‘গণতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখা সম্মিলিত দায়িত্ব’, শিবসেনার প্রতীক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: উদ্ধব ঠাকরে গোষ্ঠীর হয়ে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন কপিল সিবাল।
- তাঁর দাবি, দলত্যাগ ও বিধায়কদের অযোগ্যতা নির্ধারণে সংসদ বা স্পিকারের কাছ থেকে কার্যকর সমাধান আশা করা কঠিন।
- আদালতের পাল্টা বক্তব্য, গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব শুধু বিচার বিভাগের নয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: উদ্ধব ঠাকরে গোষ্ঠীর হয়ে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন কপিল সিবাল। তাঁর দাবি, দলত্যাগ ও বিধায়কদের অযোগ্যতা নির্ধারণে সংসদ বা স্পিকারের কাছ থেকে কার্যকর সমাধান আশা করা কঠিন। আদালতের পাল্টা বক্তব্য, গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব শুধু বিচার বিভাগের নয়। মামলার পরবর্তী শুনানি ১৮ অগস্ট।
দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে সচল এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ রাখার দায়িত্ব কেবল বিচার বিভাগের নয়, এটি সব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত দায়িত্ব—শিবসেনার নাম ও নির্বাচনী প্রতীক সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এমনই মন্তব্য করল সুপ্রিম কোর্ট। উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর হয়ে প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিবাল দাবি করেছিলেন, রাজনৈতিক দলত্যাগ এবং বিধায়কদের অযোগ্যতার প্রশ্নে সংসদ ও স্পিকারদের ভূমিকা যে ভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে উঠেছে, তাতে গণতন্ত্র রক্ষার শেষ দায়িত্ব আদালতের উপরেই এসে পড়েছে। তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হয়নি প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে মামলাটির শুনানি চলছে। নির্বাচন কমিশন একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে ‘প্রকৃত শিবসেনা’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। দলের ঐতিহ্যবাহী ‘ধনুক-তীর’ প্রতীকও শিন্ডে গোষ্ঠীকে দেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে উদ্ধব ঠাকরে শিবির।
শুনানিতে সিবাল বলেন, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বিধায়কদের অযোগ্যতা সংক্রান্ত আবেদন নিয়ে স্পিকারদের ভূমিকা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন দল যে-ই হোক, দলত্যাগী বিধায়কদের বিরুদ্ধে আবেদন সময়মতো নিষ্পত্তি করা হয় না। রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী সেই আবেদন মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ফেলে রাখা হয়। তাঁর কথায়, গত ২০, ৩০ কিংবা ৪০ বছর ধরে প্রায় সব রাজনৈতিক দলই একই আচরণ করেছে।
সিবাল বেঞ্চকে বলেন, স্পিকারদের কী ভাবে কাজ করা উচিত, সেই বিষয়ে স্পষ্ট আইন নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এখন সুপ্রিম কোর্টের সামনে এসেছে। সংবিধান যে নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত, তা সত্যিই মেনে চলতে হলে বর্তমান ব্যবস্থার সংশোধন প্রয়োজন। দলত্যাগের পরেও জনপ্রতিনিধিরা পদে থেকে যাচ্ছেন এবং সরকার পরিচালনায় ভূমিকা নিচ্ছেন—এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
বেঞ্চ অবশ্য এই ধারণা মানতে চায়নি যে, কেবল বিচার বিভাগই পরিস্থিতির সংশোধন করতে পারে। প্রধান বিচারপতি বলেন, সংসদও চাইলে আইন প্রণয়ন করে সমাধানের পথ বার করতে পারে। এর উত্তরে সিবাল দাবি করেন, সংসদে যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারা সাধারণত বর্তমান ব্যবস্থার সুবিধা পায়। ফলে কোনও ক্ষমতাসীন দলই এমন পরিবর্তন আনতে আগ্রহী হবে না। তাই গণতন্ত্রকে জীবিত রাখার চূড়ান্ত দায়িত্ব আদালতের উপরেই বর্তায়।
এই পর্যায়ে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, গণতন্ত্র রক্ষা করা “সম্মিলিত দায়িত্ব”। প্রধান বিচারপতিও জানান, দেশের অন্য সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির অঙ্গীকারকে খাটো করে দেখা উচিত নয়। সিবাল অবশ্য বলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানগুলির গুরুত্ব অস্বীকার করছেন না। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেগুলি যে ভাবে কাজ করেছে, তা সকলের কাছেই গভীর উদ্বেগের বিষয়। সংসদ আইন পাশ করতে পারে, কিন্তু সেই আইনের সাংবিধানিকতা ও প্রয়োগের প্রকৃত পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত আদালতেই হয়।
শুনানিতে নির্বাচন প্রতীক (সংরক্ষণ ও বরাদ্দ) আদেশ, ১৯৬৮-এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সিবাল। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনও স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিভাজন দেখা দিলে কোন গোষ্ঠী প্রকৃত দলের প্রতিনিধিত্ব করছে, তা কমিশন নির্ধারণ করতে পারে।
সিবালের বক্তব্য, কমিশনের কাছে আবেদন জমা পড়ার দিন কোনও গোষ্ঠীর পক্ষে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক বা আইনসভার সমর্থন না থাকলে, পরবর্তী ঘটনাবলিকে ভিত্তি করে তাদের দলের নাম ও প্রতীক দেওয়া বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে। আবেদন দায়েরের পরে বিধায়ক বা সাংসদদের অবস্থান বদল, ক্ষমতার সমীকরণ কিংবা অন্য কোনও ঘটনাকে ব্যবহার করে দাবিদার গোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা আইনসম্মত হতে পারে না। অধিকার নির্ধারিত হওয়া উচিত আবেদন জমা পড়ার সময়কার বাস্তবতা ও প্রমাণের ভিত্তিতে।
২০২২ সালে শিবসেনার মধ্যে বিদ্রোহের পরে একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে দলের অধিকাংশ বিধায়ক উদ্ধব ঠাকরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। মহারাষ্ট্রে উদ্ধব সরকারের পতন ঘটে এবং বিজেপির সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী হন শিন্ডে। পরে নির্বাচন কমিশন সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরীক্ষা-সহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে শিন্ডে শিবিরকে প্রকৃত শিবসেনা বলে স্বীকৃতি দেয়। উদ্ধব গোষ্ঠীর অভিযোগ, এই সিদ্ধান্ত দলীয় সংগঠনের কাঠামো এবং দলত্যাগ-বিরোধী আইনের মৌলিক উদ্দেশ্যকে উপেক্ষা করেছে।
মামলাটি শুধু শিবসেনার নাম বা ‘ধনুক-তীর’ প্রতীকের মালিকানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দলীয় বিভাজন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দলত্যাগ, স্পিকারের নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা—সব ক’টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এর সঙ্গে যুক্ত। সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানি আগামী ১৮ অগস্টও চলবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



