খবর

অন্নপূর্ণার টাকা কোথায়?

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না-পাওয়া নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় মহিলাদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর অবশেষে প্রশাসনিক সমস্যার কথা স্বীকার করলেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।
  • রবিবার হাওড়ার এক অনুষ্ঠানে তাঁর দাবি, প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় কিছু “বিচ্যুতি ও সমস্যা” দেখা দিয়েছে।
  • এমনকি কোথাও কোথাও “অন্তর্ঘাতের চেষ্টা” হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না-পাওয়া নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় মহিলাদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর অবশেষে প্রশাসনিক সমস্যার কথা স্বীকার করলেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। রবিবার হাওড়ার এক অনুষ্ঠানে তাঁর দাবি, প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় কিছু “বিচ্যুতি ও সমস্যা” দেখা দিয়েছে। এমনকি কোথাও কোথাও “অন্তর্ঘাতের চেষ্টা” হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই গেল—অন্তর্ঘাত করল কারা?

শমীক কোনও রাজনৈতিক দল, সরকারি কর্মী, পঞ্চায়েত, পুরসভা কিংবা প্রযুক্তি-পরিচালনাকারী সংস্থার নাম করেননি। কোথায় অন্তর্ঘাত হয়েছে, কীভাবে হয়েছে, তার প্রমাণ কী—সেসবও জানাননি। কারও বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ, বিভাগীয় তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসেনি। ফলে আপাতত ‘অন্তর্ঘাত’ একটি রাজনৈতিক অভিযোগই, প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক তথ্য নয়।

আর এখানেই অস্বস্তির জায়গা। রাজ্যে বিজেপির সরকার, প্রকল্পের দায়িত্বও রাজ্য প্রশাসনের। উপভোক্তার আবেদন, তথ্য যাচাই, তালিকা তৈরি এবং সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর পুরো ব্যবস্থাই সরকারের নিয়ন্ত্রণে। সত্যিই কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবে নাম বাদ দিয়ে থাকলে, ভুল তথ্য ঢুকিয়ে থাকলে কিংবা অনুমোদিত আবেদন আটকে রাখলে তাকে খুঁজে বার করার দায়িত্বও সরকারেরই।

অর্থাৎ শমীকের ‘অন্তর্ঘাত’ তত্ত্ব সমস্যার সমাধান করার বদলে আরও কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।

টাকা আটকাল কোথায়?

অন্নপূর্ণা যোজনায় যোগ্য মহিলাদের মাসে ৩,০০০ টাকা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়ার কথা। আগস্টের কিস্তির জন্য ১০ জুলাইয়ের মধ্যে আবেদন করে যোগ্য বিবেচিত মহিলাদের ২০ আগস্টের মধ্যে টাকা পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও বহু মহিলার অ্যাকাউন্টে টাকা না ঢোকায় মুর্শিদাবাদ, কোচবিহার, হুগলি, হাওড়া-সহ একাধিক জেলায় বিক্ষোভ শুরু হয়। কোথাও রাস্তা ও রেল অবরোধ, কোথাও প্রশাসনিক দফতর ঘেরাও—ক্ষোভ ক্রমেই ছড়িয়েছে।

প্রকাশিত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, তৃতীয় কিস্তিতে নির্বাচিত প্রায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলার মধ্যে ১ কোটি ৩৭ লক্ষের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় আট লক্ষ অনুমোদিত উপভোক্তা তখনও টাকা পাননি। শমীক অবশ্য দাবি করেছেন, মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ মহিলা টাকা পাননি। শতাংশের হিসাবে সংখ্যাটি কম মনে হলেও প্রকল্পের বিপুল পরিধিতে তা কয়েক লক্ষ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সমস্যা শুরু হচ্ছে আরও আগের স্তর থেকেই। প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ আবেদন জমা পড়লেও প্রায় ১ কোটি ৬২ লক্ষের যাচাই সম্পূর্ণ হয়েছে বলে খবর। অর্থাৎ প্রায় ১৮ লক্ষ আবেদন তখনও যাচাইয়ের কোনও না কোনও পর্যায়ে আটকে ছিল। স্থানীয় স্তরে তথ্য যাচাই, যোগ্যতা পরীক্ষা এবং চূড়ান্ত অনুমোদন শেষ না হলে সেই নাম অর্থপ্রদানের তালিকায় ওঠার সুযোগ নেই।

