হাসিনার প্রত্যর্পণ আদালতের হাতে, কূটনৈতিক সমাধানের খোঁজে দিল্লি-ঢাকা

যা জানা জরুরি
- বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঢাকার হাতে তুলে দেওয়া হবে কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক স্তরে নয়—ভারতের আদালতেই হবে।
- তবে প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়াকে ভারত ও বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক আলোচনার বাইরে রেখেও দেখা যাচ্ছে না।
- নয়াদিল্লি চাইছে, বিষয়টি আদালতে গড়ানোর আগেই আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি পথ খুঁজে বার করতে, যাতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও রক্ষা পায়, আবার ভারতের আইনি বাধ্যবাধকতাও অগ্রাহ্য…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঢাকার হাতে তুলে দেওয়া হবে কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক স্তরে নয়—ভারতের আদালতেই হবে। তবে প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়াকে ভারত ও বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক আলোচনার বাইরে রেখেও দেখা যাচ্ছে না। নয়াদিল্লি চাইছে, বিষয়টি আদালতে গড়ানোর আগেই আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি পথ খুঁজে বার করতে, যাতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও রক্ষা পায়, আবার ভারতের আইনি বাধ্যবাধকতাও অগ্রাহ্য না হয়।
ভারত সরকারের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, প্রত্যর্পণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আদালতের। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে সমস্ত অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলি ভারতীয় আইনেও অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত কি না, আদালতের বিচার্য বিষয়ের মধ্যে সেটিই হবে অন্যতম প্রধান প্রশ্ন। অর্থাৎ, ঢাকার কোনও আদালতের রায় বা প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক আবেদনই শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। ভারতীয় আদালতকে প্রথমে দেখতে হবে, আবেদনটি ২০১৩ সালের ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং ভারতের প্রত্যর্পণ আইন, ১৯৬২-এর শর্ত পূরণ করছে কি না।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে রয়েছেন। গত দু’বছর ধরে নয়াদিল্লির একটি অজ্ঞাত ও নিরাপদ স্থানে তাঁকে আশ্রয় ও সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এই সময়ে তিনি প্রকাশ্যে খুব কমই এসেছেন। তবে বাংলাদেশের নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামি লীগের বর্তমান ও প্রাক্তন সাংসদদের দাবি, হাসিনা নিয়মিত দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। কখনও সরাসরি বৈঠক করছেন, কখনও দূর থেকে দলীয় পরিস্থিতির খোঁজখবর নিচ্ছেন। অবসর সময়ে তাঁর টেবিল টেনিস খেলার কথাও জানিয়েছেন দলের কয়েক জন নেতা।
গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে একটি ভার্চুয়াল সাংবাদিক বৈঠকে শেখ হাসিনা জানান, তিনি দেশে ফিরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কবে বাংলাদেশে ফিরতে চান—এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের মাস, তাই সেই মাসেই দেশে ফিরতে চান। ৭৮ বছর বয়সি নেত্রীর এই ঘোষণার ফলে প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। কারণ, তিনি যদি স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরে যান, তা হলে তাঁকে প্রত্যর্পণ করার আইনি প্রশ্নই আর উঠবে না।
কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। বাংলাদেশে হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। তাঁর দল আওয়ামি লীগও নিষিদ্ধ। ফলে দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেফতার এবং দণ্ড কার্যকরের আশঙ্কার মুখোমুখি হতে হবে। অন্য দিকে, তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। তাই হাসিনার ডিসেম্বর-ঘোষণাকে নিছক রাজনৈতিক বার্তা, নাকি সত্যিই দেশে ফেরার পরিকল্পনা—তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমানের সরকার হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’ দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। সেই রায়কেই প্রত্যর্পণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে ঢাকা। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া মেনেই আবেদনটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। বিদেশ মন্ত্রকের আধিকারিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তিতে নির্ধারিত প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্র বাংলাদেশের আবেদনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
তবে হাসিনার শিবির ওই বিচার এবং রায়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আওয়ামি লীগের নেতাদের বক্তব্য, ভারতের আদালতে প্রত্যর্পণ-শুনানি শুরু হলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কে একাধিক ভিত্তিতে চ্যালেঞ্জ করা হবে। তাঁদের অন্যতম যুক্তি হতে পারে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচারটি হয়েছিল এবং সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে ছিল না। হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে উৎসারিত কি না, সেই প্রশ্নও তাঁর আইনজীবীরা তুলতে পারেন।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি যদি একটি দেশে অপরাধে অভিযুক্ত, দোষী সাব্যস্ত অথবা আদালতের ঘোষিত সাজা কার্যকরের জন্য ফেরার হন, তা হলে অন্য দেশের তাঁকে ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই সঙ্গে চুক্তিতে বলা হয়েছে, প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দেশের বিচারিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিবেচিত হবে।
চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণের আবেদন নাকচ করা যেতে পারে। কিন্তু এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম। খুন, অনিচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড, গুরুতর আঘাত, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এবং হত্যায় প্ররোচনা-সহ ১২ ধরনের অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ বলে গণ্য করা যাবে না। ফলে শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলেই হাসিনার পক্ষ প্রত্যর্পণ ঠেকাতে পারবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। আদালতকে অভিযোগের প্রকৃতি, তথ্যপ্রমাণ এবং বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া—সব দিকই খতিয়ে দেখতে হবে।
ভারতের প্রত্যর্পণ আইন, ১৯৬২ অনুসারে, বিদেশ মন্ত্রকের কনস্যুলার, পাসপোর্ট ও ভিসা বিভাগ প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রধান সমন্বয়কারী দফতর। কোনও বিদেশি সরকারের আবেদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যর্পণ চুক্তি পরীক্ষা করার পর কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজন মনে করলে এক জন তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে পারে। সেই ম্যাজিস্ট্রেট আবেদনকারী দেশ যে প্রাথমিক প্রমাণ দিয়েছে, তার ভিত্তিতে প্রত্যর্পণের উপযুক্ত মামলা তৈরি হয়েছে কি না, তা বিচার করবেন।
ম্যাজিস্ট্রেট যদি মনে করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট দেশের হাতে তুলে দেওয়ার মতো প্রাথমিক ভিত্তি রয়েছে, তা হলে তিনি প্রত্যর্পণের সুপারিশ করতে পারেন। বিপরীতে, বিদেশি রাষ্ট্রের আবেদন সমর্থন করার মতো প্রাথমিক মামলা তৈরি হয়নি বলে মনে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ওই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। ফলে প্রত্যর্পণের আবেদন গ্রহণ করা এবং প্রত্যর্পণ কার্যকর হওয়ার মধ্যে দীর্ঘ আইনি পথ রয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটের অনুসন্ধানের পরও উচ্চতর আদালতে আবেদন ও পাল্টা আবেদন হতে পারে।
এই আইনি কাঠামোর পাশাপাশি ভারতের সামনে রয়েছে সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার পরীক্ষা। শেখ হাসিনাকে দীর্ঘদিন ধরে দিল্লি বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে দেখেছে। তাঁর শাসনকালে নিরাপত্তা, সীমান্ত, যোগাযোগ এবং বাণিজ্য-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা গভীর হয়েছিল। তাঁকে দ্রুত ঢাকার হাতে তুলে দিলে ভারতের পুরনো সহযোগীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে। আবার প্রত্যর্পণের আবেদন অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখলে তারিক রহমানের সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা ব্যাহত হতে পারে।
সরকারি সূত্রের বক্তব্য, এই কারণেই প্রত্যর্পণের প্রশ্নকে বর্তমান দিল্লি-ঢাকা কূটনৈতিক কথোপকথন থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। আদালত আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে ঠিকই, কিন্তু নয়াদিল্লি চাইবে ঢাকা যেন শুরু থেকেই সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে অনড় না থাকে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার নিশ্চয়তা, বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা এবং হাসিনার নিরাপত্তা—সম্ভাব্য আলোচনায় এই বিষয়গুলি উঠে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ এখন তিনটি সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে। তিনি নিজের ঘোষণা অনুযায়ী ডিসেম্বরে স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরতে পারেন; ভারতীয় আদালতে দীর্ঘ প্রত্যর্পণ মামলা শুরু হতে পারে; অথবা দিল্লি ও ঢাকা আলোচনার মাধ্যমে কোনও মধ্যপন্থা খুঁজে নিতে পারে। আপাতত নিশ্চিত শুধু এটুকুই—রাজনৈতিক চাপ যত প্রবলই হোক, হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার পথ সরাসরি নয়। সেই পথ যাবে ভারতীয় আদালত, প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং দুই প্রতিবেশী দেশের জটিল কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিতর দিয়ে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



