বিষয়বিশেষজ্ঞ বাছাইয়েই নীতি নেই এনটিএ-র, সিবিআইকে জানালেন সাক্ষী

যা জানা জরুরি
- নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁস মামলায় ১৩ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ দিল্লির আদালতের; বিশেষজ্ঞ নিয়োগ থেকে গোপন কক্ষের নিরাপত্তা—প্রকাশ্যে একের পর এক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নয়াদিল্লি: দেশের লক্ষ…
- নিট-ইউজি ২০২৬ প্রশ্নফাঁসের তদন্তে সিবিআইয়ের কাছে দেওয়া এক সাক্ষীর জবানবন্দিতে এই তথ্য উঠে এসেছে।
- গত ২৮ জুলাই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার জমা দেওয়া অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে মামলাটি গ্রহণ করেছে দিল্লির বিশেষ সিবিআই আদালত।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁস মামলায় ১৩ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ দিল্লির আদালতের; বিশেষজ্ঞ নিয়োগ থেকে গোপন কক্ষের নিরাপত্তা—প্রকাশ্যে একের পর এক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা
নয়াদিল্লি: দেশের লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরির জন্য বিষয়বিশেষজ্ঞ বাছাইয়ের কোনও নির্দিষ্ট লিখিত নীতিই নেই ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-র। নিট-ইউজি ২০২৬ প্রশ্নফাঁসের তদন্তে সিবিআইয়ের কাছে দেওয়া এক সাক্ষীর জবানবন্দিতে এই তথ্য উঠে এসেছে। গত ২৮ জুলাই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার জমা দেওয়া অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে মামলাটি গ্রহণ করেছে দিল্লির বিশেষ সিবিআই আদালত।
সিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে মোট ১৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন এনটিএ নিযুক্ত তিন বিষয়বিশেষজ্ঞ, কয়েক জন প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিচালনাকারী, দালাল এবং প্রশ্নপত্রের সুবিধাভোগী পরীক্ষার্থী। তদন্তকারী সংস্থা ৩৬০ জন সাক্ষীর জবানবন্দি, ৪২২টি নথি এবং ৪৩টি বস্তুগত প্রমাণ আদালতে পেশ করেছে। অভিযুক্তেরা বর্তমানে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন।
মহারাষ্ট্রের এক পদার্থবিদ্যার বিশেষজ্ঞ সিবিআইকে জানিয়েছেন, বিষয়বিশেষজ্ঞ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এনটিএ-র কোনও নির্ধারিত যোগ্যতামান বা আনুষ্ঠানিক পদ্ধতি তাঁর জানা নেই। সাধারণত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের অভিজ্ঞতা, সুনাম, পূর্ববর্তী কাজ এবং এনটিএ-র সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতেই নাম বাছাই করা হয়। কার সুপারিশে কোন বিশেষজ্ঞকে নেওয়া হল, তাঁর অতীত যাচাই কী ভাবে করা হল কিংবা স্বার্থের সংঘাত রয়েছে কি না—এসব নিয়েও স্পষ্ট ও অভিন্ন বিধি নেই বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সাক্ষীর এই বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সিবিআইয়ের দাবি, প্রশ্নপত্র তৈরির গোপন প্রক্রিয়ায় যুক্ত তিন বিশেষজ্ঞই নিজেদের অবস্থানের অপব্যবহার করে পরীক্ষার আগে প্রশ্ন বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের দায়িত্ব ছিল অনুবাদ, পুনরানুবাদ এবং প্রশ্নের ভাষাগত ও বিষয়গত শুদ্ধতা যাচাই করা। এই কাজের সুবাদেই তাঁরা আসল প্রশ্ন দেখার সুযোগ পান।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, রসায়নের বিশেষজ্ঞ প্রহ্লাদ বিঠলরাও কুলকার্নি গোপন কক্ষে দেওয়া সাদা কাগজে ১৩৫টি প্রশ্ন এবং তার উত্তরসংকেত সংক্ষেপে লিখেছিলেন। পরে ছোট ছোট চিরকুটে সেগুলি লুকিয়ে বাইরে নিয়ে যান। তুলনামূলক সহজ প্রশ্নগুলি তিনি মনে রেখে হোটেলে ফিরে লিখে ফেলতেন বলেও অভিযোগ।
উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যার প্রশ্ন অনুবাদের সঙ্গে যুক্ত মণীষা গুরুনাথ মন্ধারে দীর্ঘদিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রশ্নগুলি মনে রাখতেন। হোটেলে ফিরে এনসিইআরটি পাঠ্যবইয়ের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ চিহ্নিত করে সেখান থেকে প্রশ্ন পুনর্গঠন করতেন বলে সিবিআই জানিয়েছে। পদার্থবিদ্যার বিশেষজ্ঞ মণীষা সঞ্জয় হাভালদারের বিরুদ্ধেও গোপন কক্ষ থেকে বেরিয়ে নিজের থাকার জায়গায় ফিরে প্রশ্নগুলি সংক্ষেপে লিখে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
এই অনিয়ম সম্ভব হয়েছিল এনটিএ-র নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতার কারণে। গোপন কক্ষে প্রবেশ বা সেখান থেকে বেরোনোর সময় বিশেষজ্ঞদের দেহতল্লাশির কোনও ব্যবস্থা ছিল না। তাঁদের দেওয়া খসড়া কাগজের হিসাবও যথাযথ ভাবে রাখা হত না। ফলে কাগজের টুকরোয় প্রশ্ন লিখে বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।
দিল্লির ওখলায় এনএসআইসি ভবনের প্রথম ও পঞ্চম তলে এনটিএ-র দফতর। প্রথম তলের একটি সম্পূর্ণ অংশ জুড়ে ছিল প্রশ্নপত্র সংক্রান্ত গোপন বিভাগ। সেখানে প্রায় ১১০টি নজরদারি ক্যামেরা থাকলেও সরাসরি ছবি পর্যবেক্ষণের জন্য আলাদা নিয়ন্ত্রণকক্ষ ছিল না। ক্যামেরায় ছবি উঠলেও কে কখন কী করছেন, তা তাৎক্ষণিক ভাবে নজর করার বন্দোবস্ত ছিল না।
আরও বড় সমস্যা, নজরদারি ক্যামেরার ছবি মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিন সংরক্ষণ করা হত। নিটের গোপন কাজ শেষ হয়েছিল ৭ এপ্রিল। প্রশ্নফাঁসের মামলা দায়ের হয় ১২ মে। তত দিনে প্রাসঙ্গিক সময়ের সমস্ত ছবি মুছে গিয়েছিল। ফলে তদন্তকারীরা ক্যামেরার কোনও গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য উদ্ধার করতে পারেননি।
সিবিআইয়ের দাবি, এনটিএ-র গোপন বিভাগ থেকে বেরোনোর পরে প্রশ্নগুলি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের কর্মী এবং দালালদের হাতে পৌঁছয়। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম এবং অন্য বার্তা আদানপ্রদানের মাধ্যমে বিভিন্ন রাজ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কোনও কোনও পরীক্ষার্থীর পরিবারের কাছে প্রশ্ন দেওয়ার বিনিময়ে চার লক্ষ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয়েছিল। বাজেয়াপ্ত মুঠোফোন, পেনড্রাইভ, কথোপকথনের নথি এবং প্রশ্নের পিডিএফ থেকে এই যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে বলে তদন্তকারীদের বক্তব্য।
১৩ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং সরকারি পরীক্ষা আইনের বিভিন্ন ধারা প্রয়োগ করেছে সিবিআই। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করায় এ বার বিচারপ্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ শুরু হবে। তবে তদন্তে উঠে আসা তথ্য শুধু কয়েক জনের অপরাধের কাহিনি নয়; বিশেষজ্ঞ নিয়োগে লিখিত নীতির অভাব, তল্লাশিহীন গোপন কক্ষ এবং নজরদারির প্রহসন—সব মিলিয়ে এনটিএ-র গোটা পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