আধার-ব্য়াংকেও গোলমাল

আর একটি বড় সমস্যা আধার ও ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্যের অসঙ্গতি। আবেদনপত্র, আধার এবং ব্যাংকের নথিতে নামের বানান, জন্মতারিখ কিংবা অ্যাকাউন্ট নম্বরের অমিল থাকলে সরাসরি টাকা পাঠানো ব্যর্থ হতে পারে। কোথাও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আধারের সঙ্গে যুক্ত নয়, কোথাও আবার সংযোগ থাকলেও সরকারি অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা সক্রিয় হয়নি। নিষ্ক্রিয় বা বন্ধ অ্যাকাউন্ট, ভুল শাখা-সংকেত এবং একাধিক আবেদনও অর্থ আটকে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ১০ লক্ষ ক্ষেত্রে আধার-ব্য়াংক সংযোগের সমস্যার কথা উঠে এসেছে। তবে এই সংখ্যার জেলা-ভিত্তিক এবং কারণভিত্তিক সরকারি হিসাব প্রকাশ না হলে প্রকৃত সমস্যার পরিমাণ বোঝা কঠিন।

এর সঙ্গে রয়েছে পুরনো উপভোক্তা ও নতুন আবেদনকারীদের তথ্য একসঙ্গে সামলানোর চাপ। লক্ষ্মীর ভান্ডারের পুরনো উপভোক্তাদের অন্নপূর্ণায় স্থানান্তর এবং নতুন আবেদন যাচাইয়ের সময় তথ্যের পুনরাবৃত্তি, ভুল কিংবা বাদ পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কারও আবেদন প্রথমে ‘বাতিল’ দেখানোর পর পুনর্যাচাইয়ে ‘অনুমোদিত’ হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

ইতিমধ্যে দাবি ও আপত্তি জানানোর ব্যবস্থায় আড়াই লক্ষের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। এত বিপুল সংখ্যক আপত্তি অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে—প্রথম দফার যাচাই এবং তথ্য ব্যবস্থাপনায় প্রশ্ন তোলার মতো জায়গা রয়েছে।

নতুন নাম, পুরনো সমস্যা?

এর মধ্যেই আরও প্রায় ৫০ লক্ষ মহিলাকে অন্নপূর্ণা যোজনার আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন শমীক। কিন্তু বর্তমান তালিকাতেই যদি যাচাই, ব্যাংক সংযোগ এবং অর্থপ্রদানের সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে নতুন করে বিপুল সংখ্যক নাম যোগ করলে প্রশাসনিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন রাজনৈতিক ব্যাখ্যার চেয়ে স্বচ্ছ প্রশাসনিক হিসাব। কতজনের টাকা আটকে? কোন জেলায় কতজনের? কেন আটকে? কতগুলি আবেদন যাচাইয়ে? কতগুলি ব্যাংক-আধার সমস্যায়? আর কবে নাগাদ প্রত্যেকের টাকা পৌঁছবে?—সরকারের কাছ থেকে এই তথ্যই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।

আর সত্যিই যদি ‘অন্তর্ঘাত’ হয়ে থাকে, তদন্ত করে অন্তর্ঘাতকারীর নামও প্রকাশ্যে আনতে হবে। প্রমাণ থাকলে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর প্রমাণ না থাকলে কয়েক লক্ষ মহিলার প্রাপ্য টাকা আটকে যাওয়ার দায় অজ্ঞাত ষড়যন্ত্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।

কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ—অন্নপূর্ণার টাকা আটকাল কেন?

রাজনৈতিক অভিযোগ নয়, সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন চাইছেন উপভোক্তারা।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles