‘না যুদ্ধ, না শান্তি’—সমঝোতাই চান পেজেশকিয়ান

যা জানা জরুরি
- প্রায় ছ’মাস ধরে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং থমকে থাকা পরমাণু আলোচনার মধ্যে আমেরিকার সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককেই সঙ্কট থেকে বেরোনোর সবচেয়ে কার্যকর পথ বলে…
- তাঁর মতে, বর্তমানের ‘না যুদ্ধ, না শান্তি’ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ইরানের অর্থনীতি আরও দুর্বল হবে এবং নতুন বিনিয়োগ টানাও কঠিন হয়ে পড়বে।
- রবিবার ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা-য় প্রকাশিত এক বক্তৃতায় পেজেশকিয়ান বলেন, দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা মনে করেন, জাতীয় মর্যাদা, বিচক্ষণতা এবং রাষ্ট্রীয়…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রায় ছ’মাস ধরে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং থমকে থাকা পরমাণু আলোচনার মধ্যে আমেরিকার সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককেই সঙ্কট থেকে বেরোনোর সবচেয়ে কার্যকর পথ বলে দাবি করলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তাঁর মতে, বর্তমানের ‘না যুদ্ধ, না শান্তি’ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ইরানের অর্থনীতি আরও দুর্বল হবে এবং নতুন বিনিয়োগ টানাও কঠিন হয়ে পড়বে।
রবিবার ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা-য় প্রকাশিত এক বক্তৃতায় পেজেশকিয়ান বলেন, দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা মনে করেন, জাতীয় মর্যাদা, বিচক্ষণতা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করলে আমেরিকার সঙ্গে হওয়া সমঝোতাই এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। বিরোধীদের উদ্দেশে তাঁর স্পষ্ট বার্তা—এই সমঝোতাকে কোনও ভাবেই আত্মসমর্পণ বলা যায় না।
পেজেশকিয়ানের কথায়, “এই চুক্তিতে এমন একটি ধারাও নেই, যা আত্মসমর্পণের সমতুল্য।” সর্বোচ্চ নেতা যে নীতি নির্ধারণ করেন, তাঁর সরকার সেই পথই অনুসরণ করবে বলেও জানান তিনি।
তাঁর এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইরানের রক্ষণশীল ও সামরিক শিবিরের একাংশ শুরু থেকেই আমেরিকার সঙ্গে আলোচনার বিরোধিতা করে আসছে। তাদের আশঙ্কা, আলোচনার আড়ালে ওয়াশিংটন আসলে তেহরানকে আরও দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
৬০ দিনের সময়সীমা, তবু সমাধান নেই
জুনের মাঝামাঝি আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তার ভিত্তিতে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছতে ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সেই সময়সীমা গত সপ্তাহে শেষ হয়ে গেলেও কোনও সমাধানসূত্র মেলেনি। আলোচনার মেয়াদ বাড়ানো নিয়েও দুই পক্ষ একমত হতে পারেনি।
সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।
ওয়াশিংটনের দাবি, তেহরানের হাতে এমন কোনও সক্ষমতা থাকা চলবে না, যার সাহায্যে পরমাণু অস্ত্র তৈরি সম্ভব। ইরানের পাল্টা যুক্তি, শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার তাদের রয়েছে এবং বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
পেজেশকিয়ান বনাম রেজাই
পেজেশকিয়ানের আপসের বার্তার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নতুন প্রধান মহসেন রেজাই। তাঁর হুঁশিয়ারি, আমেরিকার নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সমর্থন করা কোনও দেশ বা সংস্থার পদক্ষেপকে ইরানের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধের কাজ’ হিসেবে দেখা হবে।
প্রাক্তন বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী প্রধান রেজাই আরও বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন কোনও ব্যবস্থা নিলে ইরানের প্রত্যাঘাত হবে ‘ভূমিকম্পের মতো’। প্রয়োজনে পারস্য উপসাগর থেকে তেল পরিবহণের হরমুজ-বিকল্প পথগুলিকেও নিশানা করা হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
দুই নেতার বক্তব্যে তেহরানের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনও স্পষ্ট। এক দিকে পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন অসামরিক প্রশাসন যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে আলোচনায় ফেরার পক্ষে। অন্য দিকে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ও কট্টরপন্থী শিবির শক্তি প্রদর্শন এবং প্রতিরোধকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
যুদ্ধের চাপ অর্থনীতিতেও
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে আমেরিকা ও ইজরায়েলের আক্রমণের পর শুরু হওয়া সংঘাতে ইরানের সামরিক ও পরিকাঠামোগত ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। মূল্যবৃদ্ধি, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্কট আরও তীব্র হয়েছে।
পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের নেপথ্যে তাই শুধু কূটনীতি নয়, অর্থনীতির চাপও বড় কারণ। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা বজায় থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হবে না বলেই মনে করছে তাঁর সরকার।
এর মধ্যেই আমেরিকার অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি ঘোষণা করেছেন। তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া তৃতীয় দেশ ও সংস্থার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
হরমুজেও চাপ বাড়ছে
গত ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালীতে নিশ্চিত কোনও হামলার খবর না মিললেও জাহাজ চলাচল এখনও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। ইরানের নবগঠিত পারস্য উপসাগরীয় প্রণালী কর্তৃপক্ষ কয়েক ডজন জাহাজের তালিকা প্রকাশ করে জানিয়েছে, নিয়মভঙ্গের অভিযোগে ভবিষ্যতে তাদের জরিমানা বা আটক করা হতে পারে।
প্রণালী পরিচালনা এবং জাহাজের কাছ থেকে শুল্ক আদায়ের সম্ভাবনা নিয়েও ওমানের সঙ্গে ইরানের আলোচনা চলছে। ফলে হরমুজকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপড়েন।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের তেহরান সফরও বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। ইসলামাবাদ আমেরিকা ও ইরানকে ফের আলোচনার টেবিলে বসানোর চেষ্টা করছে।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য সিদ্ধান্তটা তেহরানের। পেজেশকিয়ানের সমঝোতার হাত বাড়ানো জিতবে, নাকি রেজাইয়ের যুদ্ধংদেহী হুঁশিয়ারি? সেই উত্তরই শুধু ইরান-আমেরিকা সংঘাতের ভবিষ্যৎ নয়, গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতাও নির্ধারণ করতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



