International

টোপ বিমান, সাঁজোয়া ট্রেন—নেতাদের নিরাপত্তার গোপন খেলা

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনেতাদের বিদেশ সফর বাইরে থেকে যতটা স্বাভাবিক দেখায়, নেপথ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ততটাই জটিল।
  • তাঁদের প্রতিটি যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একাধিক বিকল্প পথ, ছদ্ম গতিপথ, গোপন যোগাযোগ, ডামি বিমান এবং জরুরি মুহূর্তে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা।
  • কখনও একই রকম দেখতে একাধিক বিমান আকাশে ওড়ে, কখনও রাষ্ট্রনেতাকে আচমকাই অন্য বিমানে সরিয়ে দেওয়া হয়।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনেতাদের বিদেশ সফর বাইরে থেকে যতটা স্বাভাবিক দেখায়, নেপথ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ততটাই জটিল। তাঁদের প্রতিটি যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একাধিক বিকল্প পথ, ছদ্ম গতিপথ, গোপন যোগাযোগ, ডামি বিমান এবং জরুরি মুহূর্তে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা। কখনও একই রকম দেখতে একাধিক বিমান আকাশে ওড়ে, কখনও রাষ্ট্রনেতাকে আচমকাই অন্য বিমানে সরিয়ে দেওয়া হয়। আবার উত্তর কোরিয়ার কিম জং-উনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা একটি সাঁজোয়া ট্রেনবহর।

সম্প্রতি তুরস্কে সম্ভাব্য ইরানি হামলার আশঙ্কায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গোপনে বিমান বদল করানোর ঘটনাই তার সাম্প্রতিক উদাহরণ। আঙ্কারায় নেটো সম্মেলন শেষে ট্রাম্পকে প্রথমে পুরনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ ওঠার কথা ছিল। কিন্তু পরে খাবার সরবরাহের একটি গাড়ির আড়ালে তাঁকে অন্য একটি সামরিক বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়। এদিকে এয়ার ফোর্স ওয়ান প্রেসিডেন্টকে ছাড়াই আলাদা পথে উড়ে যায়—এক অর্থে সম্ভাব্য নজরদারদের জন্য সেটিই হয়ে ওঠে ‘টোপ’।

পরে ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের আবহে বিশ্বাসযোগ্য হুমকির খবর পাওয়ার পর নিরাপত্তা ও সামরিক কর্তারা তাঁকে বিমান বদলানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে হুমকির বিস্তারিত জানতে তিনি আগ্রহী ছিলেন না বলেও জানান। তাঁর বক্তব্য, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি নিয়মিতই নানা ধরনের হুমকি পেয়ে থাকেন।

তবে রাষ্ট্রনেতার নিরাপত্তা আসলে বিমান আকাশে ওঠার অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়। সফরের গন্তব্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাসবাদ, অপরাধ, স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিমানবন্দর, হোটেল, সড়কপথ এবং সম্ভাব্য হামলার জায়গা—সবকিছুর আগাম মূল্যায়ন করা হয়। বিদেশ সফরে সাধারণত দুটি সমান্তরাল নিরাপত্তাব্যবস্থা কাজ করে। একদিকে থাকে রাষ্ট্রনেতার নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থা, অন্যদিকে আয়োজক দেশের পুলিশ, সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলি।

আকাশেই যেন ছোট্ট এক দেশ

মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বিমান শুধু পরিবহণের মাধ্যম নয়; কার্যত এটি একটি উড়ন্ত কমান্ড সেন্টার। বিমানে রয়েছে প্রেসিডেন্টের দফতর, ব্যক্তিগত থাকার জায়গা, কর্মীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা এবং সুরক্ষিত যোগাযোগব্যবস্থা। প্রায় ৮৫টি টেলিফোনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট আকাশে থেকেও প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেন। জরুরি পরিস্থিতিতে সেখান থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

নিরাপত্তার জন্য বিকল্প বিমানও প্রস্তুত রাখা হয়। কখনও সেটি অন্য পথে উড়ে, কখনও অন্য বিমানবন্দরে অবস্থান করে। মূল লক্ষ্য দুটি—প্রয়োজনে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা এবং প্রেসিডেন্ট ঠিক কোন বিমানে রয়েছেন, তা নিয়ে সম্ভাব্য হামলাকারী বা নজরদারদের বিভ্রান্ত করা।

