রাশিয়ার পেট্রল-হাহাকার

যা জানা জরুরি
- বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রফতানিকারক দেশ রাশিয়াকেই এখন পেট্রলের ঘাটতি মেটাতে তাকাতে হচ্ছে ভারতের দিকে।
- ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় রুশ তেল শোধনাগারগুলির উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহে টান পড়েছে।
- পরিস্থিতি সামলাতে ভারত থেকে পরিশোধিত জ্বালানি কিনছে মস্কো।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রফতানিকারক দেশ রাশিয়াকেই এখন পেট্রলের ঘাটতি মেটাতে তাকাতে হচ্ছে ভারতের দিকে। ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় রুশ তেল শোধনাগারগুলির উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহে টান পড়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে ভারত থেকে পরিশোধিত জ্বালানি কিনছে মস্কো।
‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দু’মাসে ভারত থেকে রাশিয়ায় দশ লক্ষ ব্যারেলেরও বেশি পেট্রল পাঠানো হয়েছে। যদিও রাশিয়ার আমদানির প্রধান উৎস এখনও প্রতিবেশী বেলারুশ ও কাজাখস্তান।
ঘটনাটি ভারত–রাশিয়া জ্বালানি বাণিজ্যের চেনা ছবিতে বড় বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতদিন রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কিনে তা নিজেদের শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাত করেছে ভারত। এবার সেই রাশিয়ার বাজারেই প্রয়োজন হচ্ছে ভারতে তৈরি পেট্রলের। অর্থাৎ, কাঁচা তেলের অভাব নয়—শোধন ক্ষমতায় ধাক্কাই মস্কোকে আমদানির পথে ঠেলে দিয়েছে।
ভারতীয় পেট্রল পৌঁছল রাশিয়ায়
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্য উদ্ধৃত করে ‘ব্লুমবার্গ’-এর খবর জানিয়েছে ‘দ্য মস্কো টাইমস’। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় পেট্রলের একটি চালান ৫ অগস্ট রুশ বন্দরে পৌঁছেছে। জ্বালানিটির উৎপাদক হিসেবে নয়ারা এনার্জির নাম উঠে এসেছে। সংস্থাটিতে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা রসনেফ্টের অংশীদারি রয়েছে।
তবে সরবরাহের পথ ছিল বেশ ঘুরপথের। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিশরের উপকূলের কাছে একটি জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে জ্বালানি স্থানান্তর করা হয়েছিল। ফলে ভারত থেকে রাশিয়ায় জ্বালানি যাওয়ার বিষয়টি সরাসরি জাহাজে পণ্য পাঠানোর সহজ সমীকরণ নয়।
আর এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য।
নয়ারা এনার্জি রয়টার্সকে জানিয়েছে, তারা রুশ কোনও সংস্থার কাছে সরাসরি জ্বালানি বিক্রি করেনি এবং এমন কোনও পরিকল্পনাও নেই। পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরীর বক্তব্যও প্রায় একই—ভারতীয় সংস্থাগুলি সরাসরি রাশিয়ায় জ্বালানি বিক্রি করছে না। তবে ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ভারতীয় উৎসের পেট্রল রাশিয়া কিনতে পারে।
রয়টার্সের সূত্র অনুযায়ী, রসনেফ্ট, গ্যাজপ্রম নেফ্ট এবং লুকঅয়েল ভারতীয় শোধনাগারগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। যদিও কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ভারতীয় তেল সংস্থার সূত্রের দাবি, রফতানির জন্য তাদের হাতে পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত পেট্রল নেই।
পাম্পে লম্বা লাইন
সংকটের আঁচ এবার রাশিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনেও স্পষ্ট। ২০ অগস্ট রয়টার্স জানায়, মস্কো ও আশপাশের কিছু এলাকায় পেট্রল পাম্পের সামনে গাড়ির লাইন এক কিলোমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়েছে। কোথাও পেট্রল বিক্রিতে সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, কোথাও আবার পাম্প বন্ধ রাখতে হয়েছে। কিছু জায়গায় শুধু ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে।
গ্রীষ্মের মরসুমে জ্বালানির বাড়তি চাহিদার সঙ্গে শোধনাগারে ধারাবাহিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাকও জ্বালানি আমদানির কথা স্বীকার করেছেন।
কোথাও ৩০ লিটারের বেশি নয়
আঞ্চলিক স্তরে পরিস্থিতি আরও কঠিন। ‘ইইউ পারস্পেক্টিভস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওরেনবুর্গে গাড়ির নম্বর অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনে পেট্রল কেনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোথাও ক্রেতাপিছু ৩০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি কেনার সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
ওর্স্ক শোধনাগারে হামলার পর সরবরাহের উপর চাপ আরও বেড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশি যন্ত্রাংশ মেরামতে নিষেধাজ্ঞাজনিত বাধা থাকায় শোধনাগারগুলির উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে।
রফতানিতেও লাগাম
দেশের বাজারে পেট্রলের জোগান ঠিক রাখতে রাশিয়া ইতিমধ্যেই পরিশোধিত জ্বালানি রফতানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ২৫ অগস্ট রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজেল রফতানির নিষেধাজ্ঞা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও সে সময় পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা হয়নি।
অর্থাৎ, বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক দেশটি এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি—মাটির নীচে তেল রয়েছে, কিন্তু তা শোধন করে দ্রুত পাম্পে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতাই এখন চাপে।
ভারতীয় পেট্রল আপাতত সেই ঘাটতি সামলানোর একটি বিকল্প হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমদানি বাড়লেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত শোধনাগার কত দ্রুত সচল হয় এবং ইউক্রেনের পরবর্তী হামলা কতটা ঠেকানো যায়, শেষ পর্যন্ত তার উপরই নির্ভর করবে রাশিয়ার জ্বালানি বাজার কবে ফের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



