চিনের অর্থনীতিতে মন্দার ছায়া

যা জানা জরুরি
- শিল্পোৎপাদন থেকে খুচরো বাজার—দুই ক্ষেত্রেই জুলাইয়ের দুর্বল পরিসংখ্যান চিনের অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী মন্থরতার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
- জুনে শেষ হওয়া ত্রৈমাসিকেই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার নেমে গিয়েছিল দুর্বল স্তরে।
- তার পর জুলাইয়ের পরিসংখ্যান বেজিংয়ের উপর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে করছাড়, সরকারি ব্যয় বাড়ানো এবং নতুন প্রণোদনা ঘোষণার চাপ আরও বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
শিল্পোৎপাদন থেকে খুচরো বাজার—দুই ক্ষেত্রেই জুলাইয়ের দুর্বল পরিসংখ্যান চিনের অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী মন্থরতার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জুনে শেষ হওয়া ত্রৈমাসিকেই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার নেমে গিয়েছিল দুর্বল স্তরে। তার পর জুলাইয়ের পরিসংখ্যান বেজিংয়ের উপর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে করছাড়, সরকারি ব্যয় বাড়ানো এবং নতুন প্রণোদনা ঘোষণার চাপ আরও বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
চিনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে শিল্পোৎপাদন এক বছর আগের তুলনায় বেড়েছে ৪.৫ শতাংশ। জুনে এই বৃদ্ধির হার ছিল ৫.৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল ৪.৮ শতাংশ বৃদ্ধির। অর্থাৎ বাস্তব ফল শুধু আগের মাসের তুলনায় কম নয়, বাজারের প্রত্যাশাকেও ছাপিয়ে যেতে পারেনি।
আরও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে খুচরো বিক্রি। জুলাইয়ে তা বেড়েছে মাত্র ০.৬ শতাংশ, যেখানে জুনে বৃদ্ধির হার ছিল ১ শতাংশ। অর্থনীতিবিদেরা জুলাইয়ে ১.৫ শতাংশ বৃদ্ধির আশা করেছিলেন। গ্রীষ্মের ছুটিতে পর্যটন ও ভ্রমণে খরচ বাড়লেও তার প্রভাব সামগ্রিক খুচরো বাজারে বিশেষ পড়েনি।
সমস্যা শুধু আবহাওয়ায় নয়
চিনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো দুর্বল পরিসংখ্যানের জন্য প্রবল গরম, ভারী বৃষ্টি এবং প্রতিকূল আবহাওয়াকে দায়ী করেছে। এর ফলে উৎপাদন ও সরবরাহ যেমন ব্যাহত হয়েছে, তেমনই বাজারের চাহিদাতেও প্রভাব পড়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, সমস্যার শিকড় আরও গভীরে। চিনের আবাসন বাজারের দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কট, মানুষের খরচ করার অনীহা, যুব বেকারত্ব এবং বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা দীর্ঘদিন ধরেই অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে চাপে রেখেছে।
অর্থাৎ সাময়িক আবহাওয়ার ধাক্কা পরিস্থিতিকে খারাপ করলেও, অর্থনীতির দুর্বলতার পুরো ছবি দিয়ে তা ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না।
অভ্যন্তরীণ চাহিদাই বড় চিন্তা
চিনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং সোমবার নিজেই স্বীকার করেছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ঘাটতি এখনও প্রকট। বেশ কিছু শিল্প ও প্রতিষ্ঠান ক্রমশ সমস্যার মুখে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিবেশও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে দেশীয় বাজারের দুর্বলতা পুষিয়ে নিতে বিদেশে চিনা পণ্যের চাহিদা ধরে রাখার উপর জোর দিয়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং আরও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যের পক্ষেও সওয়াল করেছেন লি।
কিন্তু রপ্তানির উপর নির্ভর করে অর্থনীতিকে টেনে তোলার পথও খুব মসৃণ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চিনা পণ্যের বিরুদ্ধে সুরক্ষামূলক শুল্ক ও অন্যান্য বাণিজ্যিক বাধা বাড়াচ্ছে। ফলে দেশের মানুষের আয়, ব্যয়ক্ষমতা এবং অর্থনীতির উপর আস্থা না বাড়লে শুধু রপ্তানি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
প্রযুক্তিতে কিছুটা আশার আলো
সব ছবি অবশ্য অন্ধকার নয়। কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, কৃত্রিম মেধা-নির্ভর প্রযুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোয় বাড়তে থাকা বিনিয়োগ উৎপাদন ক্ষেত্রকে কিছুটা গতি দিচ্ছে।
আবহাওয়ার ধাক্কা কেটে গেলে এবং বেজিং সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিতে নতুন করে চাহিদা তৈরি করতে পারলে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বৃদ্ধির হার সামান্য ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
তবে তার জন্য শুধু শিল্পোৎপাদন বাড়লেই চলবে না। চিনের সাধারণ মানুষকে আবার খরচ করতে উৎসাহিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জুনে শেষ হওয়া ত্রৈমাসিকে চিনের বার্ষিকীকৃত বৃদ্ধির হার ছিল ৪.৩ শতাংশ—সরকারের ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার নীচে। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে জিডিপির হিসাব প্রকাশ শুরু হওয়ার পর থেকে এটি অন্যতম দুর্বল ফল।
জুলাইয়ের শিল্প ও খুচরো বাজারের হতাশাজনক পরিসংখ্যান তাই শুধু একটি খারাপ মাসের ছবি নয়। বরং তা প্রশ্ন তুলছে—চিনের অর্থনৈতিক মন্থরতা কি সাময়িক ধাক্কা, নাকি দীর্ঘ মন্দার শুরু?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



