লতি বছরের জুনে এইচ-১বি ভিসার জন্য এক লক্ষ ডলার মাশুল আদায়ের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আগের উদ্যোগ আদালতে খারিজ হয়ে গিয়েছিল। এবার ভিন্ন আইনি পথে প্রায় একই অঙ্কের মাশুল বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে আমেরিকার স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দফতর। প্রস্তাব কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন ভারতীয় পেশাজীবী এবং তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলি।

স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দফতরের প্রস্তাব অনুযায়ী, বার্ষিক নির্ধারিত সংখ্যার আওতাধীন প্রতিটি এইচ-১বি আবেদনের জন্য অতিরিক্ত ১ লক্ষ ৩ হাজার ২৬৫ ডলার দিতে হবে। আবেদন জমা দেওয়ার সময় কর্মীকে নিয়োগে আগ্রহী সংস্থাই এই অর্থ দেবে। বর্তমানে এইচ-১বি আবেদনের জন্য যে সব মাশুল দিতে হয়, তার অতিরিক্ত হিসাবে নতুন অর্থ ধার্য হবে।

প্রস্তাবটি এখনও কার্যকর হয়নি। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির মতামত জানানোর জন্য ৩০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। সেই সব বক্তব্য পর্যালোচনার পর স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দফতরকে চূড়ান্ত বিধি প্রকাশ করতে হবে।

আমেরিকার উপরাষ্ট্রপতি জে ডি ভান্স এই উদ্যোগকে সমর্থন করে বলেছেন, কোনও মার্কিন সংস্থার কর্মীর প্রয়োজন হলে তাদের উচিত আমেরিকান নাগরিকদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া।

কী প্রস্তাব করা হয়েছে

এইচ-১বি কর্মসূচির মাধ্যমে মার্কিন নিয়োগকারীরা বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মী নিয়োগ করতে পারেন। সাধারণত যে সব কাজের জন্য অন্তত স্নাতক ডিগ্রি প্রয়োজন, সেগুলিকেই ‘বিশেষায়িত পেশা’ হিসাবে গণ্য করা হয়।

মার্কিন কংগ্রেস বছরে নতুন এইচ-১বি ভিসার সংখ্যা ৬৫ হাজারে সীমাবদ্ধ রেখেছে। পাশাপাশি, আমেরিকার কোনও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর বা তার চেয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনকারীদের জন্য আরও ২০ হাজার ভিসা সংরক্ষিত রয়েছে।

নতুন ১ লক্ষ ৩ হাজার ২৬৫ ডলারের মাশুল এই দুই শ্রেণির মোট ৮৫ হাজার আবেদনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। তবে বার্ষিক সীমার বাইরে থাকা আবেদনে এই মাশুল দিতে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়, অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি গবেষণা সংস্থার বহু আবেদন এই ছাড়ের আওতায় পড়বে।

স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দফতরের হিসাব অনুযায়ী, ৮৫ হাজার আবেদনের প্রতিটিতে নতুন মাশুল আদায় করা গেলে বছরে প্রায় ৮৮০ কোটি ডলার রাজস্ব পাওয়া যাবে। সাধারণ ভিসা প্রক্রিয়াকরণ মাশুলের মতো শুধু এইচ-১বি আবেদন যাচাইয়ে এই অর্থ ব্যয় করা হবে না। বৃহত্তর অভিবাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন খরচ মেটাতেও তা ব্যবহার করা হবে।

প্রস্তাবটির পিছনে শ্রমবাজার-সংক্রান্ত উদ্দেশ্যও রয়েছে। প্রশাসনের যুক্তি, ছয় অঙ্কের মাশুল দিতে হলে কোনও যোগ্য আমেরিকান কর্মীর পরিবর্তে এইচ-১বি কর্মী নিয়োগের আগে সংস্থাগুলি দু’বার ভাববে। বিদেশি কর্মীর বিশেষ দক্ষতা সত্যিই প্রয়োজন হলেই কোনও সংস্থা এত বিপুল অর্থ খরচ করতে রাজি হবে।

এইচ-১বি নিয়ে বিতর্ক কেন

আমেরিকায় এইচ-১বি কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, যথেষ্ট দক্ষ মার্কিন কর্মী পাওয়া না গেলে বিশেষায়িত পদ পূরণের যে মূল উদ্দেশ্যে এই কর্মসূচি চালু হয়েছিল, তা এখনও বজায় রয়েছে কি না। নাকি তুলনায় কম বেতনে বিদেশি কর্মী নিয়োগের পথ হিসাবেই এটি ব্যবহৃত হচ্ছে?

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, বিশেষত প্রযুক্তি ক্ষেত্রের কিছু সংস্থা আমেরিকান কর্মীদের ছাঁটাই করেও এইচ-১বি কর্মী নিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে বেতনের হার কমছে এবং মার্কিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্নাতকদের চাকরির সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।

আগের এক লক্ষ ডলারের মাশুল কেন বাতিল হয়েছিল

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্টের নির্দেশের মাধ্যমে এইচ-১বি ভিসায় এক লক্ষ ডলার মাশুল বসিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের সেই ধারাগুলির সাহায্য নিয়েছিলেন, যেগুলি আমেরিকার স্বার্থের পক্ষে ক্ষতিকর বলে বিবেচিত বিদেশিদের প্রবেশে প্রেসিডেন্টকে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষমতা দেয়।

চলতি বছরের জুনে একটি মার্কিন ফেডারেল আদালত জানায়, এক লক্ষ ডলারের ওই অর্থ আসলে প্রবেশে বিধিনিষেধ নয়, করের মতো কাজ করছে। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী কর আরোপের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। ট্রাম্প যে অভিবাসন আইনের ধারা ব্যবহার করেছিলেন, তা প্রেসিডেন্টকে এমন মাশুল আরোপের সুস্পষ্ট ক্ষমতা দেয় না।

আদালত আরও জানায়, প্রশাসনিক কার্যপ্রণালী আইন মেনে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলি সিদ্ধান্তটি কার্যকর করেনি। ফলে নীতিটি বাতিল করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসন সেই রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করেছে। কিন্তু জুলাইয়ে প্রথম সার্কিট আপিল আদালত নিম্ন আদালতের নির্দেশ স্থগিত করতে অস্বীকার করে।

নতুন আইনি পথ কোথায় আলাদা

এবার প্রেসিডেন্টের বিদেশিদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার উপর প্রধানত নির্ভর করা হচ্ছে না। অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের ২৮৬ নম্বর ধারায় অভিবাসন আবেদন বিচারের এবং নাগরিকত্ব পরিষেবার খরচ আদায়ের জন্য মাশুল নির্ধারণের যে ক্ষমতা রয়েছে, স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দফতর সেটিই ব্যবহার করছে।

সরাসরি প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় মাশুল আরোপের বদলে মতামত গ্রহণ এবং বিধি তৈরির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে এই আইনি পথ নীতিটিকে নতুন মামলা থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দফতর নিজেই স্বীকার করেছে, অভিবাসন আবেদনকারীদের একটি নির্দিষ্ট ও সংকীর্ণ শ্রেণির কাছ থেকে অর্থ নিয়ে একাধিক দফতরের বিস্তৃত খরচ মেটানোর এমন নজির অতীতে নেই। যে সব কর্মসূচির সঙ্গে এইচ-১বি নিয়োগকারীদের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই, সেগুলির ব্যয়ও এই অর্থ থেকে মেটানো হতে পারে। ফলে চূড়ান্ত বিধি প্রকাশিত হলে আদালতে তার বৈধতা চ্যালেঞ্জ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ভারতীয় কর্মীদের উপর প্রভাব

নতুন মাশুল কার্যকর হলে ভারতীয়রাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবর্ষে অনুমোদিত সমস্ত এইচ-১বি আবেদনের ৭১ শতাংশই ছিল ভারতে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিদের। দ্বিতীয় স্থানে থাকা চিনের নাগরিকদের অংশ ২০১৮ সাল থেকে ১২ থেকে ১৩ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।

২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এইচ-১বি কর্মসূচির অধীনে প্রায় চার লক্ষ ভিসা দেওয়া হয়েছিল। তার ৭২ শতাংশই পেয়েছিলেন ভারতীয় নাগরিকেরা।

একজন ভারতীয় পেশাজীবীকে নিয়োগের জন্য কোনও সংস্থাকে অতিরিক্ত এক লক্ষ ডলারেরও বেশি দিতে হলে সদ্য কর্মজীবনে প্রবেশকারী এবং মাঝারি বেতনের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বেন। অত্যন্ত বিশেষায়িত বা উচ্চ বেতনের পদের জন্য সংস্থাগুলি এই খরচ বহন করতে পারে। কিন্তু সাধারণ সফ্‌টওয়্যার, পরামর্শদান কিংবা প্রাথমিক স্তরের প্রযুক্তিগত পদের জন্য বিদেশি কর্মী নিয়োগ অর্থনৈতিক ভাবে লাভজনক না-ও থাকতে পারে।

আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া ভারতীয় শিক্ষার্থীদের উপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। পড়াশোনা শেষ করে যাঁরা এইচ-১বি ভিসার মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দিতে চান, তাঁদের নিয়োগে সংস্থাগুলির আগ্রহ কমতে পারে।

ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার উদ্বেগ

আমেরিকায় উপস্থিত ভারতের চারটি বড় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা—ইনফোসিস, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস, এইচসিএল এবং উইপ্রো—২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার কর্মীর জন্য এইচ-১বি অনুমোদন পেয়েছিল।

নতুন মাশুল চালু হলে এই সংস্থাগুলির কর্মী পাঠানোর খরচ বিপুল ভাবে বেড়ে যাবে। এর ফলে আমেরিকায় আরও বেশি স্থানীয় কর্মী নিয়োগ, কাজের একটি বড় অংশ ভারত থেকে সম্পন্ন করা অথবা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে সংস্থাগুলি ঝুঁকতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের সংগঠন ন্যাসকম ওয়াশিংটনকে এইচ-১বি কর্মসূচির গুরুত্ব বিবেচনা করার আবেদন জানিয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, আমেরিকায় স্বল্পমেয়াদি দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণে দীর্ঘদিন ধরে এই কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

ন্যাসকম আরও জানিয়েছে, ভারতীয় প্রযুক্তি সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই আমেরিকায় স্থানীয় কর্মী নিয়োগ বাড়িয়েছে এবং এইচ-১বি কর্মীদের উপর নির্ভরতা কমিয়েছে। তাই নতুন মাশুলের প্রস্তাবকে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য—দক্ষ কর্মীর সাময়িক ঘাটতি পূরণ—এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই বিচার করা উচিত।