বিমানে ট্রাম্প নেই!

যা জানা জরুরি
- ইরানের হামলার আশঙ্কায় তুরস্কের আঙ্কারা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের অন্ধকারে রেখেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গোপনে অন্য বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
- সাংবাদিকেরা যখন পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তাঁদের অজান্তেই খাবার সরবরাহের গাড়ির আড়াল দিয়ে ট্রাম্পকে নিয়ে যাওয়া হয় মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি…
- নিরাপত্তার স্বার্থে এমন নজিরবিহীন গোপনীয়তা এখন প্রশ্ন তুলছে—প্রেসিডেন্টকে সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে কি সাংবাদিকদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়েছিল?
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ইরানের হামলার আশঙ্কায় তুরস্কের আঙ্কারা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের অন্ধকারে রেখেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গোপনে অন্য বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সাংবাদিকেরা যখন পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তাঁদের অজান্তেই খাবার সরবরাহের গাড়ির আড়াল দিয়ে ট্রাম্পকে নিয়ে যাওয়া হয় মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি সি-৩২এ বিমানে। নিরাপত্তার স্বার্থে এমন নজিরবিহীন গোপনীয়তা এখন প্রশ্ন তুলছে—প্রেসিডেন্টকে সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে কি সাংবাদিকদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়েছিল?
৮ জুলাই আঙ্কারা বিমানবন্দরে ট্রাম্পের সফরসঙ্গী সাংবাদিকেরা দেশে ফেরার জন্য বিমানে উঠেছিলেন। পরিস্থিতি দেখে বিন্দুমাত্র সন্দেহের কারণ ছিল না। টেবিলে খাবার সাজানো, বিমানের জানালার পর্দা নামানো এবং নিরাপত্তাকর্মীদের ব্যস্ততা—সবই যেন স্বাভাবিক ফেরার প্রস্তুতি। নেটো শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়েছে, এবার শুধু ওয়াশিংটনে ফেরার পালা।
সাংবাদিকদের জানানো হয়েছিল, ফেরার পথে ট্রাম্প পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানেই উঠবেন। তুরস্কে যাওয়ার সময় তিনি ব্যবহার করেছিলেন কাতারের দেওয়া বিলাসবহুল বোয়িং ৭৪৭-৮। কিন্তু ফেরার আগে ট্রাম্প নিজেই ট্রুথ সোশ্যালে জানান, পুরনো বিমানের প্রতি তাঁর আলাদা টান রয়েছে, তাই এবার সেটিতেই ফিরবেন। কাতারি বিমানটিকে এরই মধ্যে ব্রিটেনের মিলডেনহল মার্কিন বিমানঘাঁটিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু মাটিতে তখন চলছিল সম্পূর্ণ অন্য পরিকল্পনা।
সাংবাদিকেরা যে বিমানে বসেছিলেন, ট্রাম্প তখন সেখানে ছিলেনই না। বিমানটি রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকার সময় গোপনে তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয় একটি সি-৩২এ বিমানে। সাধারণত খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত একটি পরিষেবা-গাড়ি বিমানের সামনে এমনভাবে রাখা হয়েছিল, যাতে তার আড়ালে প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি আড়াল করা যায়।
অর্থাৎ, সাংবাদিকেরা যে বিমানে প্রেসিডেন্টকে থাকার কথা ভেবে বসেছিলেন, সেই সময়েই ট্রাম্প অন্য একটি বিমানে আকাশে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
সি-৩২এ বিমানটি প্রথমে ব্রিটেনের মিলডেনহলে জ্বালানি নিতে নামে। সেখানে ট্রাম্প আবার পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন এবং প্রকাশ্যে সেখান থেকে নামেন। এরপর ওয়াশিংটনের পথে ফের কাতারের দেওয়া বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানে ওঠেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হওয়ারই কথা—প্রেসিডেন্ট পুরো সফরেই পূর্বঘোষিত বিমান ব্যবহার করেছেন। মাঝখানে যে একটি গোপন বিমানবদল হয়ে গিয়েছিল, তার খবর ছিল না সাংবাদিকদেরও।
ঘটনাটি প্রথম প্রকাশ্যে আনে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। পরে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসও পৃথক প্রতিবেদনে ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করে। সংবাদমাধ্যমগুলির প্রতিবেদনে উঠে আসে, ইরানের সম্ভাব্য হামলা বা ট্রাম্পকে হত্যার হুমকির আশঙ্কাতেই শেষ মুহূর্তে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা অবশ্যই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে অন্য জায়গায়—ঝুঁকির কথা না জানিয়ে সাংবাদিকদের একই বিমানযাত্রায় পাঠানো কতটা নিরাপদ এবং যুক্তিসংগত?
