তেরঙা পোশাকে উর্বশী, উঠল আইনি প্রশ্ন

যা জানা জরুরি
- দেশপ্রেমের প্রকাশ, নাকি জাতীয় পতাকার মর্যাদাহানি?
- ‘মিস ইউনিভার্স ইন্ডিয়া ২০২৬’-এর মঞ্চে উর্বশী রাউতেলার তেরঙা-অনুপ্রাণিত পোশাক ঘিরে এখন এই প্রশ্নেই উত্তাল সমাজমাধ্যম।
- গেরুয়া, সাদা ও সবুজের বিন্যাস, কোমরের কাছে অশোকচক্রের আদলে নকশা—সব মিলিয়ে পোশাকটি ভারতের জাতীয় পতাকার কথা মনে করিয়েছে অনেককেই।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
দেশপ্রেমের প্রকাশ, নাকি জাতীয় পতাকার মর্যাদাহানি? ‘মিস ইউনিভার্স ইন্ডিয়া ২০২৬’-এর মঞ্চে উর্বশী রাউতেলার তেরঙা-অনুপ্রাণিত পোশাক ঘিরে এখন এই প্রশ্নেই উত্তাল সমাজমাধ্যম। গেরুয়া, সাদা ও সবুজের বিন্যাস, কোমরের কাছে অশোকচক্রের আদলে নকশা—সব মিলিয়ে পোশাকটি ভারতের জাতীয় পতাকার কথা মনে করিয়েছে অনেককেই। বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে পোশাকটির দীর্ঘ অংশ মেঝেতে লুটিয়ে থাকায়।
জয়পুরে আয়োজিত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে বিচারকের আসনে ছিলেন উর্বশী। এই নিয়ে তৃতীয় বার তিনি এই প্রতিযোগিতার বিচারক হলেন। মঞ্চে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলার পরই নজর কাড়ে তাঁর বিশেষ পোশাক। কাঁধখোলা, আঁটসাঁট পোশাকটির গেরুয়া ও সবুজ অংশের সঙ্গে ছিল ঝলমলে পুঁতি ও অলংকরণ। কোমরের ঠিক মাঝখানে অশোকচক্রসদৃশ নকশাই পোশাকটিকে তেরঙার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলেছে।
নিজের পোশাক নিয়ে সংবাদসংস্থা এএনআই-কে উর্বশী জানান, দিনটি তাঁর কাছে অত্যন্ত বিশেষ। গেরুয়া ও সবুজ রং বেছে নেওয়ার কথাও বলেন তিনি। আন্তর্জাতিক পোশাকশিল্পী দাশার তৈরি এই পোশাক সম্পূর্ণ করতে প্রায় তিন মাস সময় লেগেছে।
পোশাকটির কারুকাজ এবং উর্বশীর মঞ্চাভিনয় প্রশংসা পেলেও সমাজমাধ্যমে উঠেছে অন্য প্রশ্ন—জাতীয় পতাকার আদলে তৈরি পোশাক কি এ ভাবে পরা যায়? বিশেষ করে সেই পোশাকের অংশ যখন মেঝে ছুঁয়ে যাচ্ছে? এক পক্ষের মতে, এটি দেশপ্রেমের সৃজনশীল প্রকাশ। অন্য পক্ষের বক্তব্য, জাতীয় প্রতীকের রং ও ভাবনা থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া এক জিনিস, আর জাতীয় পতাকার দৃশ্যমান প্রতিরূপকে পোশাকে পরিণত করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
আইনজীবী ডক্টর ফারুখ খানের মতে, বিষয়টি ১৯৭১ সালের ‘জাতীয় সম্মানের অবমাননা প্রতিরোধ আইন’-এর ২ নম্বর ধারার আওতায় প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জাতীয় পতাকার দৃশ্যমান প্রতিরূপও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনের আওতায় আসতে পারে। পতাকা বা তার প্রতিরূপকে পোশাকের অংশ হিসেবে, বিশেষত কোমরের নীচে ব্যবহার করা এবং ইচ্ছাকৃত ভাবে মাটি বা মেঝেতে স্পর্শ করতে দেওয়া নিয়ে আইনে বিধিনিষেধ রয়েছে।
তবে শুধুমাত্র কয়েকটি ছবি বা সংক্ষিপ্ত ভিডিয়ো দেখে উর্বশী আইন ভেঙেছেন বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোও ঠিক নয়। প্রথমে দেখতে হবে পোশাকটি সত্যিই জাতীয় পতাকার প্রতিরূপ, নাকি জাতীয় পতাকার রং ও প্রতীক থেকে অনুপ্রাণিত একটি নকশা। শুধু গেরুয়া, সাদা ও সবুজের ব্যবহারই কোনও পোশাককে জাতীয় পতাকা বানিয়ে দেয় না। কিন্তু তার সঙ্গে অশোকচক্রসদৃশ প্রতীক এবং তেরঙার নির্দিষ্ট বিন্যাস যুক্ত হলে আইনি প্রশ্নটি অনেকটাই জোরালো হয়ে ওঠে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—উদ্দেশ্য। জাতীয় সম্মানের অবমাননার অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে অভিযুক্তের অভিপ্রায় এবং পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। উর্বশীর বক্তব্যে জাতীয় পতাকাকে অপমান করার কোনও উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত নেই; বরং দেশাত্মবোধ প্রকাশের কথাই উঠে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, উদ্দেশ্য ভাল হলেই ব্যবহারের ধরন স্বয়ংক্রিয় ভাবে আইনসম্মত হয়ে যায় কি না।
সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ পাহওয়ারের মতে, পোশাকটি নিছক তেরঙা-অনুপ্রাণিত না হয়ে জাতীয় পতাকার পুনর্নির্মাণ বা দৃশ্যমান প্রতিরূপ বলেই মনে হতে পারে। সেই প্রতিরূপের অংশ মেঝেতে লুটিয়ে থাকলে জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষার আইনি বিধানের সঙ্গে তা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তাঁর মতে, পোশাকের মাধ্যমে দেশপ্রেম প্রকাশে আপত্তি নেই, কিন্তু জাতীয় পতাকার রং ব্যবহার করা আর পতাকাটিকেই পোশাকে পরিণত করা এক বিষয় নয়।
ফলে উর্বশীর বিরুদ্ধে কোনও অপরাধ আদৌ প্রতিষ্ঠিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে পোশাকটির সম্পূর্ণ নকশা, রঙের বিন্যাস, অশোকচক্রের ব্যবহার, সেটি জাতীয় পতাকার প্রতিরূপ হিসেবে বিবেচিত হয় কি না এবং প্রয়োজনীয় আইনি অভিপ্রায় প্রমাণিত হয় কি না—এই সব প্রশ্নের উপর। অভিযোগ দায়ের হলে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াতেই তার উত্তর মিলবে।
এদিকে বিতর্কের মধ্যেই এ বছরের ‘মিস ইউনিভার্স ইন্ডিয়া’ হয়েছেন কেরলের কাজিয়াহ লিজ মেজো। ৫২ জন প্রতিযোগীকে পিছনে ফেলে তিনি শিরোপা জেতেন। তামিলনাড়ুর বৈষ্ণবী গণেশ প্রথম সহবিজয়ী এবং গুজরাতের অনুশ্রী সাতাভলেকর দ্বিতীয় সহবিজয়ী হয়ে ‘মিস ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডিয়া ২০২৬’ খেতাব পান। নভেম্বরে পুয়ের্তো রিকোয় আয়োজিত ৭৫তম ‘মিস ইউনিভার্স’ প্রতিযোগিতায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন কাজিয়াহ।
তবে ফলাফলের পাশাপাশি আপাতত আলোচনার কেন্দ্রে উর্বশীর পোশাকই। ঝলমলে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার মঞ্চ থেকে সেই পোশাকই তুলে দিয়েছে আরও বড় প্রশ্ন—জাতীয় প্রতীকের প্রতি শ্রদ্ধা আর সৃজনশীল স্বাধীনতার সীমারেখা ঠিক কোথায়?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



