ভাঙা স্কুল থেকে মৃত্যুর অভিযোগ, বিজেপির সামনে নতুন চাপ সিজেপির

যা জানা জরুরি
- মাত্র কয়েক মাস আগে ব্যঙ্গ, প্রতিবাদ এবং সমাজমাধ্যমের ক্ষোভ থেকে জন্ম নিয়েছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি।
- এখন সেই নবীন সংগঠনই পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের সামনে একের পর এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলছে।
- প্রথমে সরকারি স্কুলের বেহাল দশা নিয়ে দেশজোড়া প্রচার, তার পর বাঁকুড়ায় সংগঠনের এক কর্মীর বাবার মৃত্যুকে ঘিরে সংঘাত—দুই ঘটনাকে এক সুতোয় বেঁধে শিক্ষা, নাগরিক…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মাত্র কয়েক মাস আগে ব্যঙ্গ, প্রতিবাদ এবং সমাজমাধ্যমের ক্ষোভ থেকে জন্ম নিয়েছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। এখন সেই নবীন সংগঠনই পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের সামনে একের পর এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলছে। প্রথমে সরকারি স্কুলের বেহাল দশা নিয়ে দেশজোড়া প্রচার, তার পর বাঁকুড়ায় সংগঠনের এক কর্মীর বাবার মৃত্যুকে ঘিরে সংঘাত—দুই ঘটনাকে এক সুতোয় বেঁধে শিক্ষা, নাগরিক অধিকার এবং রাজনৈতিক হিংসার প্রশ্নে সরকারকে চাপে ফেলার চেষ্টা করছে সিজেপি।
সিজেপির নতুন কর্মসূচির নাম ‘স্কুল ঠিক করো’। লক্ষ্য, গ্রাম ও ছোট শহরের সরকারি স্কুলে গিয়ে পানীয় জল, শৌচাগার, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকসংখ্যা এবং পড়াশোনার পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক মহারাষ্ট্রের হিঙ্গোলি জেলার সানতুক পিম্পরি গ্রামের নিজের পুরনো স্কুল থেকেই এই অভিযানের সূচনা করেন। সেই স্কুলে প্রথম কম্পিউটার পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাকে সংগঠনটি তাদের প্রচারের বাস্তব সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে।
দীপকের বক্তব্য, মন্ত্রী, শিক্ষা আধিকারিক এবং সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা নিজের সন্তানদের সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ালে ব্যবস্থার উন্নতির জন্য প্রকৃত চাপ তৈরি হবে।
এই কর্মসূচির সূত্রেই বাঁকুড়ার ইন্দাস থানার কড়িশুন্ডা গ্রামের বাসিন্দা শেখ আবদুল হাফিজ ১৩ আগস্ট তাঁর পুরনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান। স্কুলে পানীয় জল ও শৌচাগারের ব্যবস্থা কেমন, পড়ুয়াদের কী সমস্যা—এসব নিয়ে খোঁজ নেন তিনি। স্থানীয় সিজেপি কর্মীদের দাবি, হাফিজ স্কুলের ছবি ও ভিডিয়োও তুলেছিলেন এবং প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আরও বিস্তারিত কথা বলার জন্য সময় চেয়েছিলেন।
হাফিজের অভিযোগ, ওই রাতেই লাঠি ও লোহার রড নিয়ে একদল লোক তাঁর বাড়িতে হামলা চালায়। তাঁর মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে স্কুলের ছবি ও ভিডিয়ো মুছে দেওয়া হয়। ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাঁর বাবা শেখ মহম্মদ মাফিকও আক্রান্ত হন।
প্রথমে তাঁকে ইন্দাস ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে স্থানান্তরিত করা হয় বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ১৫ আগস্ট রাতে তাঁর মৃত্যু হয়।
পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ খুনের মামলা রুজু করেছে এবং আট জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের মধ্যে স্থানীয় এক বিজেপি নেতা তথা বুথ সভাপতি রয়েছেন বলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি। আরও কয়েক জন অভিযুক্তের খোঁজ চলছে। সিজেপির প্রতিনিধি দল মাফিকের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছে এবং সমস্ত অভিযুক্তকে গ্রেফতারের জন্য রাজ্য সরকারকে সময়সীমাও দিয়েছে। বাম ছাত্র সংগঠন এসএফআইও প্রতিবাদের ডাক দিয়েছে।
কিন্তু এখানেই শুরু হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি—মাফিকের মৃত্যু ঠিক কী ভাবে হল?
