হরমুজে কি নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ইরান?

যা জানা জরুরি
- মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও আমেরিকার পরস্পরবিরোধী দাবি ক্রমশ তীব্র হচ্ছে।
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, আমেরিকা এই প্রণালীর উপর ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করেছে।
- অন্য দিকে তেহরান বলছে, জলপথটি এখনও ইরানের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য কার্যত বন্ধ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও আমেরিকার পরস্পরবিরোধী দাবি ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, আমেরিকা এই প্রণালীর উপর ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্য দিকে তেহরান বলছে, জলপথটি এখনও ইরানের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য কার্যত বন্ধ। কিন্তু জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলির সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বাস্তব পরিস্থিতি এই দুই দাবির কোনওটির সঙ্গেই পুরোপুরি মিলছে না।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার মাত্র ছ’টি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। আগের দিন সংখ্যাটি ছিল নয়। গত দশ দিনের দৈনিক গড় ১১টি জাহাজ। যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক পরিস্থিতির তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ৯২ শতাংশ কম বলে বিভিন্ন সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার হিসাব।
মেরিনট্র্যাফিক অবশ্য মঙ্গলবার মোট দশটি নিশ্চিত পারাপারের কথা জানিয়েছে—ছ’টি জাহাজ পারস্য উপসাগর থেকে বেরিয়েছে এবং চারটি প্রবেশ করেছে। দুই সংস্থার সংখ্যায় পার্থক্যের কারণ মূলত জাহাজের শ্রেণিবিভাগ। কেপলার প্রধানত তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অন্যান্য পণ্যবাহী জাহাজের হিসাব করেছে। কিন্তু দুই তথ্যসূত্রই একটি বিষয়ে একমত—হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল এখনও ফেরেনি।
ওমানের জলসীমায় সরে যাচ্ছে জাহাজ
পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হল, ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় জাহাজ হরমুজের ওমান-নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণাংশ ব্যবহার করছে। গত দুই সপ্তাহে তরল পণ্যবাহী জাহাজের ৮০ শতাংশের বেশি হয় ওমানের দিক দিয়ে চলেছে, নয়তো অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র বন্ধ রেখে ‘অদৃশ্য’ অবস্থায় প্রণালী পার হয়েছে। কেপলারের ধারণা, এই অদৃশ্য জাহাজগুলির অধিকাংশও ওমানের পথই ব্যবহার করেছে।
জাতিসংঘ অনুমোদিত এই নৌপথ ব্যবহারের বিরোধিতা করে এসেছে ইরান। অথচ এক মাস আগেও ওমানের দিক দিয়ে কার্যত কোনও জাহাজ চলাচল করেনি। কেপলারের অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হোমায়ুন ফালাকশাহির মতে, এই পরিবর্তন থেকে ক্রমশ মনে হচ্ছে, ইরান অন্তত আংশিকভাবে হরমুজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।
ইরান চাইছিল, জাহাজগুলি তার পছন্দের পথ ব্যবহার করুক। সেই পথে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টার অভিযোগও উঠেছিল। কিন্তু বাণিজ্যিক জাহাজ ওমানের দিকে সরে যাওয়ায় সেই ব্যবস্থা কার্যকর করা তেহরানের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর সুরক্ষা এবং টহলও এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ।
তবে তার অর্থ এই নয় যে, আমেরিকা হরমুজকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করে ফেলেছে। ইরান এখনও জাহাজে হামলা চালাতে বা হামলার আশঙ্কা সৃষ্টি করতে সক্ষম। এই আশঙ্কার কারণেই বহু জাহাজ প্রণালী এড়িয়ে চলছে, বিমার খরচ বেড়েছে এবং স্বাভাবিক পণ্য পরিবহণ ফেরেনি। ফলে ট্রাম্পের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের’ দাবিও তথ্যের পরীক্ষায় টেকে না।
নিয়ন্ত্রণ নয়, ভয় সৃষ্টি করাই কি ইরানের লক্ষ্য
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ইরানের উদ্দেশ্য হয়তো প্রতিটি জাহাজকে শারীরিকভাবে আটকানো নয়। বরং এমন অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করা, যাতে জাহাজমালিক, বিমা সংস্থা ও তেল ব্যবসায়ীরা হরমুজে প্রবেশের ঝুঁকি নিতে না চান।
পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা ড্যান পিকারিংয়ের বক্তব্য, ইরানের লক্ষ্য যদি প্রণালীর ‘দায়িত্বে থাকা’ হয়, তবে দেশটি কোনও দিনই পুরো জলপথের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেনি। কিন্তু কোনও জলপথকে বিপজ্জনক করে তোলার ক্ষমতাও এক ধরনের কৌশলগত প্রভাব। সেই দিক থেকে তেহরান এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই নিয়ন্ত্রণের তিনটি আলাদা অর্থ সামনে আসছে। মার্কিন বাহিনী সীমিত সংখ্যক জাহাজকে সুরক্ষা দিয়ে পার করাতে পারছে। ইরান সব জাহাজকে থামাতে না পারলেও চলাচল মারাত্মকভাবে কমিয়ে রাখার মতো ভয় তৈরি করেছে। আর ওমানের জলসীমা কার্যত বিকল্প পথ হিসেবে উঠে এসেছে। অর্থাৎ কোনও একটি দেশ নয়, সামরিক শক্তি, ভূগোল, বাণিজ্যিক ঝুঁকি এবং কূটনীতির সমন্বয়েই জাহাজ চলাচল নির্ধারিত হচ্ছে।
‘অদৃশ্য’ জাহাজ এবং সমুদ্রে তেল স্থানান্তর
কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি হরমুজের উপর নির্ভরতা কমানোর জন্য নতুন ব্যবস্থা নিচ্ছে। তারা অতিকায় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ভাড়া করে পারস্য উপসাগর থেকে তেল বার করছে। পরে ওমান উপসাগরে অন্য জাহাজে সেই তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে।
হামলা এড়াতে কয়েকটি জাহাজ দীর্ঘ সময়ের জন্য স্বয়ংক্রিয় অবস্থান-সংকেত বন্ধ রাখছে। এই ‘অন্ধকার যাত্রা’র ফলে উপগ্রহ ও প্রচলিত অনুসরণ ব্যবস্থায় তাদের গতিবিধি ধরা কঠিন হচ্ছে। তাই প্রকাশিত সংখ্যার তুলনায় প্রকৃত জাহাজ চলাচল কিছুটা বেশি হতে পারে। একই সঙ্গে অবস্থান-সংকেত বন্ধ রাখা সংঘর্ষ, দুর্ঘটনা এবং ভুল লক্ষ্য নির্ধারণের ঝুঁকিও বাড়ায়।
চিনের দু’টি বড় জাহাজ সংস্থা, যারা আগে দেশটির মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা তেলের প্রায় অর্ধেক বহন করত, জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে হরমুজ এবং বাব এল-মান্দেব জলপথ থেকে নিজেদের জাহাজ দূরে রেখেছে। বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
মধ্যস্থতায় ওমান, বাড়ছে ত্রিমুখী সংঘাত
হরমুজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ওমান এখন গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। নিরাপদ জাহাজ চলাচল এবং প্রণালীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে মাস্কাট ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা চলছে। অতীতের সমঝোতায় দুই দেশ নিরাপদ যাত্রাপথ বজায় রাখা এবং নিয়মিত পরামর্শ চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কিন্তু ওমানের এই কূটনৈতিক ভূমিকা ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। ট্রাম্প ওমানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরানকে ঘিরে আমেরিকার পরিকল্পনায় বাধা দেওয়া হলে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ফলে হরমুজ এখন কার্যত ত্রিমুখী টানাপড়েনের কেন্দ্র—ইরান তার প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে, আমেরিকা নৌ-নিরাপত্তার নিয়ামক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, আর ওমান আলোচনার মাধ্যমে চলাচলের একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে।
আমেরিকা ও ইরানের সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ সোমবার শেষ হয়েছে। স্থায়ী সমঝোতা না হওয়ায় নতুন করে হামলা শুরু হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ভারতের উদ্বেগ কোথায়
যুদ্ধের আগে বিশ্বের অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ দিয়ে যেত। ভারতের জন্য এই জলপথ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের আমদানি করা তেল ও গ্যাসের বড় অংশ আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে। চলাচল ব্যাহত হলে শুধু তেলের দামই বাড়ে না; জাহাজভাড়া, যুদ্ধঝুঁকির বিমা এবং সরবরাহের সময়ও বেড়ে যায়।
বুধবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১.৭৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা ৩০ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ। দাম দীর্ঘদিন এই স্তরে থাকলে ভারতের আমদানি ব্যয় ও বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে পারে। পেট্রল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস, পরিবহণ এবং উৎপাদন ব্যয়ের মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধির চাপও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সামগ্রিক তথ্য তাই বলছে, ইরান হরমুজের উপর আগের মতো একচ্ছত্র প্রভাব প্রয়োগ করতে পারছে না। ওমানের পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল এবং মার্কিন পাহারা তার কর্তৃত্বে ফাটল ধরিয়েছে। কিন্তু আমেরিকাও স্বাভাবিক ও নিরাপদ বাণিজ্যিক চলাচল ফিরিয়ে আনতে পারেনি। হরমুজে এখন কারও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই—বরং জলপথটি এমন এক অস্থির ভারসাম্যে রয়েছে, যেখানে কয়েকটি জাহাজ পার হতে পারলেও বিশ্ববাণিজ্যের আস্থা এখনও ফিরছে না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



