হড়পা বানে বিপর্যস্ত নেপাল, খোঁজ নেই ২৯০ ভারতীয়র

যা জানা জরুরি
- কাদা-পাথরে চাপা উপত্যকা, নিশ্চিহ্ন সড়ক এবং ভেসে যাওয়া জনপদের মধ্যে জীবিতদের খুঁজতে মরিয়া উদ্ধারকারীরা।
- নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ভয়াবহ হড়পা বানের পরে শুক্রবারও বহু মানুষের অবস্থান অজানা।
- ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বৃহস্পতিবারের সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী, ২৯০ জন ভারতীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কাদা-পাথরে চাপা উপত্যকা, নিশ্চিহ্ন সড়ক এবং ভেসে যাওয়া জনপদের মধ্যে জীবিতদের খুঁজতে মরিয়া উদ্ধারকারীরা। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ভয়াবহ হড়পা বানের পরে শুক্রবারও বহু মানুষের অবস্থান অজানা। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বৃহস্পতিবারের সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী, ২৯০ জন ভারতীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। সীমান্তে চিনের দিকে আটকে রয়েছেন আরও প্রায় ২০০ জন। বিপর্যস্ত নেপালে ইতিমধ্যে দু’দফায় ৪৭.৫ টন জরুরি সামগ্রী পাঠিয়েছে ভারত। ভেঙে পড়া যোগাযোগব্যবস্থা সচল করতে অস্থায়ী বেইলি সেতু পাঠানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে নয়াদিল্লি।
বুধবারের বিপর্যয়ে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা অন্তত ৩৯২। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বৃহস্পতিবারের হিসাবে, নেপালে ৩৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত ৪৬০ জন। তিব্বতে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। দুই প্রান্ত মিলিয়ে তখনও ১,৪০০-র বেশি মানুষের সন্ধান চলছিল। তবে উদ্ধারকাজের সঙ্গে সঙ্গে বদলাচ্ছে হিসাব। কোনও সংস্থা শুধু পর্যটকদের তালিকা দিচ্ছে, কোনও সংস্থা স্থানীয় বাসিন্দা, কর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীদেরও ধরছে। ফলে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংখ্যাকে একই মুহূর্তের চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, উদ্বেগে ভারতীয় পরিবারগুলি
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বক্তব্য অনুযায়ী, যোগাযোগহীন ভারতীয়দের মধ্যে কৈলাস-মানস সরোবরের তীর্থযাত্রী, বিভিন্ন রাজ্যের পর্যটক এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীরা রয়েছেন। ত্রিশূলী-১ প্রকল্পে কর্মরত ৭৩ জন ভারতীয়ের অবস্থান জানতে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে কাঠমান্ডুর ভারতীয় দূতাবাস। দুর্গত অঞ্চলে দূরসংযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সরাসরি খবর সংগ্রহ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে তামিলনাড়ুর ৩৭ ও ৪৯ জনের দু’টি দলের উল্লেখ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ৩২ জনের একটি দল রাসুয়া জেলার তিমুরে এলাকায় ছিল বলে খবর। অন্য একটি ভ্রমণ সংস্থার মাধ্যমে যাওয়া বিভিন্ন রাজ্যের ৬১ জন এবং কেরলের ৩৩ জনের অবস্থানও নিশ্চিত করা যায়নি। এগুলি সংশ্লিষ্ট সময়ের পৃথক দলভিত্তিক তথ্য; সংশোধিত মোট সংখ্যার সঙ্গে নতুন করে যোগ করা হিসেব নয়।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার তথ্যে ৮৪ জন ভারতীয়কে উদ্ধারের কথা জানানো হয়। সরকারি বক্তব্যে বিশেষভাবে বোঝানো হয়েছে, কারও সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়ার অর্থ তিনি মৃত বা আহত এমন নয়। নিরাপদ জায়গায় থেকেও অনেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেন। পরিবারগুলির কাছে তাই যাচাই করা খবর পৌঁছনো উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি সমান জরুরি।
ত্রাণের সঙ্গে প্রয়োজন রাস্তা ফেরানোর
বুধবার প্রথম বিমানে ১০ টন এবং বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় বিমানে ৩৭.৫ টন সহায়তা পাঠিয়েছে ভারত। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর উচ্চপদস্থ আধিকারিক এবং কাঠমান্ডু ও বেজিংয়ে ভারতের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ভারতীয়দের সন্ধান, উদ্ধার এবং ত্রাণ পৌঁছনোর কাজে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলির সঙ্গে সমন্বয় চলছে।
বেইলি সেতু পাঠানোর ভাবনা এই পরিস্থিতিতেই। তবে সেতু পাঠানো বা বসানো সম্পন্ন হয়েছে, এমন ঘোষণা পাওয়া যায়নি। বহু সেতু ভেসে যাওয়ায় দুর্গত এলাকায় পৌঁছনোর পথ পুনরুদ্ধার এখন ত্রাণ অভিযানের অন্যতম প্রয়োজন।