আঙ্কারায় ট্রাম্পকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি অবশ্য কিছুটা আলাদা। কারণ তাঁর অবস্থান শুধু সাধারণ মানুষের কাছেই নয়, সফরসঙ্গী কর্মী এবং সাংবাদিকদের একটি অংশের কাছ থেকেও গোপন রাখা হয়েছিল। সাধারণত প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী সাংবাদিকেরা তাঁর গতিবিধি স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ পান। এ ক্ষেত্রে তাঁরা এয়ার ফোর্স ওয়ানেই থেকে যান, অথচ প্রেসিডেন্ট তখন অন্য বিমানে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ গ্যারেট গ্রাফের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের গোপন সফর নতুন ঘটনা নয়। তবে প্রেসিডেন্টের বিমানবদলের তথ্য এত দিন ধরে গোপন থাকার ঘটনা অত্যন্ত বিরল।

ছলনার নজির আগেও রয়েছে

মার্কিন প্রেসিডেন্টদের নিরাপত্তায় বিভ্রান্তিমূলক কৌশলের ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০২৩ সালে জো বাইডেন গোপনে ট্রেনে চেপে কিয়েভ পৌঁছেছিলেন। ২০০০ সালে ভারত সফরের পর পাকিস্তানে যাওয়ার সময় বিল ক্লিন্টনের জন্য ডামি বিমানের কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ২০১৯ সালে আফগানিস্তানে ট্রাম্পের গোপন সফরেও তাঁর গতিপথ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছিল।

অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট কোথায় যাচ্ছেন—তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, বাইরের দুনিয়া তাঁকে কোথায় যাচ্ছেন বলে মনে করছে।

‘উড়ন্ত ক্রেমলিন’ পুতিনের

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারি বিমানকে প্রায়ই ‘উড়ন্ত ক্রেমলিন’ বলা হয়। পরিবর্তিত ইলিউশিন আইএল-৯৬-৩০০পিইউ বিমানটি শুধু পুতিনকে বহন করে না, আকাশে থেকেও তাঁকে রাশিয়ার সরকারি, সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সুরক্ষিত যোগাযোগের সুযোগ দেয়। বিমানে চিকিৎসার জন্য আলাদা কক্ষও রয়েছে।

এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশই গোপন। আন্তর্জাতিক সফরের সময় একই ধরনের দেখতে একাধিক বিমান প্রস্তুত রাখার ব্যবস্থাও করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ফলে বাইরে থেকে শুধু বিমান দেখে বোঝা কঠিন—পুতিন আসলে কোনটিতে রয়েছেন।

কিমের ভরসা বিমান নয়, ট্রেন

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের পছন্দ আবার একেবারেই অন্যরকম। বিমানের বদলে তিনি বহুবার সাঁজোয়া ট্রেনে দীর্ঘ সফর করেছেন। তাঁর বিশেষ ট্রেনটি কার্যত একটি চলমান দফতর ও বাসভবন। এতে বুলেটপ্রতিরোধী গাড়িও বহন করা যায়।

কিমের সফরে সাধারণত তিনটি ট্রেন ব্যবহারের কথা জানা যায়। প্রথম ট্রেনটি আগে গিয়ে রেললাইন ও নিরাপত্তা পরীক্ষা করে। মাঝের ট্রেনে থাকেন কিম ও তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা। আর পিছনের ট্রেনে থাকে অতিরিক্ত নিরাপত্তারক্ষী, চিকিৎসক এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

সফরের আগে সংশ্লিষ্ট রুটে সাধারণ ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা, সেতু-সুড়ঙ্গ-স্টেশন পরীক্ষা করা এবং পুরো পথকে নিরাপত্তার আওতায় আনার মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।

ভারতের নিরাপত্তায় বহুস্তরীয় ব্যবস্থা

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপ বা এসপিজি। দেশীয় সফরে সম্ভাব্য হুমকি, স্থানীয় পরিস্থিতি, জনসমাগম এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের গতিবিধি নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আয়োজক দেশের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে তথ্য আদানপ্রদান, নিরাপদ যোগাযোগ এবং সফরের বিভিন্ন ধাপের নিরাপত্তা পরিকল্পনা আগে থেকেই তৈরি করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর সরকারি দূরপাল্লার বিমানেও সুরক্ষিত যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।

সব মিলিয়ে রাষ্ট্রনেতাদের নিরাপত্তা আসলে বন্দুকধারী দেহরক্ষী বা কড়া ব্যারিকেডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আসল খেলা চলে তার অনেক আড়ালে—একাধিক বিকল্প, গোপন রুট, ডামি যান এবং প্রয়োজন হলে গোটা দুনিয়ার চোখের সামনে একটি বিশ্বাসযোগ্য ‘মায়া’ তৈরি করে।

কারণ রাষ্ট্রনেতার নিরাপত্তায় অনেক সময় সবচেয়ে কার্যকর ঢালটি দেখা যায় না। যেটি সবাইকে দেখানো হচ্ছে, সেটিই হয়তো আসল নয়।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles