বাংলাদেশে পালানোর ছক ভেস্তে বনগাঁ সীমান্তে ধৃত সন্দেহভাজন পাক গুপ্তচর

যা জানা জরুরি
- স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী উত্তর ২৪ পরগনা থেকে এক সন্দেহভাজন পাকিস্তানি গুপ্তচরকে গ্রেফতার করল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ অভিযান বাহিনী (এসটিএফ)।
- তদন্তকারীদের দাবি, পাকিস্তানের ফয়সলাবাদের বাসিন্দা রউফ এ দেশে ‘ওয়াহাব আলম’ নামে আত্মগোপন করে ছিলেন।
- ভুয়ো আধার ও ভোটার পরিচয়পত্র ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে তিনি ভারতের সামরিক ও রেল পরিকাঠামো সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করছিলেন বলে অভিযোগ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী উত্তর ২৪ পরগনা থেকে এক সন্দেহভাজন পাকিস্তানি গুপ্তচরকে গ্রেফতার করল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ অভিযান বাহিনী (এসটিএফ)। ধৃতের নাম রানা রউফ। তদন্তকারীদের দাবি, পাকিস্তানের ফয়সলাবাদের বাসিন্দা রউফ এ দেশে ‘ওয়াহাব আলম’ নামে আত্মগোপন করে ছিলেন। ভুয়ো আধার ও ভোটার পরিচয়পত্র ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে তিনি ভারতের সামরিক ও রেল পরিকাঠামো সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করছিলেন বলে অভিযোগ। তবে সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া সন্দেহভাজন জইশ-ই-মহম্মদ সদস্য হামিম মণ্ডলের সঙ্গে রউফের কোনও যোগসূত্র এখনও মেলেনি বলে স্পষ্ট করেছে এসটিএফ।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, রউফকে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি বনগাঁ-হাবড়া অঞ্চল থেকে ধরা হয়েছে। তাঁর বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। সেই পরিকল্পনার নির্দিষ্ট খবর পাওয়ার পরেই সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত এসটিএফের একটি দল তাঁকে আটক করে। স্বাধীনতা দিবসের আগে এমন গ্রেফতার স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, রউফ ২০১২ সালে নেপালের সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকেছিলেন। তার পর থেকে তিনি একাধিকবার নেপাল হয়ে ভারতে যাতায়াত করেছেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। কলকাতার তপসিয়া এলাকায় তাঁর থাকার ঠিকানাও পাওয়া গিয়েছে। নিজের পাকিস্তানি পরিচয় গোপন করতে তিনি ওয়াহাব আলম নাম ব্যবহার করতেন। ওই নামেই আধার কার্ড ও ভোটার পরিচয়পত্র-সহ একাধিক ভারতীয় নথি তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
এসটিএফের দাবি, রউফের সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং সে দেশের গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স বা আইএসআইয়ের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ছিল। তাঁর কাছ থেকে দেশের বিভিন্ন রেলস্টেশন, রেললাইন এবং ট্রেন চলাচলের ছবি উদ্ধার হয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী সংক্রান্ত কিছু নথি ও ছবিও পাওয়া গিয়েছে বলে তদন্তকারী সূত্রে খবর। এগুলি তিনি কেন সংগ্রহ করেছিলেন এবং কাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন, এখন সেটিই তদন্তের প্রধান বিষয়।
রউফের বৈদ্যুতিন যন্ত্র এবং ফোন ঘেঁটে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, সংগৃহীত ছবি ও তথ্য একাধিক ফোন নম্বরে পাঠানো হয়েছিল। ওই নম্বরগুলির ব্যবহারকারীদের পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে। তথ্যের বিনিময়ে রউফ কোনও অর্থ পেয়েছিলেন কি না, তা জানতে তাঁর ব্যাঙ্ক হিসাব এবং সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেনও পরীক্ষা করা হচ্ছে। ভারতের মধ্যে তাঁর সহযোগীদের পাশাপাশি সীমান্তের ওপারে কারা তাঁকে গ্রহণ করার কথা ছিল, সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
জিজ্ঞাসাবাদে রউফ জানিয়েছেন বলে পুলিশের দাবি, কলকাতার তপসিয়ায় বসবাসকারী এক ছুতোর তাঁকে ভারতীয় পরিচয়পত্র তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন। ভারতে আসার আগেই নেপালে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল। সেই সূত্র ধরে তপসিয়া থেকে মহম্মদ ইজাজ নামে ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে এসটিএফ। তিনি শুধু পরিচয়পত্র তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন, না কি বৃহত্তর কোনও গুপ্তচর-চক্রের সক্রিয় সদস্য, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভুয়ো নথি তৈরির নেপথ্যে আর কারা ছিলেন, তা জানতেও তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
গোয়েন্দাদের ধারণা, সহযোগীর গ্রেফতারির খবর পাওয়ার পরেই রউফ বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর পরিচয় ফাঁস হয়ে যেতে পারে। সেই কারণেই তিনি দ্রুত বাংলাদেশে পালানোর চেষ্টা করেন। সীমান্ত পেরোনোর পরে তাঁর গন্তব্য কোথায় ছিল এবং সেখানে কে বা কারা সাহায্য করত, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে সীমান্ত এলাকায় তাঁর চলাফেরার পূর্ববর্তী তথ্য এবং স্থানীয় যোগাযোগগুলি নতুন করে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
জুলাইয়ের শেষে পূর্ব বর্ধমান থেকে হামিম মণ্ডলকে গ্রেফতার করেছিল এসটিএফ। হামিমের সঙ্গে পাকিস্তানভিত্তিক জইশ-ই-মহম্মদের যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ। তাঁর বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ও নবান্ন-সহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নজরদারি চালানোর অভিযোগও ওঠে। সেই কারণে রউফের গ্রেফতারির পরে দুই ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র থাকার জল্পনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তদন্তের বর্তমান পর্যায়ে রানা রউফ এবং হামিম মণ্ডলের মধ্যে কোনও যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে এসটিএফ জানিয়েছে। দুটি মামলার প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট পাক যোগাযোগ আলাদা বলেই আপাতত মনে করছেন তদন্তকারীরা।
রউফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি অবশ্য এখনও তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তিনি সত্যিই আইএসআইয়ের নির্দেশে কাজ করতেন কি না, উদ্ধার হওয়া ছবি ও নথি কতটা সংবেদনশীল এবং সেগুলি শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছেছিল—এই প্রশ্নগুলির উত্তরই মামলার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে। তবে ভুয়ো ভারতীয় পরিচয়ে এক পাকিস্তানি নাগরিকের দীর্ঘদিন বসবাস এবং বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে পালানোর অভিযোগ রাজ্যের সীমান্ত-নিরাপত্তা ও পরিচয়পত্র যাচাই ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



