হাইলাইটস
  • হামলার সঙ্গে মৃত্যুর যোগ অস্বীকার পুলিশের, পরিবারের দাবি—ঘটনাকে লঘু করে দেখানো হচ্ছে
  • আট অভিযুক্ত গ্রেফতার, আরও দু’জন পলাতক; মামলায় খুন ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারা
  • হামলাকারীদের বিজেপি-যোগ নেই বলে দাবি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর
  • ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করে বাবার নামে উন্নত সরকারি স্কুল তৈরির দাবি ছেলে আবদুল হাফিজের

 

শেখ মফিককে ঠিক কী কারণে প্রাণ হারাতে হল—এই প্রশ্ন ঘিরেই এখন পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ার ইন্দাসে ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে রাজনৈতিক সংঘাত। ককরোচ জনতা পার্টির ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযানে অংশ নিয়ে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন মফিকের ছেলে আবদুল হাফিজ। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের বাড়িতে হামলা হয়। দু’দিন পরে হাসপাতালে মফিকের মৃত্যু হয়। পরিবার ও বিরোধীদের অভিযোগ, সেই হামলার জেরেই মৃত্যু। যদিও রাজ্য পুলিশ বলছে, হামলায় মফিকের আঘাত ছিল সামান্য; গুরুতর রক্তচাপের ওঠানামাই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকতে পারে।

জুলাইয়ের শেষ দিকে দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলন থেকে বাড়ি ফেরার পর থেকেই হাফিজ স্থানীয় বিজেপি নেতাদের কাছ থেকে হুমকি পাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ তাঁর মা হাসিনা বেগমের। তাঁর দাবি, ছেলেকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। সেই অভিযোগ সত্য কি না, তার কোনও স্বাধীন প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। তবে পুলিশ যে তাঁদের বাড়িতে হামলার ঘটনাটি অস্বীকার করছে না, সেটিই পরিবার ও আন্দোলনকারীদের প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।

ককরোচ জনতা পার্টির আহ্বানে ১৩ আগস্ট নিজের এলাকার করিসুন্দা পশ্চিমপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন হাফিজ। বিদ্যালয়ের শৌচাগার, পানীয় জল এবং অন্যান্য পরিকাঠামো নিয়ে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। একটি দৃশ্যধারণও করেন। হাফিজের বক্তব্য, প্রধান শিক্ষক কাশীনাথ দে তাঁকে পরদিন আবার আসতে বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর সন্দেহ, বিদ্যালয় থেকেই কেউ স্থানীয় বিজেপি কর্মীদের কাছে তাঁর সফরের খবর পৌঁছে দেয়।

হাফিজের অভিযোগ, ওই দিন রাত সাড়ে আটটা নাগাদ একদল ব্যক্তি বাঁশের লাঠি ও শাবল নিয়ে তাঁদের বাড়িতে ঢোকে। তাঁকে মারধর করা হয়। বাবা-মা ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাঁরাও আক্রান্ত হন। ছেলেকে আড়াল করতে গিয়েই মফিক আঘাত পান বলে পরিবারের দাবি।

পুলিশ অবশ্য সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানিয়েছে, হামলায় মফিকের আঘাত ছিল সামান্য এবং একটি ক্ষতস্থানে মাত্র একটি সেলাই করতে হয়েছিল। ১৫ আগস্ট সকালে রক্তচাপের প্রবল ওঠানামার পরে তিনি নিজেই বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসকেরা তখন কোনও প্রাণঘাতী আঘাত খুঁজে পাননি বলে পুলিশের দাবি। সেই রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। এর পরে ‘নৃশংস মারধরে মৃত্যু’র ভিত্তিহীন দাবি ছড়ানো হয়েছে বলেও অভিযোগ পুলিশের।

