নাগরিকের কাছেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কিন্তু এখানেও বড় প্রশ্ন—এই চাপ কি পুতিনকে থামাতে পারবে?

রাশিয়ার সাধারণ মানুষ বা দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের অসন্তোষ ক্রমে বাড়লেও, তা প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর মতো পর্যায়ে পৌঁছবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। পুতিনের হিসাব বরং অন্য রকম। তাঁর ধারণা, অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং ইউক্রেন যত দিন যুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে পারবে, রাশিয়ার অর্থনীতি তার চেয়েও দীর্ঘ সময় এই চাপ সহ্য করতে পারবে।

ক্যালিফোর্নিয়ার মন্টেরেরি-র জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের রাশিয়া-বিশেষজ্ঞ হানা নোটের মতে, পুতিনের হিসাব বদলাতে হলে রাশিয়ার সমাজ ও অর্থনীতিতে ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলার প্রভাব এখনকার তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হতে হবে।

অর্থাৎ, আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বাড়ছে, ড্রোনের ঝাঁক আরও ঘন হচ্ছে, ধ্বংসের পরিধিও বাড়ছে। কিন্তু যুদ্ধের আসল প্রশ্নটির উত্তর এখনও অধরা—কতটা ধ্বংস হলে দু’পক্ষই থামবে?

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles