সংস্কৃতি ও বিনোদন

প্রথম ‘হ্যাঁ’-তেই ফাঁদ!

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বলিউডের ক্ষমতাসীনদের প্রতি আনুগত্য কিংবা রাজনৈতিক প্রশ্নে নীরবতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়।
  • কিন্তু চলচ্চিত্র পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপের মতে, এই আপস সাধারণত কোনও বড় সিদ্ধান্ত দিয়ে শুরু হয় না।
  • একবার সেই সম্মতির দরজা খুলে গেলে তা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বলিউডের ক্ষমতাসীনদের প্রতি আনুগত্য কিংবা রাজনৈতিক প্রশ্নে নীরবতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু চলচ্চিত্র পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপের মতে, এই আপস সাধারণত কোনও বড় সিদ্ধান্ত দিয়ে শুরু হয় না। শুরু হয় ছোট্ট একটি ‘হ্যাঁ’ দিয়ে। একবার সেই সম্মতির দরজা খুলে গেলে তা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ ক্ষমতার সঙ্গে আপসের বিনিময়ে আসে সুযোগ, সুবিধা, নিরাপত্তা ও প্রভাব। আর সেই সুবিধা গ্রহণের পরেই তৈরি হয় বেরিয়ে আসার অদৃশ্য বাধা।

সম্প্রতি সাংবাদিক জেনিস সিকেইরার সঙ্গে কথোপকথনে অনুরাগ বলেন, চলচ্চিত্রজগতের মানুষ সব সময় স্বেচ্ছায় ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করেন—এমনটা তিনি মনে করেন না। কিন্তু একবার নতি স্বীকার করলে তা ধীরে ধীরে স্থায়ী বন্দোবস্তে পরিণত হয়।

তাঁর কথায়, প্রথমবার দরজা খুলে দেওয়ার পর সেটি আর সহজে বন্ধ করা যায় না। একাধিক বিষয়ে একবার সম্মতি জানানোর সঙ্গে যখন নানা সুবিধা জুড়ে যায়, তখন সেই সুবিধা ছেড়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

অনুরাগের এই বক্তব্যে বলিউডের আপসের একটি পরিচিত চক্রের ছবি ফুটে ওঠে। ক্ষমতাবানদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া, সরকারি প্রচারে অংশ নেওয়া, রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক মন্তব্য করা কিংবা স্পর্শকাতর বিষয়ে নীরব থাকা—শুরুতে এগুলি আলাদা আলাদা সিদ্ধান্ত বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু এর বিনিময়ে যদি চলচ্চিত্র নির্মাণে সুবিধা, প্রশাসনিক সহায়তা, সম্মান, করছাড় কিংবা পেশাগত নিরাপত্তা আসে, তা হলে সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা আরও কঠিন হয়ে যায়।

অর্থাৎ, একটি আপসই তৈরি করে পরবর্তী আপসের রাস্তা।

দক্ষিণে আপসের চাপ কম কেন?

বলিউডের তুলনায় দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্রজগৎ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে স্বতন্ত্র কেন, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন অনুরাগ। তাঁর মতে, দক্ষিণের চলচ্চিত্রশিল্পগুলি নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক পরিচয়ের শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। ফলে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক বিভাজনের পরিচিত ছক সেখানে একইভাবে প্রয়োগ করা যায় না।

অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ক্ষমতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিন্দিভাষী বিপুল জনসমষ্টি। তাই হিন্দি দর্শকের বাজারে প্রভাব বিস্তার করতে চান এমন শিল্পীদের উপর আপসের চাপও বেশি বলে মনে করেন অনুরাগ।

তাঁর বক্তব্য, “যাঁরা হিন্দি দর্শকের মধ্যে জায়গা করে নিতে চান, মূলত তাঁরাই আপস করেন। অন্যেরা নন। দক্ষিণের শিল্পীরা হিন্দির উপর নির্ভরশীল নন বলেই তাঁদের আপস করতে হয় না।”

তবে এর অর্থ দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্রশিল্প সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত বা ক্ষমতার প্রভাবের বাইরে—এমন দাবি অনুরাগ করেননি। বরং তিনি জোর দিয়েছেন নির্ভরতার পার্থক্যের উপর।

তামিল, তেলুগু, মালয়ালম বা কন্নড় চলচ্চিত্রের নিজস্ব বড় দর্শকসমাজ রয়েছে। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের সম্পর্কও গভীর। ফলে সর্বভারতীয় হিন্দি বাজারে প্রবেশ না করেও তারা ব্যবসায়িকভাবে টিকে থাকতে পারে। বলিউডের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতা, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং বৃহৎ বাজারের সম্পর্ক অনেক বেশি সরাসরি।

সবাই বোঝেন, তবু চুপ

চলচ্চিত্রজগতের মানুষ নিজেদের আপস সম্পর্কে কিছুই বোঝেন না—এই ধারণাও মানতে নারাজ অনুরাগ। তাঁর দাবি, তাঁরা সবই বোঝেন। কেউ অস্বস্তি বোধ করেন, কেউ লজ্জিত হন, কেউ হয়তো অনুশোচনাও করেন। কিন্তু একবার সুবিধার জালে জড়িয়ে পড়লে ব্যক্তিগতভাবে অবস্থান বদলানোর ক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়।

ফলে উপর থেকে নির্দিষ্ট অনুরোধ বা নির্দেশ না এলে সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক কোনও বিষয়ে নিজের উদ্যোগে মুখ খোলার প্রবণতাও কমে যায়।

অনুরাগের ভাষায়, তাঁরা ‘জেগে’ আছেন, সবকিছু বুঝতেও পারেন। কিন্তু পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, বুঝলেও কিছু করার অবস্থায় থাকেন না।

কেন বারবার প্রশ্ন তোলেন অনুরাগ?

স্পষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক মতামতের জন্য অনুরাগ কাশ্যপ দীর্ঘদিন ধরেই বলিউডে ব্যতিক্রমী। সম্প্রতি শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে চলা সিজেপি আন্দোলনের পক্ষেও তিনি সরব হয়েছিলেন। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের ব্যবস্থার সমালোচনা করে সমাজমাধ্যমে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—পুলিশের পোশাক পরলেই কি নিজের আত্মা ও বিবেক বিসর্জন দিতে হয়?

তাঁর প্রশ্ন ছিল, কোনও পুলিশকর্মী কি ভুল নির্দেশের বিরোধিতা করে বলতে পারেন—এই আদেশ অন্যায়, তাই আমি তা মানব না?

এই বক্তব্যেও তাঁর ক্ষমতাবিরোধী অবস্থানের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট।

বলিউড নিয়ে অনুরাগের পর্যবেক্ষণ তাই শুধু সহকর্মীদের নৈতিক বিচার নয়। বরং তাঁর ব্যাখ্যায় উঠে আসে ক্ষমতার আরও সূক্ষ্ম কৌশল—কীভাবে সুবিধা দিয়ে সম্মতি আদায় করা হয়, সেই সম্মতি থেকে আনুগত্য তৈরি হয়, আর একসময় সেই আনুগত্যই বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়।

এখানে ভয় যেমন কাজ করে, তেমনই কাজ করে সুবিধার আকর্ষণ। ফলে আপসের দায় শুধু ক্ষমতার নয়; যে ব্যক্তি সেই সুবিধা গ্রহণ করেন, তাঁরও দায় থেকে যায়।

ববি দেওল অভিনীত ‘বন্দর’ ছবির পরিচালক হিসেবে সম্প্রতি কাজ করেছেন অনুরাগ। তবে ছবির বাইরেও তাঁর মন্তব্য বারবার চলচ্চিত্রজগতের অস্বস্তিকর বাস্তবকে সামনে নিয়ে আসে।

তাঁর বক্তব্যের সারকথা যেন একটাই—ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ সাধারণত বড় কোনও ঘোষণায় শুরু হয় না। শুরু হয় একটি ছোট্ট ‘হ্যাঁ’ দিয়ে। আর কখনও কখনও সেই প্রথম ‘হ্যাঁ’-এর দাম এতটাই বেশি হয় যে, পরে নিজের মুখে ‘না’ বলার স্বাধীনতাটুকুও আর থাকে না।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles