ভিজিৎ অধিকারী: প্রথম দেখায় দু’টিকে একই রকম মনে হতে পারে। দু’জনের গায়েই কালো ছাপ। কিন্তু সেই ছাপের ধরন, শরীরের গড়ন, চলাফেরা, নখ, বাসস্থান এবং শিকারের কৌশল খেয়াল করলেই চিতা ও চিতাবাঘকে আলাদা করে চেনা যায়।

দু’টিই বন্য মার্জারজাতীয় প্রাণী হলেও বিবর্তনের ধারায় তাদের শাখা আলাদা। বন্যপ্রাণের আলোকচিত্রী ও পরিবেশকর্মী ইন্দ্রজিৎ ঘোরপড়ে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে জানিয়েছেন, এই দুই প্রাণীর পার্থক্য বুঝতে হলে শুধু গায়ের ছোপ দেখলেই চলবে না। তাদের অন্য বৈশিষ্ট্যগুলিও লক্ষ করতে হবে।

গোল দাগ, না ফুলের মতো ছোপ?

প্রথম সূত্রটি লুকিয়ে রয়েছে গায়ের ছাপে। চিতার শরীরজুড়ে থাকে নিরেট, গোলাকার কালো দাগ। অন্য দিকে, চিতাবাঘের গায়ে দেখা যায় ভাঙা বৃত্ত বা গোলাপের পাপড়ির মতো গুচ্ছ ছোপ। এই ছোপের মাঝের অংশ অনেক সময় আশপাশের লোমের তুলনায় গাঢ় হয়।

প্রাণীটিকে স্পষ্ট দেখা গেলে গায়ের ছাপের এই পার্থক্যই তাকে চেনার অন্যতম সহজ উপায়।

মুখের কালো রেখা দেখুন

চিতার মুখে আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে। চোখের ভিতরের কোণ থেকে মুখের দু’পাশের দিকে নেমে এসেছে স্পষ্ট কালো রেখা। দেখতে অনেকটা চোখের জলের দাগের মতো।

ঘোরপড়ের ব্যাখ্যায়, এই কালো রেখা কিছুটা রোদচশমার মতো কাজ করে। খেলোয়াড়েরা কখনও চোখের নীচে যে কালো রং লাগান, তার সঙ্গেও তুলনা করা যায়।

কালো রঞ্জক তীব্র সূর্যালোক শোষণ করে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার প্রভাব কমাতে সাহায্য করে বলে তিনি জানান। উজ্জ্বল, খোলা প্রান্তরে দিনের বেলায় শিকার করা প্রাণীর পক্ষে এটি উপকারী। চিতাবাঘের মুখে এমন সুস্পষ্ট কালো রেখা থাকে না।

শরীরের গড়নেও স্পষ্ট ফারাক

চিতার শরীর ছিপছিপে। পা লম্বা ও সরু। দ্রুত ছুটতে গিয়ে বাতাসের বাধা কম পড়ে, এমনই তার দেহের গড়ন। অল্প সময়ে গতি বাড়ানো এবং প্রচণ্ড বেগে দৌড়নোর উপযোগী তার শরীর।

চিতাবাঘ তুলনায় পেশিবহুল ও আঁটসাঁট গড়নের। বুকও বেশি চওড়া ও ভারী। এই শক্তিশালী দেহ তার শিকারের কৌশলের সঙ্গে মানানসই। দীর্ঘক্ষণ তীব্র গতিতে ধাওয়া করার বদলে চিতাবাঘ নিঃশব্দে কাছে পৌঁছে শক্তি ও আকস্মিক আক্রমণের উপর নির্ভর করে।

নখেও রয়েছে পার্থক্য

চিতার নখ পুরোপুরি গুটিয়ে রাখা যায় না। দৌড়ের সময় এই নখ মাটি আঁকড়ে ধরতে সাহায্য করে। অনেকটা দৌড়বিদের জুতোর তলায় থাকা খাঁজ বা কাঁটার মতো কাজ করে তা।

অন্য দিকে, চিতাবাঘ তার ধারালো নখ পুরোপুরি গুটিয়ে রাখতে পারে। গাছে ওঠা, শিকার আঁকড়ে ধরা এবং তাকে কাবু করার কাজে এই নখ বিশেষ উপযোগী।

একজন ছোটে, অন্যজন ওত পাতে

শিকারের সময় দুই প্রাণীর পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়। ঘোরপড়ের কথায়, চিতা মূলত স্বল্প দূরত্বের দুরন্ত দৌড়বিদ। দিনের আলোয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তি কাজে লাগিয়ে প্রথমে শিকার চিহ্নিত করে। তার পরে দ্রুত গতি বাড়িয়ে ধাওয়া করে তাকে ধরে। চিতা ঘণ্টায় প্রায় ১১২ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে ছুটতে পারে।

চিতাবাঘের পদ্ধতি অন্য রকম। সে আড়াল থেকে ওত পেতে শিকার করে। নিঃশব্দে অনুসরণ করে যতটা সম্ভব কাছে পৌঁছয়, তার পরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘ দূরত্ব ধাওয়া করার পরিবর্তে গাছপালা, পাথর এবং আশপাশের আড়ালকে কাজে লাগায়।

কোথায় থাকে কারা?

বাসস্থানও তাদের চেনার একটি সূত্র। চিতা সাধারণত খোলা সমতল, তৃণভূমি এবং বিক্ষিপ্ত গাছপালাযুক্ত বিস্তীর্ণ ঘাসজমি পছন্দ করে। এমন জায়গায় দূর থেকে শিকার দেখতে পাওয়া এবং ধাওয়া করার সময় গতি বাড়ানো সহজ হয়।

চিতাবাঘ অনেক বেশি ধরনের পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে। ঘোরপড়ে জানিয়েছেন, ঝোপঝাড়ে ভরা জঙ্গল, বনভূমি কিংবা পাথুরে এলাকায় তাদের দেখা যায়। গাছপালা ও পাথরের আড়াল ব্যবহার করে তারা শিকারের কাছে পৌঁছয়।

তাই তাদের শরীরের গড়ন ও শিকারের পদ্ধতির সঙ্গে বাসস্থানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। চিতা খোলা জমিতে দ্রুত ছোটার উপযোগী, আর চিতাবাঘ নানা ধরনের ভূখণ্ডে নিঃশব্দে চলাফেরায় পারদর্শী।

শিকার ধরার পরেও আলাদা আচরণ

শিকার ধরার পর চিতা তুলনামূলক ভাবে অসহায় অবস্থায় থাকে। অন্য কয়েকটি বড় শিকারি প্রাণীর তুলনায় তার শরীর হালকা এবং শক্তিও কম। ফলে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী বা মৃত প্রাণীর মাংস খেতে আসা অন্য প্রাণীরা খাবার কেড়ে নেওয়ার আগেই তাকে দ্রুত খেয়ে নিতে হয়।

চিতাবাঘ এ ক্ষেত্রে নিজের শক্তি ও গাছে ওঠার দক্ষতা কাজে লাগায়। ভারী শিকারের দেহও সে টেনে গাছে তুলতে পারে। সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী শিকারিদের পক্ষে খাবারের নাগাল পাওয়া কঠিন হয়। এই অভ্যাসও চিতাবাঘের পেশিবহুল দেহ এবং গাছে চড়ার ক্ষমতার পরিচয় দেয়।