এর আগেও মার্কিন প্রেসিডেন্টরা বিপজ্জনক এলাকায় গোপন সফর করেছেন। জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাক, বারাক ওবামা আফগানিস্তান এবং জো বাইডেন ইউক্রেনে সফরের সময় কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখেছিলেন। তবে সেসব ক্ষেত্রে সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের অন্তত নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি সম্পর্কে সীমিতভাবে জানানো হয়েছিল। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সাংবাদিকেরা শুধু জানতেন না যে প্রেসিডেন্ট তাঁদের সঙ্গে নেই, তাঁরা এটাও জানতেন না যে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় প্রেসিডেন্টকে আলাদা বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পরে ট্রাম্প নিজেই গোপন বিমানবদলের কথা স্বীকার করেন। সাংবাদিকদের তিনি জানান, সিক্রেট সার্ভিস ও সামরিক কর্তৃপক্ষ তাঁকে অন্য বিমান এবং অন্য রুটে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিরাপত্তারক্ষীদের নির্দেশ মেনে চলা ছাড়া তাঁর বিশেষ কোনও বিকল্প ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
আঙ্কারায় এই পরিকল্পনার কথা জানতেন মাত্র কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন। প্রেসিডেন্টকে রক্ষা করা সিক্রেট সার্ভিসের প্রধান দায়িত্ব—এ নিয়ে বিতর্ক নেই। কিন্তু ইরানের হুমকি ঠিক কতটা নির্দিষ্ট, কতটা তাৎক্ষণিক এবং কেন এত চরম গোপনীয়তার প্রয়োজন হল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
হুমকির পেছনে অবশ্যই একটি বড় প্রেক্ষাপট রয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই-সহ একাধিক ধর্মীয় ও সামরিক কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধের হুমকি জোরালো হয়। আঙ্কারা সম্মেলনের কয়েক সপ্তাহ আগেই ইজরায়েল ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারেও সতর্ক করেছিল। তবে মার্কিন প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা সেই সতর্কবার্তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় মার্কিন হামলার জন্য ইজরায়েল হয়তো এমন সতর্কবার্তা ব্যবহার করছে।
আঙ্কারা থেকে বিমানবদলের কয়েক ঘণ্টা আগেও নেটোর মহাসচিব মার্ক রুটের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প ইরানি হুমকির কথা বলেন। তাঁর দাবি, ইরান তাঁকে হত্যা করতে চায় এবং সম্ভাব্য নিশানার তালিকায় তাঁর নাম সবার আগে। এমনকি তিনি বলেন, এত দিন হয়তো ভাগ্যের জোরে বেঁচে গিয়েছেন, কিন্তু সেই ভাগ্য চিরকাল পাশে থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ব্রিটেন থেকে ওয়াশিংটন ফেরার সময় সাংবাদিকেরা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে ট্রাম্প অবশ্য স্বভাবসিদ্ধ রসিকতায় পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, তিনি সব সময়ই হুমকির মধ্যে থাকেন এবং তালিকায় এক নম্বরে। এমনকি তাঁর কিছু হলে সঙ্গে থাকা সাংবাদিকেরাও বিপদে পড়বেন—তাই তাঁদের পেশা বদলের কথাও ভাবা উচিত বলে মন্তব্য করেন।
তবে এই গোপন বিমানবদলের সঙ্গে আরেকটি বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে—কাতারের দেওয়া বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমান নিয়ে।
প্রায় ৪০ কোটি ডলার মূল্যের এই বিমানটি ২০২৫ সালে কাতার মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের জন্য দেয়। বিদেশি রাষ্ট্রের উপহার হিসেবে পাওয়া এত মূল্যবান একটি বিমান প্রেসিডেন্টের সরকারি যাতায়াতে ব্যবহার করা কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। বিশেষ করে, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সব আধুনিক সামরিক ব্যবস্থা কি এত অল্প সময়ে বিমানে বসানো সম্ভব হয়েছে?
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট অবশ্য বিমানটিকে নিরাপদ বলে দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, শরৎকালে বিমানে আরও উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সুরক্ষাবলয় যুক্ত করা হবে। কাজটি চলবে প্রায় এক মাস।
সেখানেই ফের প্রশ্ন—যদি আরও উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বসানোই প্রয়োজন হয়, তা হলে তুরস্ক সফরে বিমানটিকে এত তাড়াতাড়ি ব্যবহার করা হল কেন?
বিমানটির ভবিষ্যৎ মালিকানা নিয়েও বিতর্কের শেষ নেই। এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের দপ্তরের জন্য উপহার, নাকি ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের জন্য—সেই প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি মেটেনি। ট্রাম্প জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর বিমানটি তাঁর ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিতে রাখা হবে। যদিও তাঁর পরিকল্পিত মায়ামি প্রকল্পের নকশা দেখে সেটিকে শুধু লাইব্রেরি বলার চেয়ে বিলাসবহুল কমপ্লেক্স বলাই যেন বেশি মানানসই—সেখানে রয়েছে বিশাল নৃত্যকক্ষ, ট্রাম্পের সোনালি মূর্তি, ওভাল অফিসের অনুকৃতি এবং প্রবেশপথে একটি বোয়িং বিমান রাখার পরিকল্পনা।
এদিকে বহু বছরের বিলম্বের পর বোয়িং ২০২৮ সালে নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান সরবরাহের আশা করছে। তত দিন ট্রাম্পের যাতায়াতে পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ান, কাতারের বোয়িং এবং প্রয়োজনে সামরিক সি-৩২এ—তিন ধরনের বিমানই দেখা যেতে পারে।
তবে আঙ্কারার এই ঘটনা দেখিয়ে দিল, আসল বিতর্ক শুধু কোন বিমানে ট্রাম্প উঠছেন তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন আরও বড়—প্রেসিডেন্টকে নিরাপদ রাখার গোপনীয়তা আর সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা ও জনগণের জানার অধিকারের মধ্যে সীমারেখা কোথায়?
আঙ্কারায় ট্রাম্পকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু সাংবাদিকদের না জানিয়ে সেই নিরাপত্তা অভিযান কতটা স্বচ্ছ ছিল—এখন সেই প্রশ্নই উড়ছে আকাশে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