সিজেপি এবং পরিবার বলছে, হামলায় পাওয়া আঘাতের জেরেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। তাদের দাবি, মাফিকের আঘাত গুরুতর ছিল না; একটি সেলাই করার প্রয়োজন হয়েছিল। পরে রক্তচাপের প্রবল ওঠানামার কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অর্থাৎ হামলার অভিযোগ পুলিশ অস্বীকার করছে না। কিন্তু সেই হামলার আঘাতই সরাসরি মৃত্যুর কারণ—এই দাবির বিষয়ে এখনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছয়নি তদন্তকারী সংস্থা।
এই জায়গায় ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনাটিকে নিশ্চিত ভাবে ‘রাজনৈতিক খুন’ বলা যেমন ঠিক হবে না, তেমনই স্কুল পরিদর্শনের পর হামলা এবং তার দু’দিনের মধ্যে মৃত্যুর ঘটনাক্রমকেও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বিজেপির অস্বস্তি কোথায়?
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির সঙ্গে ঘটনার যোগ অস্বীকার করে বলেছেন, অভিযুক্তেরা যে রাজনৈতিক পতাকাই বহন করুক না কেন, তাঁদের অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু ধৃতদের মধ্যে স্থানীয় বিজেপির এক পদাধিকারী থাকার অভিযোগ রাজনৈতিক অস্বস্তি বাড়িয়েছে। বিরোধীদের প্রশ্ন, দলের সঙ্গে কোনও যোগ না থাকলে স্থানীয় বিজেপি নেতা কেন গ্রেফতার হলেন?
বিজেপির পাল্টা যুক্তি, কোনও ব্যক্তির দলীয় পরিচয় থাকলেই প্রমাণ হয় না যে দল বা তার নেতৃত্ব হামলার নির্দেশ দিয়েছে।
এই পার্থক্যটিই আপাতত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র—দুইটি এক জিনিস নয়। তদন্তে তার প্রমাণ মিললেই কেবল ঘটনাটিকে দলীয় নির্দেশে সংঘটিত হামলা হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে।
সিজেপির রাজনীতি অন্য রকম
সিজেপির কৌশলের জায়গাটি এখানেই আলাদা। সংগঠনটি আপাতত ভোট, প্রার্থী বা জটিল মতাদর্শের বদলে মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাকে সামনে আনছে—ভাঙা স্কুল, অকেজো শৌচাগার, পানীয় জলের সমস্যা, বেকারত্ব এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির অভাব।
স্মারকলিপি দেওয়ার বদলে তরুণদের হাতে মুঠোফোন তুলে দিয়ে স্থানীয় সমস্যার ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করানো হচ্ছে। ফলে কোনও প্রত্যন্ত গ্রামের একটি স্কুলের ছবি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হতে পারে।
বাঁকুড়ার ঘটনাটি সেই প্রচারে আরও আবেগ যোগ করেছে। সিজেপি এখন মাফিকের মৃত্যুকে শুধু একটি পরিবারের বিপর্যয় হিসেবে দেখছে না; সরকারি পরিষেবা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার এবং নাগরিকের নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গেও সেটিকে জুড়ে দিচ্ছে।
বিজেপির জন্য এখানেই দ্বিমুখী চাপ।
কঠোর প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া সিজেপিকে ‘নির্যাতিত তরুণ আন্দোলন’-এর ভাবমূর্তি দিতে পারে। আবার বিষয়টি উপেক্ষা করলে সরকারি স্কুলের দুরবস্থা নিয়ে সংগঠনটির প্রচার আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
সিজেপিরও ঝুঁকি আছে
তবে সিজেপির পথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। স্কুল পরিদর্শনের নামে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ, শিক্ষক বা পড়ুয়াদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ কিংবা যাচাই না-করা অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠলে সংগঠনের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
মাফিকের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। রাজনৈতিক আবেগ যতই প্রবল হোক, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য, ময়নাতদন্ত এবং তদন্তের ফলকেই শেষ কথা বলতে হবে।
তার পরেও একটি বিষয় স্পষ্ট—সিজেপি এখনও পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক শক্তি না হলেও, তরুণদের ক্ষোভকে স্থানীয় নাগরিক সমস্যার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার একটি নতুন ভাষা তৈরি করেছে।
বাঁকুড়ার তদন্তে যদি রাজনৈতিক যোগসূত্রের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তা হলে একটি প্রত্যন্ত গ্রামের সরকারি স্কুলের বেহাল দশা থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনই পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের সামনে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
আর যদি সেই অভিযোগের প্রমাণ না মেলে, তবুও প্রশ্নটি থেকে যাবে—একটি স্কুলের জল, শৌচাগার বা ভাঙা শ্রেণিকক্ষ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গিয়ে একজন নাগরিকের পরিবারকে কেন এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হল?
সিজেপির আসল রাজনৈতিক শক্তি হয়তো আপাতত সেই প্রশ্নটিতেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



