‘ডন ৩’-এ চুক্তির ডন কে?

যা জানা জরুরি
- রণবীরের দাবি ‘শুধু সমঝোতাপত্র’, এক্সেলের অভিযোগ চুক্তিভঙ্গের; শেষ কথা কি বলবে আদালত?
- ‘ডন ৩’ থেকে রণবীর সিংয়ের আচমকা সরে দাঁড়ানো নিয়ে বিতর্ক এবার গড়িয়েছে আইনের দরজায়।
- অভিনেতার দাবি, প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে তাঁর কোনও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি, হয়েছিল শুধু একটি সমঝোতাপত্র।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
রণবীরের দাবি ‘শুধু সমঝোতাপত্র’, এক্সেলের অভিযোগ চুক্তিভঙ্গের; শেষ কথা কি বলবে আদালত?
‘ডন ৩’ থেকে রণবীর সিংয়ের আচমকা সরে দাঁড়ানো নিয়ে বিতর্ক এবার গড়িয়েছে আইনের দরজায়। অভিনেতার দাবি, প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে তাঁর কোনও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি, হয়েছিল শুধু একটি সমঝোতাপত্র। অন্যদিকে ফারহান আখতার ও রীতেশ সিধওয়ানির সংস্থা এক্সেল এন্টারটেইনমেন্টের অভিযোগ, ছবির প্রস্তুতি অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পর রণবীর কোনও আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই সরে গিয়েছেন।
তাহলে প্রশ্নটা সোজা—‘সমঝোতাপত্র’ লিখে দিলেই কি তার আইনি দায় থাকে না?
এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য নথির নামের মধ্যে নেই। আইনজ্ঞদের মতে, কোনও নথির শিরোনাম নয়, তার ভাষা, শর্ত এবং পরে দুই পক্ষ কী ভাবে সেই নথি মেনে চলেছে—এসবই ঠিক করবে সেটি আইনত বাধ্যতামূলক ছিল কি না।
চলচ্চিত্র সংগঠন কি আদালত?
রণবীরকে ঘিরে বিরোধে এক্সেল প্রথমে ফেডারেশন অব ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনে এমপ্লয়িজের দ্বারস্থ হয়েছিল। সেখানে প্রত্যাশিত ফল না মেলায় সম্প্রতি ইন্ডিয়ান মোশন পিকচার প্রোডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনে অভিযোগ জানায় তারা। সংগঠনটি এক্সেলের বক্তব্য শোনার পর রণবীরকেও নিজের অবস্থান জানাতে বলে।
রণবীরের বাবা জগজিৎ সিং ভবনানি আলোচনায় বসতে রাজি হলেও অভিনেতার প্রতিনিধিরা লিখিত জবাবে দাবি করেন, এই বিরোধে সংগঠনটির কোনও বিচারিক এক্তিয়ার নেই। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা হলে আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের খবর।
এর আগে চলচ্চিত্রকর্মীদের সংগঠনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থান নিয়েছিলেন রণবীর। তাঁর যুক্তি, বেসরকারি চলচ্চিত্র সংগঠন আদালত নয়। ফলে কোনও অভিনেতাকে চুক্তিভঙ্গের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা, অসহযোগিতার নির্দেশ দেওয়া বা ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণ করার ক্ষমতা তাদের নেই। এক্সেলের আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়াই পথ।
‘সমঝোতাপত্র’ মানেই হালকা কাগজ নয়
রণবীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি—‘ডন ৩’-এর জন্য কোনও পূর্ণাঙ্গ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। ছিল শুধু একটি সমঝোতাপত্র। কিন্তু সেটাই তাঁকে স্বয়ংক্রিয় ভাবে দায়মুক্ত করে না।
