পৃথিবীর সর্বোচ্চ কয়েকটি পর্বতশৃঙ্গের পাশাপাশি নেপালে রয়েছে সরু অথচ গভীর নদীখাত। এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য নদীর জলকে প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গের মতো পথে প্রবল গতিতে নীচের দিকে নামিয়ে আনে। ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিলে তা কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।

নেপালের নুয়াকোট জেলায় ত্রিশূলী নদীর তীরে সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। প্রশাসনের প্রাথমিক অনুমান, ভূমিকম্পের অভিঘাতে উজানে তুষার ও পাথরের ধস নেমেছিল। সেই ধসই পরবর্তী পর্যায়ে ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত ঘটিয়ে থাকতে পারে। যদিও সরকারি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

আকস্মিক বন্যা কী ভাবে ঘটে

অতি অল্প সময়ের মধ্যে নিচু এলাকা হঠাৎ বিপুল জলরাশিতে প্লাবিত হওয়াকে আকস্মিক বন্যা বলা হয়। এই ধরনের বন্যা সাধারণত অত্যন্ত দ্রুত এবং হিংস্র প্রকৃতির হয়।

পার্বত্য অঞ্চলে ঢাল বেয়ে নেমে আসা জলের গতিবেগ ও শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে তার সামনে থাকা বাড়িঘর, সেতু, রাস্তা, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা যোগাযোগব্যবস্থা মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। জল এত দ্রুত নেমে আসে যে নিম্ন অববাহিকার বাসিন্দারা সতর্কবার্তা পাওয়া বা নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সময়টুকুও পান না।

নেপালের সাম্প্রতিক বন্যায় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। ফলে দুর্গত সীমান্ত এলাকাগুলির সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এখনও বিপর্যয়ের কারণ সরকারি ভাবে ঘোষণা করা না হলেও ভূমিকম্পের অভিঘাতে সৃষ্ট তুষার-পাথরের ধসকেই সম্ভাব্য সূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভূমিকম্প থেকে কীভাবে ধস নামতে পারে

হিমালয়ের সুউচ্চ শৃঙ্গগুলিতে বিপুল হিমবাহের পাশাপাশি বহু পাথরের স্তূপ অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় ভারসাম্য বজায় রেখে রয়েছে। ভূমিকম্প সেই নড়বড়ে ভারসাম্য ভেঙে দিতে পারে। কম্পনের ফলে পাথর, বরফ, কাদা এবং অন্যান্য পদার্থ প্রচণ্ড বেগে নীচে নেমে আসে।

বন্যার আগের ও পরের উপগ্রহচিত্রে ত্রিশূলী নদীসংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক পরিবর্তন ধরা পড়েছে। প্রশাসনের সন্দেহ, ভূমিকম্পের কারণে লেন্দে খোলা নদীর উজানে বরফ ও পাথরের বিরাট ধস নেমেছিল। সরু এবং অত্যন্ত উঁচু অঞ্চলের এই নদীটি ভোতে কোশীর উপনদী। ধসের অধিকাংশ পদার্থ নদীর জলস্রোতের সঙ্গে নীচের দিকে নেমে আসে।

কোনও একটি স্থানে সেই পাথর, বরফ ও কাদা জমে সম্ভবত একটি অস্থায়ী বাঁধ তৈরি করেছিল। এই ধরনের বাঁধের পিছনে খুব দ্রুত জল জমতে থাকে। কিন্তু ধ্বংসাবশেষ দিয়ে তৈরি বাঁধটি স্থায়ী বা মজবুত হয় না। জলের চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকলে একসময় বাঁধটি ভেঙে যায়।

তখন জমে থাকা বিপুল জলরাশি এবং ধসের কঠিন পদার্থ একসঙ্গে দেওয়ালের মতো নীচের দিকে ছুটে আসে। পথে থাকা জনবসতি ও পরিকাঠামোর উপর আছড়ে পড়ে সেই জল, পাথর ও কাদার স্রোত। লেন্দে খোলার উজানে এখনও ধ্বংসাবশেষ জমে নদীপথ আটকে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেই কারণে দ্বিতীয় দফায় বন্যার সম্ভাবনা সম্পর্কেও সতর্ক করেছে প্রশাসন।

নেপালের ভূপ্রকৃতি কেন বিপদ বাড়ায়

নেপালের ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও খাড়া। এক দিকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, অন্য দিকে সরু এবং গভীর নদীখাত। এই নদীখাতগুলি অনেকটা প্রাকৃতিক চোঙের মতো কাজ করে। ফলে উজান থেকে নেমে আসা জলের গতি আরও বেড়ে যায় এবং তার ধ্বংসক্ষমতাও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

দুর্গম ও অসমতল ভূখণ্ডের কারণে বিপর্যয়ের সময় উদ্ধারকাজ চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, বন্যার জল না নামা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার নামানো সম্ভব নয়।

পর্বতঘেরা সরু উপত্যকাগুলিতেই সাধারণত ঘন জনবসতি গড়ে ওঠে। ফলে একটি মাত্র বন্যায় গোটা জনপদ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। রাস্তা বা সেতু ভেঙে গেলে দুর্গত মানুষের কাছে ত্রাণ ও উদ্ধারকারী দল পৌঁছনোও কঠিন হয়।

জল খাড়া ঢাল বেয়ে নীচে নামার সময় নদীর তলদেশ ও তীর থেকে বিপুল মাটি এবং বিশাল পাথরও উপড়ে নিয়ে আসে। ফলে এটি নিছক জলের বন্যা থাকে না; কাদা, বালি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের শক্তিশালী স্রোতে পরিণত হয়। এই পলি ও ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারকাজে বড় বাধা তৈরি করেছে। চিন গিরং স্থলবন্দর এলাকায় যে ৫৭৪ জন উদ্ধারকারী মোতায়েন করেছে, তাঁদেরও একই সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে।

সীমান্ত পেরিয়ে কেন ছড়ায় আশঙ্কা

লেন্দে খোলা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী, যা চিন ও নেপাল—দুই দেশের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে। এটি ভোতে কোশী নদীর উঁচু অঞ্চলের একটি উপনদী। বৃহত্তর নদীব্যবস্থায় ভোতে কোশীর সঙ্গে ত্রিশূলী এবং নারায়ণী নদীরও সংযোগ রয়েছে।

এই নদীগুলি পাহাড়ের মধ্য দিয়ে গভীর অববাহিকা তৈরি করে সমতলের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। তাই নেপালের উজানে বড় ধরনের বন্যা হলে তার প্রভাব নিম্ন অববাহিকায়ও পৌঁছতে পারে। এই আন্তঃসংযুক্ত নদীপ্রবাহের কারণেই নেপালের বিপর্যয়ের পর ভারতের বিহার ও উত্তরপ্রদেশে দ্রুত বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়।

নেপালের দ্রুত প্রবাহিত পাহাড়ি নদীগুলি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে বহু বিদেশি বিনিয়োগ এবং বিদেশি কর্মীর আগমন ঘটেছে। সাম্প্রতিক বন্যায় একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেখানে কর্মরত আট জন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকের এখনও কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

নেপালের বিপদের মূল কারণ তাই একক নয়। সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল, ভঙ্গুর হিমবাহ ও পাহাড়ি ঢাল, সরু নদীখাত, খাড়া ঢাল এবং ঘনবসতিপূর্ণ উপত্যকা—সব মিলিয়েই আকস্মিক বন্যাকে সেখানে বিশেষ ভাবে প্রাণঘাতী করে তোলে।