রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পরেই মোদির দ্বারস্থ ত্রিবেদী, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কে বরফ গলার ইঙ্গিত

যা জানা জরুরি
- বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় আলোচনার এক দিন পরেই নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করলেন সে দেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
- মঙ্গলবারের এই বৈঠকে ঢাকা থেকে পাওয়া বার্তা মোদির কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
- সাম্প্রতিক টানাপড়েন কাটিয়ে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ককে আবার স্বাভাবিক পথে ফেরানোর কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেই পরপর এই বৈঠকগুলিকে দেখা হচ্ছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় আলোচনার এক দিন পরেই নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করলেন সে দেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। মঙ্গলবারের এই বৈঠকে ঢাকা থেকে পাওয়া বার্তা মোদির কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক টানাপড়েন কাটিয়ে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ককে আবার স্বাভাবিক পথে ফেরানোর কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেই পরপর এই বৈঠকগুলিকে দেখা হচ্ছে।
ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন জানিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বহুমাত্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ককে গঠনমূলক এবং জনমুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে মোদির নির্দেশনা চেয়েছেন ত্রিবেদী। সোমবারই তিনি ঢাকা থেকে নয়াদিল্লি পৌঁছন। তার আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তিনি। ফলে মোদি–ত্রিবেদী আলোচনা নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না; ঢাকার নেতৃত্বের মনোভাব সম্পর্কে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিস্তারিত অবহিত করাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে মোদির শুভেচ্ছা পৌঁছে দিয়েছিলেন ত্রিবেদী। বাংলাদেশ সরকার ও সে দেশের মানুষের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী উপায়ে কাজ করতে ভারত আগ্রহী বলেও তিনি জানান। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে উভয়ের আলোচনা হয়।
অন্য দিকে, বৈঠকে ভারতের কাছে কয়েকটি স্পর্শকাতর বিষয় তুলেছে ঢাকা। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবির অনুকূল জবাব পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তারেক। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। বর্তমানে ভারতে অবস্থানকারী হাসিনাকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশ আগেই আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে। ভারত বলেছে, সেই আবেদন দেশের আইন ও বিচারবিধি অনুসারে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনাকে সম্প্রতি নয়াদিল্লি থেকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ। ওই অনুষ্ঠানে হাসিনা তারেক রহমানের সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন এবং দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রক ঘটনাটিকে সে দেশের মানুষের অনুভূতির পক্ষে আঘাতজনক বলে বর্ণনা করেছে। ভারত অবশ্য জানিয়েছে, হাসিনার ওই সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথোপকথন আয়োজনের সঙ্গে নয়াদিল্লির কোনও যোগ ছিল না এবং সেখানে প্রকাশিত বক্তব্যও ভারত সরকার সমর্থন করে না।
তারেকের সঙ্গে ত্রিবেদীর বৈঠকের আগে দুই দেশের সম্পর্ক মেরামতের একটি সম্ভাব্য পথের কথা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন ভারতীয় হাইকমিশনার। তাঁর বক্তব্য ছিল, মোদি ও তারেক সরাসরি বৈঠকে বসলে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে। সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে সাম্প্রতিক অস্বস্তির কারণে তারেক ওই সম্মেলনে যোগ দেবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ত্রিবেদীর কূটনৈতিক তৎপরতা সেই সফরের পথ প্রস্তুত করার প্রচেষ্টাও হতে পারে।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠকে সীমান্ত ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন ত্রিবেদী। পারস্পরিক স্বার্থ, সুবিধা ও সংবেদনশীলতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সব ক্ষেত্রে জনমুখী সহযোগিতা বাড়াতে ভারত প্রস্তুত বলে তিনি জানান। সীমান্তে হত্যা, অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং জঙ্গি তৎপরতা দুই দেশের আলোচনায় বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি জলবণ্টন, বাণিজ্যের ভারসাম্য, ভিসা প্রদান এবং যোগাযোগ প্রকল্প নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে।
এই কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। দলটি বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে বলে জানা গেলেও কোনও দেশই বৈঠকের বিস্তারিত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। তবে একই সময়ে রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা—দুই স্তরেই যোগাযোগ শুরু হওয়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের বৃহত্তর উদ্যোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্ত, নদী, বাণিজ্য ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারত ও বাংলাদেশ পরস্পরের উপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দীর্ঘ সময় সম্পর্ক স্থবির রাখা কোনও পক্ষের পক্ষেই সুবিধাজনক নয়। ত্রিবেদীর ঢাকা বৈঠক এবং তার পরপরই মোদির সঙ্গে তাঁর আলোচনা তাই তাৎপর্যপূর্ণ। এখন নজর থাকবে, দূত মারফত এই বার্তা বিনিময় শেষ পর্যন্ত মোদি–তারেক মুখোমুখি বৈঠকের পথ খুলে দেয় কি না। বৈঠকটি হলে সেটিই বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের প্রথম বড় রাজনৈতিক পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