ধরা যাক, ওই নথিতে স্পষ্ট লেখা রয়েছে যে রণবীর নির্দিষ্ট চরিত্রে অভিনয় করবেন, কত পারিশ্রমিক পাবেন, কোন সময় তাঁর জন্য সংরক্ষিত থাকবে, প্রচারে তাঁর দায়িত্ব কী হবে এবং মাঝপথে সরে গেলে কী হবে। সে ক্ষেত্রে সেটিকে নিছক আলোচনার কাগজ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।
বিশেষ করে ‘করবেন’, ‘বাধ্য থাকবেন’ বা ‘অঙ্গীকার করছেন’-এর মতো বাধ্যতামূলক ভাষা থাকলে আদালত দেখতে পারে, দুই পক্ষ বাস্তবে একটি চূড়ান্ত বোঝাপড়ায় পৌঁছেছিল কি না।
উল্টো দিকে, যদি নথিতেই বলা থাকে যে পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনও শর্ত কার্যকর হবে না, আর পারিশ্রমিক, শুটিংয়ের সময়সূচি, সৃজনশীল অনুমোদন বা চুক্তি বাতিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তখনও চূড়ান্ত না হয়ে থাকে, তা হলে রণবীরের অবস্থান অনেকটাই শক্তিশালী হতে পারে।
কাগজের বাইরে প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ
শুধু সমঝোতাপত্র দেখেই বিষয়টি শেষ হবে না। দুই পক্ষের পরবর্তী আচরণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রণবীরকে অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল কি না, তিনি ছবির জন্য দিন সংরক্ষণ করেছিলেন কি না, তাঁর সম্মতিতে প্রাক্-প্রযোজনার কাজ শুরু হয়েছিল কি না কিংবা তাঁর প্রতিশ্রুতির উপর নির্ভর করে এক্সেল কতটা অর্থ খরচ করেছিল—এসবই সম্ভাব্য আইনি লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।
তিন বছর আগে এক্সেল ও রণবীর যৌথভাবে ‘ডন ৩’-এর পরিচিতিচিত্র প্রকাশ করেছিল। সেখানে রণবীরকেই নামভূমিকায় দেখা যায়। এক্সেলের দাবি, বহির্দৃশ্যের শুটিংয়ের প্রস্তুতি, প্রাক্-প্রযোজনার খরচ এবং ফারহানের সঙ্গে রণবীরের নিয়মিত যোগাযোগের নথিও তাদের হাতে রয়েছে।
এই তথ্যগুলি প্রমাণ করতে পারলে প্রযোজনা সংস্থা যুক্তি দিতে পারে, রণবীরের প্রতিশ্রুতির উপর ভরসা করেই তারা উল্লেখযোগ্য অর্থ খরচ করেছিল।
রণবীরকে কি ‘ডন’ হতে বাধ্য করা যাবে?
এখানেই এক্সেলের আইনি লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা।
কোনও অভিনেতাকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি ছবিতে অভিনয় করানোর নির্দেশ আদালত সাধারণত দেয় না। অভিনয় ব্যক্তিগত ও সৃজনশীল পরিষেবা; অনিচ্ছুক শিল্পীকে দিয়ে তা করানো বাস্তবসম্মতও নয়।
ফলে চুক্তি সত্যিই ভঙ্গ হয়ে থাকলে সম্ভাব্য লড়াইয়ের কেন্দ্র হতে পারে ক্ষতিপূরণ। এক্সেলকে দেখাতে হবে, রণবীরের সিদ্ধান্তের কারণে কী ধরনের প্রত্যক্ষ ও পূর্বানুমানযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এবং সেই ক্ষতি কমানোর জন্য প্রযোজনা সংস্থা কী পদক্ষেপ নিয়েছিল।
তবে শুধু বড় অঙ্কের ক্ষতির দাবি করলেই তা আদালত মেনে নেবে না। ক্ষতির প্রকৃতি, প্রমাণ এবং দুই পক্ষের আচরণ—সবই খতিয়ে দেখা হবে।
শেষ পর্যন্ত তাই ‘ডন ৩’-এর এই লড়াইয়ে আসল প্রশ্ন রণবীর সরে দাঁড়াতে পারতেন কি না, তা নয়। প্রশ্ন হল—যে সমঝোতাপত্রে সই হয়েছিল, সেটি আদৌ চুক্তি ছিল কি না।
নথির ভাষা, ই-মেল ও বার্তালাপ, অর্থের লেনদেন, প্রযোজনার অগ্রগতি এবং দুই পক্ষের আচরণ—সব মিলিয়েই মিলবে সেই উত্তর। আর যদি সত্যিই আদালত পর্যন্ত গড়ায় এই লড়াই, তা হলে ‘ডন ৩’-এর আসল ‘ডন’ কে, সেই সিদ্ধান্ত কোনও চলচ্চিত্র সংগঠন নয়, শেষ পর্যন্ত আদালতই দিতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



