নিজ্জর-কাণ্ডে ‘স্বীকারোক্তি’?

যা জানা জরুরি
- খলিস্তানপন্থী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যার প্রায় তিন বছর পর নতুন করে চাঞ্চল্য।
- পলাতক গ্যাংস্টার সতীন্দরজিৎ সিং ওরফে গোল্ডি ব্রার হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন—সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কথিত কথোপকথন ঘিরে এমনই দাবি উঠেছে।
- তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ওই অডিয়োর সত্যতা এখনও কোনও তদন্তকারী সংস্থা স্বাধীন ভাবে নিশ্চিত করেনি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
খলিস্তানপন্থী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যার প্রায় তিন বছর পর নতুন করে চাঞ্চল্য। পলাতক গ্যাংস্টার সতীন্দরজিৎ সিং ওরফে গোল্ডি ব্রার হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন—সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কথিত কথোপকথন ঘিরে এমনই দাবি উঠেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ওই অডিয়োর সত্যতা এখনও কোনও তদন্তকারী সংস্থা স্বাধীন ভাবে নিশ্চিত করেনি।
ফাঁস হওয়া বলে প্রচারিত কথোপকথনটি ব্রার এবং ব্রিটেনে বসবাসকারী খলিস্তানপন্থী পরমজিৎ সিং পাম্মার মধ্যে হয়েছে বলে দাবি। সেখানে নিজ্জরের সঙ্গে তাঁর বিরোধের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্রারকে বলতে শোনা যায়, নিজ্জর অপ্রাপ্তবয়স্কদের মাদক সেবন ও কারবারের সঙ্গে যুক্ত করছিলেন। বেআইনি অস্ত্র কারবারের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ব্রারের দাবি, নিজ্জরকে একাধিক বার সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেই কাজ বন্ধ করেননি। কথোপকথনে ব্রারকে বলতে শোনা যায়, “এই কারণেই আমাদের কাজটি করতে হয়েছিল। প্রত্যেককেই নিজের কাজের পরিণাম ভোগ করতে হয়।” তাঁর সহযোগীরাই নিজ্জরকে হত্যা করেছিল বলেও তিনি দাবি করেছেন।
তবে এই বক্তব্যের সমর্থনে ব্রার কোনও প্রমাণ দিয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। নিজ্জরের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র কারবারের অভিযোগও আদালতে প্রমাণিত নয়। ফলে কথিত অডিয়োয় থাকা দাবিগুলিকে আপাতত অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
২০২৩ সালের ১৮ জুন কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার সারেতে একটি গুরুদ্বারের বাইরে গুলি করে হত্যা করা হয় নিজ্জরকে। কানাডার নাগরিক নিজ্জরকে ভারত সন্ত্রাসবাদী হিসেবে ঘোষণা করেছিল। স্বাধীন খলিস্তান রাষ্ট্রের দাবিতে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস পর তৎকালীন কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো কানাডার সংসদে দাবি করেন, নিজ্জর-হত্যার সঙ্গে ভারত সরকারের প্রতিনিধিদের সম্ভাব্য যোগসূত্রের বিষয়ে তাঁর সরকারের কাছে ‘বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ’ রয়েছে। নয়াদিল্লি সেই অভিযোগকে অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করে। এরপরই দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। কূটনীতিক বহিষ্কার থেকে শুরু করে ভিসা পরিষেবা নিয়ে টানাপোড়েন—দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কার্যত তলানিতে ঠেকে।
২০২৪ সালে রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ ভারতীয় কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে কানাডায় হিংসা, ভয় দেখানো এবং চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগও তোলে। ভারত অবশ্য সেই অভিযোগ অস্বীকার করে।
এর মধ্যেই কথিত এই ‘স্বীকারোক্তি’ সামনে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পর। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি কেন্দ্রীয় আদালতে প্রকাশিত অভিযোগপত্রে মার্কিন কৌঁসুলিরা দাবি করেন, জেলবন্দি লরেন্স বিষ্ণোই এবং তাঁর সহযোগী গোল্ডি ব্রার ২০২৩ সালে নিজ্জরকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তদন্তকারীদের অভিযোগ, জেল থেকে চোরাই মোবাইল ব্যবহার করে বিষ্ণোই নিজ্জরের ছবি ও একাধিক ঠিকানা সহযোগীদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। উত্তর আমেরিকায় সেই চক্রের কার্যকলাপ পরিচালনা করতেন ব্রার বলে অভিযোগ।
তবে এখানেও সতর্ক থাকা জরুরি। আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্র কোনও অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণ করে না। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তেরা আইনত নির্দোষ।
সিধু মুসেওয়ালা হত্যাকাণ্ড-সহ একাধিক গুরুতর মামলায় ভারতে ব্রারকে খোঁজা হচ্ছে। ভারত সরকার তাঁকে ব্যক্তিগত সন্ত্রাসবাদী হিসেবেও চিহ্নিত করেছে। ফলে তাঁর কথিত স্বীকারোক্তি একদিকে তদন্তে নতুন সূত্রের সম্ভাবনা তৈরি করলেও, অন্যদিকে এটিও প্রশ্ন উঠছে—নিজের অপরাধচক্রকে জাহির করা কিংবা হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক ব্যাখ্যাকে অন্য দিকে ঘোরানোর জন্য কি এমন দাবি করা হতে পারে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অডিয়োটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই। সেটি কোথা থেকে এল? কবে কথোপকথনটি হয়েছিল? সম্পাদনা বা কারসাজি হয়েছে কি না? ব্রার সত্যিই কথাগুলি বলেছেন কি না? স্বাধীন তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর না মেলা পর্যন্ত অডিয়োটিকে প্রমাণ হিসেবে ধরা কঠিন।
তবে দাবি সত্যি প্রমাণিত হলে ঘটনাটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেবে। কারণ ভারত দীর্ঘদিন ধরেই নিজ্জর হত্যার ক্ষেত্রে আন্তর্দেশীয় অপরাধচক্র এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সম্ভাবনার কথা বলে এসেছে। অন্যদিকে, মার্কিন অভিযোগপত্রেও ভারত সরকারের কোনও আধিকারিককে নিজ্জর হত্যার অভিযুক্ত করা হয়নি।
তাই ব্রারের কথিত স্বীকারোক্তি কানাডার সমস্ত অভিযোগ এক কথায় খারিজ করে দেয় না। আবার কানাডার অভিযোগও এই অডিয়োকে অগ্রাহ্য করার কারণ হতে পারে না। আসল সত্যি লুকিয়ে আছে তদন্তের পরবর্তী ধাপে—হত্যার নির্দেশ কোথা থেকে এসেছিল, কারা তা কার্যকর করেছিল এবং পুরো চক্রটির পিছনে আদৌ কতটা বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ছিল, এখন নজর সেদিকেই।
অতএব, আপাতত এটি ‘স্বীকারোক্তি’ নয়, বরং এক অভিযুক্ত অপরাধীর কথিত এবং অযাচাইকৃত দাবি। প্রমাণের পরীক্ষায় টিকলেই কেবল তার ওজন বাড়বে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



