বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বকাপের কিছু অংশ বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া এবং বিক্রি করে দেওয়ার বিতর্কিত পরিকল্পনাটি সপ্তাহখানেক আগেই বাতিল করা হয়েছে। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ফিফার চাপে থাকা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এমন প্রস্তাব দেওয়ার জন্য ক্ষমাও চেয়েছেন। কিন্তু ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ফুটবল প্রশাসনের ক্ষমতার অলিন্দে একটি লক্ষ্য এখনও অটুট—ইনফান্তিনোকে পদ থেকে সরানো।

ইনফান্তিনোর পরিকল্পনাটিকে তাঁর একতরফা ও বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তের দীর্ঘ তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন বলে মনে করা কর্তাদের ধারণা, এখন একমাত্র সমাধান হল তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা।

সোমবার বিশ্বের ছয়টি আঞ্চলিক ফুটবল কনফেডারেশনের মধ্যে তিনটি একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করে নিজেদের জোটকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। সেই চিঠিতে ফিফার শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তাদের মনোভাব সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিদের বক্তব্য, ইনফান্তিনোর উপর চাপ এতটাই বাড়ানো তাঁদের লক্ষ্য, যাতে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন।

কিন্তু গত এক দশক ধরে বিশ্ব ফুটবল পরিচালনা করা ইনফান্তিনো এখনও অনড় এবং আপাতত তাঁকে সরানোও অত্যন্ত কঠিন বলে মনে হচ্ছে। ফলে আগামী মার্চে ফিফা সভাপতি নির্বাচনে তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানানোর আগে তাঁর বিরোধীদের সামনে রয়েছে আট মাসের সম্ভাব্য বিপর্যয়কর রাজনৈতিক লড়াই।

ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের সংস্থা কনকাকাফ ও এশীয় ফুটবল কনফেডারেশনের প্রধানেরা খোলা চিঠিতে লিখেছেন, “ফুটবলের নেতৃত্ব কোনও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। প্রতারণার মাধ্যমে যখন বিশ্বাস ভেঙে যায়, যখন কোনও ব্যক্তি তাঁকে কর্তৃত্ব প্রদানকারী সমষ্টির উপরে নিজেকে স্থান দেন, তখন নেতৃত্বের দায়িত্ব পরিত্যক্ত হয়।”

অন্য দিকে ইনফান্তিনো যেখানে যতটা সম্ভব সমর্থন জোগাড় করার চেষ্টা করছেন। গত সপ্তাহে তিনি দক্ষিণ আমেরিকা সফর করেন। সেখানে আঞ্চলিক ফুটবল সংস্থার নেতারা তাঁর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সময়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হতে শুরু করেছে।

উয়েফার এক প্রাক্তন সহকর্মীর সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে যে অভিযোগ উঠেছে, ইনফান্তিনো তা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, এটি তাঁকে কলঙ্কিত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত প্রচার।

ফিফা এক বিবৃতিতে বলেছে, “ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে কয়েকটি নির্দিষ্ট শক্তি ফিফা এবং ফিফা সভাপতিকে দুর্বল করার লক্ষ্যে সংগঠিত ও ধারাবাহিক প্রচার চালাচ্ছে।”

এখন প্রশ্ন, ইনফান্তিনোর বিরোধীরা নির্বাচনের অনিশ্চিত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতেও প্রস্তুত কি না। খোলা চিঠিতে স্বাক্ষরকারী তিনটি কনফেডারেশনের সদস্যেরা যদি জোটবদ্ধ ভাবে ভোট দেন, তা হলে ইনফান্তিনোকে সরানোর জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়েও বেশি ভোট তাঁদের হাতে থাকবে। কারণ সম্মিলিত ভাবে তাঁরা ফিফার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সদস্যকে নিয়ন্ত্রণ করেন।

তবে ফিফার সদস্যদের এক জায়গায় এনে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়ানো অত্যন্ত কঠিন। সংস্থার ২১১টি সদস্য দেশের প্রত্যেকেরই নিজস্ব স্বার্থ, সমস্যা ও অগ্রাধিকার রয়েছে। তাদের একমাত্র মিল হল, প্রত্যেকের ভোটের মূল্য সমান। চার বার বিশ্বকাপজয়ী জার্মানির ভোটের যে গুরুত্ব, গুয়ামের ভোটেরও ঠিক একই গুরুত্ব। অথচ গুয়ামের পুরুষ ফুটবল দল কখনও বিশ্ব ক্রমতালিকায় ১৪৬ নম্বরের উপরে উঠতে পারেনি।

ইতিমধ্যেই প্রতিটি বিরোধী কনফেডারেশনের ভিতরে ফাটল দেখা যাচ্ছে। কনকাকাফে ইনফান্তিনোর পক্ষে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ মেক্সিকো। প্রথম থেকেই তারা বলেছিল, ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামে পরিচিত বেসরকারিকরণ পরিকল্পনাটি আরও বিবেচনার দাবি রাখে। এশিয়াতেও কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-সহ অন্তত ছ’টি দেশ জানিয়ে দিয়েছে, ভোটাভুটি হলে তারা ইনফান্তিনোর পক্ষেই থাকবে।

ইনফান্তিনোর বিরোধীদের সামনে আরও তাৎক্ষণিক সমস্যা হল, আগামী তিন মাসের মধ্যে এগিয়ে আসা দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা।

প্রথমটি অনূর্ধ্ব-২০ মহিলা বিশ্বকাপ। সাধারণ পরিস্থিতিতে এই প্রতিযোগিতা খুব বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করত না। কিন্তু এবার এটিই উয়েফার দৃঢ়তার পরীক্ষা হয়ে উঠতে চলেছে। অর্থপূর্ণ পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত ফিফার সমস্ত প্রতিযোগিতা বয়কট করার অঙ্গীকার করেছে উয়েফা।

সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে ২৪ দলের প্রতিযোগিতা থেকে ইউরোপের ছ’টি দলকে প্রত্যাহার করতে হবে। খেলোয়াড়দের যাতে শাস্তি পেতে না হয়, সে জন্য উয়েফা সমান্তরাল প্রতিযোগিতার আয়োজনও করতে পারে। উয়েফার চিন্তাভাবনা সম্পর্কে অবহিত এক ব্যক্তি এমনটাই জানিয়েছেন।

দ্বিতীয় সময়সীমাটি নভেম্বরে। তার মধ্যে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বিরোধীদের একজন প্রার্থী মনোনীত করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অবশ্য ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে কোনও প্রার্থীই নেই। ২০২৩ সালের মতো এবারও তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে পারেন। সে বার কার্যত একযোগে করতালির মধ্যেই তাঁকে পুনর্নির্বাচিত করা হয়েছিল।

তবে এখন অন্তত এটুকু স্পষ্ট, তৃতীয় পূর্ণ মেয়াদের জন্য ইনফান্তিনো আর সর্বসম্মত সমর্থন পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে এগোতে পারবেন না। টানা ১০ দিন ধরে ক্ষতি সামাল দেওয়ার প্রচারে তিনি স্বীকার করেছেন যে তাঁর ভুল হয়েছে। ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ পরিকল্পনাটি অত্যন্ত দ্রুত কার্যকর করার চেষ্টার জন্য তিনি ক্ষমাও চেয়েছেন। একই সময়ে তিনি বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৪৮ থেকে বাড়িয়ে ৬৪ করারও চেষ্টা করেছিলেন।

কিন্তু তাঁর বিরোধীদের চোখে সমস্যাটি কেবল তাড়াহুড়ো বা বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যর্থতা নয়। তিন কনফেডারেশন তাদের চিঠিতে লিখেছে, “ফিফা ঘটনাটিকে যোগাযোগের ব্যর্থতা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। অথচ ফুটবলবিশ্ব যা প্রত্যক্ষ করেছে, তা আসলে বিচারবোধের ব্যর্থতা।”