ভারতের পাঠানো সামগ্রীর মধ্যে অস্থায়ী আশ্রয়ের উপকরণ, কম্বল, পরিচ্ছন্নতা রক্ষার সামগ্রী, আলো এবং ওষুধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সাহায্যও আসছে। দক্ষিণ কোরিয়া উদ্ধার-সহায়তার পাশাপাশি ১০ লক্ষ ডলার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ব্রিটেন ঘোষণা করেছে ৫০ লক্ষ পাউন্ড সহায়তা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চিকিৎসাসামগ্রী পাঠাচ্ছে; আন্তর্জাতিক রেড ক্রস এবং অন্যান্য সংস্থাও জরুরি তহবিল ও কর্মী নিয়ে এগিয়েছে। তবে ঘোষিত সহায়তা এবং দুর্গত মানুষের হাতে পৌঁছে যাওয়া সাহায্য এক বিষয় নয়—বিচ্ছিন্ন জনপদে শেষ পর্যন্ত সরবরাহ পৌঁছনোই বড় পরীক্ষা।
আকাশপথে উদ্ধার, মাটিতে বাধার পর বাধা
গার্ডিয়ানের শুক্রবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহু সেতু ধ্বংস এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনুসন্ধান বাধা পাচ্ছে। হেলিকপ্টারে মানুষকে সরানো হচ্ছে, গুরুতর আহতদের নেওয়া হচ্ছে কাঠমান্ডুতে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে অনেক দূরে, নদীর নিম্নপ্রবাহেও দেহ মিলছে। রেড ক্রসের প্রাথমিক অনুমান, প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ কোনও না কোনওভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন। এই সংখ্যা মূল্যায়নসাপেক্ষ।
এই উদ্ধার অভিযানের প্রধান বাধা পাহাড়ের ভূগোল। সরু উপত্যকায় নদীর ধার ঘেঁষে বসতি ও রাস্তা তৈরি হওয়ায় একটি প্রবল স্রোত একই সঙ্গে দু’টিকেই ধ্বংস করতে পারে। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নামার সময় জল সঙ্গে নিয়ে আসে মাটি ও বড় পাথর। ফলে শুধু জল নামলেই পথ চলাচলের উপযুক্ত হয়ে যায় না। জমে থাকা ধ্বংসাবশেষ সরাতে হয়, ঢালের স্থিতি দেখতে হয়, উদ্ধারকারীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হয়। হেলিকপ্টারের ক্ষেত্রেও নিরাপদ অবতরণের জায়গা পাওয়া কঠিন। এই কারণেই দূর থেকে ক্ষয়ক্ষতি দেখা এবং সেখানে পৌঁছে কাউকে উদ্ধার করার মধ্যে বড় ব্যবধান থেকে যাচ্ছে।
ফের বানের আশঙ্কা
প্রথম বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলানোর মধ্যেই নতুন বিপদের সতর্কতা এসেছে চিন থেকে। তিব্বতের দিকে নদীর সঙ্গমের কাছে ধ্বংসাবশেষে প্রবাহ বাধা পেয়ে জল জমেছে। বৃহস্পতিবার সকালে সেখানে প্রায় ২০ লক্ষ ঘনমিটার জল থাকার কথা জানানো হয়। পরবর্তী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লক্ষ ঘনমিটার জল আসতে পারে। প্রাকৃতিক বাঁধ ভাঙলে ফের হঠাৎ জল নামার আশঙ্কায় ত্রিশূলীর দু’পারের বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে নেপাল। উদ্ধারকারীদেরও এই বাড়তি ঝুঁকি মাথায় রেখে এগোতে হচ্ছে।
বিপর্যয়ের সূচনা নিয়ে প্রথম দিকের খবরেও সংশোধন এসেছে। প্রথমে ভূমিকম্পের কথা বলা হলেও পরে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা জানায়, নথিভুক্ত কম্পনের উৎস ছিল বিশাল ধস। বরফ ও পাথরের পতনের পরে নদীপথে নেমে আসে বিধ্বংসী জল-কাদার প্রবাহ। অর্থাৎ ভূমিকম্পকে নিশ্চিত কারণ হিসেবে তুলে ধরা সঙ্গত নয়। প্রাথমিক বিভ্রান্তি সরিয়ে প্রকৃত ঘটনাক্রম বোঝা ভবিষ্যতের সতর্কব্যবস্থার জন্যও প্রয়োজন।
তালিকার পিছনে অপেক্ষারত মানুষ
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তামিলনাড়ুর এক ভ্রমণ সংস্থার কর্ণধার সৈয়দ সাদিকের উদ্বেগ। তাঁর পাঠানো তীর্থযাত্রীদের একাংশের সঙ্গে যোগাযোগ নেই; তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পথপ্রদর্শক হিসেবে যাওয়া তাঁর ছেলেও। ঈশা ফাউন্ডেশনও তাদের ৭৭ জন তীর্থযাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা জানিয়েছে। এই দলভিত্তিক সংখ্যাগুলিকে সরকারি মোটের বাইরে অতিরিক্ত নিখোঁজ হিসেবে ধরা যাবে না।
সীমান্ত পারাপারের সময় বিপর্যয় ঘটায় একই ব্যক্তির নাম দুই দেশের তালিকায় থাকার সম্ভাবনাও এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। স্পেনের এল পাইস জানিয়েছে, নেপাল ও চিনের নিখোঁজ তালিকায় এমন পুনরাবৃত্তি আছে কি না, কর্তৃপক্ষ তা স্পষ্ট করেনি। তাই সংখ্যার সতর্ক ব্যবহার জরুরি। প্রতিটি নামের পিছনে রয়েছে একটি পরিবার—যাদের প্রয়োজন অনুমান নয়, নির্ভরযোগ্য খবর। উদ্ধার, চিকিৎসা, আশ্রয় এবং যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের এই সম্মিলিত লড়াইয়ের মধ্যেই সেই খবরের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