এই ব্যাখ্যাতেই অবশ্য মূল প্রশ্নের নিষ্পত্তি হচ্ছে না। হামলা থেকে সরাসরি প্রাণঘাতী আঘাত না-ও হয়ে থাকলে, সেই ঘটনার শারীরিক ও মানসিক অভিঘাত মফিকের রক্তচাপ বা অন্য কোনও রোগকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল কি না, তা চিকিৎসা ও ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ছাড়া নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। একই ভাবে, কেবল ঘটনার সময়গত নৈকট্যের ভিত্তিতে হামলাকেই মৃত্যুর একমাত্র কারণ ঘোষণা করাও যথেষ্ট নয়। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্থির করতে ময়নাতদন্ত, চিকিৎসার নথি এবং ফরেনসিক মতামতই গুরুত্বপূর্ণ।

মফিকের পরিবার অত্যন্ত সাধারণ। করিসুন্দা গ্রামের কাঁচা রাস্তার পাশে তাঁদের অসম্পূর্ণ দু’কামরার বাড়ি। মফিক এক সময় স্থানীয় রুটি তৈরির কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। পরে বিভিন্ন দোকানে কাজ করে ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা এবং বাড়ি তৈরির জন্য অর্থ সঞ্চয় করেছিলেন। হাফিজ এবং তাঁর চেয়ে তিন বছরের ছোট বোন তানিয়া খাতুন—দু’জনেই স্নাতক।

ইন্দাস থানার তদন্তকারী আধিকারিক অয়নচন্দ্র মাহাতো জানিয়েছেন, মফিকের মৃত্যুর পরদিনের মধ্যেই শেখ আজাদ, শ্রীকান্ত মাঝি, রোহিত মাঝি, টিঙ্কু কেরুয়া, সান্টু মাঝি, প্রশান্ত রুইদাস, বাবলু মাঝি ও অষ্টম মাঝিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অবনী মাঝি ও প্রশান্ত মাঝি এখনও পলাতক। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খুন, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, ভয় দেখানো, বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ এবং গুরুতর আঘাত করার মতো একাধিক ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। পুলিশের বিবৃতিতে আঘাতকে ‘সামান্য’ বলা হলেও মামলায় খুনের ধারা যুক্ত হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—তদন্তকারীরা ঠিক কোন তথ্যের ভিত্তিতে কোন অবস্থান নিচ্ছেন?

ককরোচ জনতা পার্টি ও সিপিআইএমের প্রতিনিধিদল পরিবারের সঙ্গে দেখা করে দশ দিনের মধ্যে সব অভিযুক্তকে গ্রেফতার, পরিবারকে নিরাপত্তা এবং ইন্দাস থানার কর্মীদের ভূমিকার আদালত-পর্যবেক্ষিত তদন্ত দাবি করেছে। তাঁদের অভিযোগ, হামলার পরে পুলিশ পরিবারকে যথাযথ সহায়তা করেনি। দাবি পূরণ না হলে জেলা প্রশাসনের দফতর ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার তাঁদের বাড়িতে গিয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য বিজেপির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নাকচ করেছেন। তাঁর দাবি, ঘটনার সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই এবং অভিযুক্তেরা রাজনৈতিক কর্মী নয়, অপরাধী। কিন্তু অভিযুক্তদের রাজনৈতিক পরিচয়, হামলার উদ্দেশ্য এবং বিদ্যালয় পরিদর্শনের সঙ্গে ঘটনার সম্পর্ক—সবই এখন তদন্তের বিষয়।

সরকারের দেওয়া ক্ষতিপূরণ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন হাফিজ। তাঁর দাবি, বাবার নামে একটি উন্নত মানের সরকারি বিদ্যালয় তৈরি করা হোক। বাবার মৃত্যুতে ভেঙে পড়লেও তিনি আন্দোলন থেকে ‘এক ইঞ্চিও’ পিছোবেন না বলে জানিয়েছেন। যন্তর মন্তর থেকে বহু দূরে শুরু হওয়া ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযান তাই এখন আর শুধু বিদ্যালয়ের পরিকাঠামোর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। শেখ মফিকের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত, পুলিশের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদের অধিকার—তিনটিই এই লড়াইয়ের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে।