ফেডেরারের নিউ ইয়র্ক

যা জানা জরুরি
- তবে এ বার হাতে নেই গ্র্যান্ড স্ল্যামের ট্রফি, নেই প্রতিযোগিতার চাপ।
- তবু রজার ফেডেরার কোর্টে পা রাখতেই যেন নিউ ইয়র্কে ফিরে এল তাঁর সোনালি সময়।
- যে শহর পেশাদার টেনিসার হিসেবে তাঁকে শেষ বার দেখেছিল, সেই শহরই এ বার জানাল তার প্রিয় কিংবদন্তিকে প্রাপ্য বিদায়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সাত বছর পর আবার সেই আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়াম। তবে এ বার হাতে নেই গ্র্যান্ড স্ল্যামের ট্রফি, নেই প্রতিযোগিতার চাপ। তবু রজার ফেডেরার কোর্টে পা রাখতেই যেন নিউ ইয়র্কে ফিরে এল তাঁর সোনালি সময়। যে শহর পেশাদার টেনিসার হিসেবে তাঁকে শেষ বার দেখেছিল, সেই শহরই এ বার জানাল তার প্রিয় কিংবদন্তিকে প্রাপ্য বিদায়।
২০১৯ সালে গ্রিগর দিমিত্রভের কাছে ইউএস ওপেনের কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে আর্থার অ্যাশ ছেড়েছিলেন ফেডেরার। তখন কে জানত, সেটিই নিউ ইয়র্কে তাঁর শেষ প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ হয়ে থাকবে?
৩৮ বছর বয়সেও তখন শরীরের সীমাবদ্ধতাকে অবিশ্বাস্য দক্ষতায় সামলে খেলছিলেন তিনি। ফরাসি ওপেনের সেমিফাইনাল থেকে উইম্বলডনের ফাইনাল—শেষ পূর্ণ মরসুমেও দেখিয়েছিলেন তাঁর চেনা জাদু।
তার পর চোট। ২০২০ ও ২০২১ সালে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিযোগিতায় খেলতে পেরেছিলেন। ইউএস ওপেনও তাঁকে ছাড়াই আয়োজিত হয় দু’বছর। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালের অগস্টে পেশাদার টেনিসকে বিদায় জানান ২০টি গ্র্যান্ড স্ল্যামের মালিক।
এ বার অবশ্য প্রত্যাবর্তনটা অন্য রকম।
‘অ্যান আইকন রিটার্নস’
২০২৬ ইউএস ওপেনের আগে ‘ফ্যান উইক’-এর অংশ হিসেবে বুধবার ফের আর্থার অ্যাশে পা রাখলেন ফেডেরার। এই কোর্টেই ২০০৪ থেকে ২০০৮—টানা পাঁচ বার ইউএস ওপেনের চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন তিনি।
অনুষ্ঠানের নামও তাই যথার্থ—‘অ্যান আইকন রিটার্নস টু নিউ ইয়র্ক’।
ফেডেরারকে এক ঝলক দেখতে গ্যালারি ভরে গিয়েছিল। পাশে ছিলেন টেনিসের আরও কয়েক কিংবদন্তি—অ্যান্ডি রডিক, জন ম্যাকেনরো ও আন্দ্রে আগাসি। গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন সেরেনা উইলিয়ামস এবং ফেলিক্স অগার-আলিয়াসিমও।
তবে দর্শকের নজর যে একজনের দিকেই, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। বহু দর্শকের মাথায় ছিল তাঁর বিখ্যাত ‘আরএফ’ প্রতীক-খচিত টুপি।
২০টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম, দেড় দশকেরও বেশি সময়ের আধিপত্য—ফেডেরারের নামের সঙ্গে ‘আরএফ’ প্রতীকটিও যেন একাকার।
ফের সেই ফেডেরার!
“নিউ ইয়র্কে ফিরতে পেরে দারুণ লাগছে,” বলেছিলেন ফেডেরার। “এই কোর্ট, এখানকার দর্শক এবং এই শহরকে ঘিরে আমার অসংখ্য অবিশ্বাস্য স্মৃতি রয়েছে।”
তার পরই স্মৃতি ফিরল খেলায়।
সন্ধ্যায় দু’টি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেন ফেডেরার। প্রথমে এক সেটের একক ম্যাচে প্রতিপক্ষ সেই পুরনো পরিচিত—অ্যান্ডি রডিক।
২০২১ সালের উইম্বলডনে হুবার্ট হুরকাচের কাছে হারের পর এটাই ছিল ফেডেরারের প্রথম একক ম্যাচ।
কোর্টে নামার আগে নিজের নার্ভাস লাগার কথা স্বীকার করেছিলেন তিনি। কিন্তু ম্যাচ শুরু হতেই উদ্বেগ উধাও।
সেই মসৃণ চলন, নিখুঁত টাইমিং, একহাতি ব্যাকহ্যান্ড—কিছুক্ষণের জন্য মনে হল, ফ্লাশিং মেডোজের পুরনো সম্রাট যেন আবার ফিরে এসেছেন।
রডিকের বিরুদ্ধে পেশাদার জীবনে ২৪ বার মুখোমুখি হয়েছিলেন ফেডেরার। আর্থার অ্যাশেই তাঁকে দু’বার হারিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে ২০০৬ সালের ইউএস ওপেন ফাইনাল।
বুধবারের প্রদর্শনী ম্যাচেও জয় ফেডেরারের। ৬-৩। সঙ্গে ন’টি এস।
৪৫ বছর বয়সেও তাঁর সার্ভের ধার দেখে নিউ ইয়র্কের দর্শকদের স্মৃতির দরজা খুলে যাওয়াই স্বাভাবিক।
ম্যাকেনরোর সঙ্গে জুটি
একক ম্যাচের পর দ্বৈতেও নামেন ফেডেরার। সঙ্গী আর এক কিংবদন্তি জন ম্যাকেনরো।
প্রতিপক্ষ আন্দ্রে আগাসি ও অ্যান্ডি রডিক। এক সেটের ম্যাচে ৭-৫ ব্যবধানে জয় পায় ফেডেরার-ম্যাকেনরো জুটি।
তার পর আর কোনও ম্যাচ নয়। চার কিংবদন্তি পাশাপাশি বসে থাকলেন কোর্টে।
আর তখনই এল সন্ধ্যার সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত।
ড্রোনে পাঁচ ইউএস ওপেন
আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামের আকাশে শুরু হল বিশেষ ড্রোন শো। আকাশজুড়ে ফুটে উঠল ফেডেরারের পাঁচটি ইউএস ওপেন জয়ের স্মৃতি।
যে টেনিসারকে প্রতিযোগিতামূলক খেলোয়াড় হিসেবে নিউ ইয়র্ক আনুষ্ঠানিক বিদায় জানাতে পারেনি, এই সন্ধ্যা যেন সেই অপূর্ণতাই পূরণ করল।
উচ্ছ্বসিত দর্শকদের উদ্দেশে উঠে দাঁড়িয়ে হাত নাড়লেন ৪৫ বছরের ফেডেরার। পাল্টা উঠে দাঁড়াল পুরো গ্যালারি।
করতালিতে মুখর আর্থার অ্যাশ যেন জানিয়ে দিল—বিদায়টা দেরিতে হলেও, একেবারে প্রাপ্য হল।
খেলা শেষ, সম্পর্ক নয়
প্রতিযোগিতামূলক টেনিসে ফেডেরারের ফেরার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু ইউএস ওপেনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এখানেই শেষ হচ্ছে না।
নিউ ইয়র্ক থেকে রোড আইল্যান্ডের নিউপোর্টে যাবেন তিনি। শনিবার আন্তর্জাতিক টেনিস হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে তাঁকে।
তার পর ফের ইউএস ওপেন। এ বার খেলোয়াড় হিসেবে নয়, সম্প্রচারকের ভূমিকায়।
কোর্টে আর ট্রফির জন্য লড়াই করবেন না ফেডেরার। কিন্তু নিউ ইয়র্কের সঙ্গে তাঁর গল্পটা যে এখনও শেষ হয়নি, বুধবারের সন্ধ্যাই তার প্রমাণ।
কখনও কখনও কিংবদন্তিদের বিদায় নিতে হয় না—শুধু ফিরে এসে একবার দাঁড়ালেই হয়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



