ওয়াশিংটন: প্রেসিডেন্টকে বাঁচাতে বিমানই হল ‘টোপ’! ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরাপত্তার জন্য এমনই এক গোপন কৌশল নিয়েছিল মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস—যার জেরে শতাধিক সাংবাদিক, আধিকারিক ও কর্মী অজান্তেই এমন একটি বিমানে চেপে বসেছিলেন, যেটি সম্ভাব্য হামলাকারীদের নজর ঘোরানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে ওয়াশিংটনে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৮ জুলাই, তুরস্কের আঙ্কারায় নেটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে। ট্রাম্পকে সবার চোখের সামনে পুরনো নীল-সাদা ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ উঠতে দেখা যায়। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি হাতও নাড়েন। কিন্তু সেটিই ছিল গোটা পরিকল্পনার প্রথম ধাপ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানের দরজার সামনে খাবার সরবরাহকারী একটি গাড়ি এসে দাঁড়ায়। সেই গাড়ির আড়ালে ট্রাম্প বিমান থেকে নেমে যান এবং বিমানবন্দরের অন্য প্রান্তে অপেক্ষমাণ ছোট সামরিক বিমান সি-৩২এ-তে উঠে পড়েন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
অন্য দিকে, মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো, অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট, আরও বহু সরকারি আধিকারিক এবং সাংবাদিকেরা আগের বিমানেই থেকে যান। তাঁদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তারপর সেই বিমানটি ট্রাম্পকে বহন করছে—এমন ধারণা বজায় রেখেই ব্রিটেনের আরএএফ মিল্ডেনহলের দিকে উড়ে যায়।
আসল ঘটনা ছিল অন্যত্র। ট্রাম্প ছোট সামরিক বিমানেই গোপনে ব্রিটেনে পৌঁছে যান। পরে তাঁকে ফের পুরনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ থেকে নামতে দেখা যায়। এরপর কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানে চেপে তিনি ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা দেন।
ঘটনাটি কয়েক সপ্তাহ গোপন থাকার পর সামনে আসে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। জানা যায়, সেই সময় মার্কিন গোয়েন্দারা ট্রাম্পকে হত্যার একটি বিশ্বাসযোগ্য ইরানি ষড়যন্ত্রের খবর পেয়েছিল বলে আশঙ্কা করছিলেন। সেই কারণেই শেষ মুহূর্তে বিমান বদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ট্রাম্প নিজেও বিমান বদলের কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সিক্রেট সার্ভিস এবং সামরিক কর্তারা যা পরামর্শ দিয়েছিলেন, তিনি সেটাই করেছেন। তাঁর কথায়, “ওঁরা যা করতে বলেন, আমি সেটাই করি।” তবে ট্রাম্পের দাবি, ছোট বিমানটিই হয়তো বেশি ঝুঁকিতে ছিল—কারণ হামলাকারীরা সেটিকেই লক্ষ্য করতে পারে বলে তিনি মনে করেছিলেন।
কিন্তু বিতর্ক থামেনি। বরং আসল প্রশ্নটি এখন আরও বড়: প্রেসিডেন্টকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য যাত্রীদের কি অজান্তেই ‘টোপ’ বানানো হয়েছিল?
কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সেনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল ঘটনাটিকে “নজিরবিহীন, অবাস্তব এবং ভয়ঙ্কর” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন, যে বিমানটিকে প্রেসিডেন্টের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়েছিল, সেই বিমানে থাকা সাংবাদিক, কর্মী ও আধিকারিকদের নিরাপত্তার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
সেনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমারও হোয়াইট হাউসের কাছে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা চেয়েছেন। ডেমোক্র্যাট সদস্যেরা কংগ্রেসের গোপনীয় বৈঠক ডেকে পুরো পরিকল্পনা খতিয়ে দেখার দাবিও তুলেছেন।
প্রাক্তন সিআইএ আধিকারিক স্টিভেন ক্যাশের মতে, ঘটনাটি বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে—ট্রাম্পের বিপদ কমাতে শতাধিক মানুষকে তাঁর বদলে সম্ভাব্য নিশানা হিসেবে রাখা হয়েছিল। এখানেই সামনে আসছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ‘ডিউটি টু ওয়ার্ন’ নীতি। কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্ক করার কথা। তবে সতর্কবার্তা দিলে গোয়েন্দা অভিযান বা সূত্র বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে। এই ঘটনায় সেই ব্যতিক্রম প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, এখনও স্পষ্ট নয়।
প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে এমন বিভ্রান্তিমূলক কৌশল অবশ্য নতুন নয়। ২০০০ সালে বিল ক্লিন্টনের পাকিস্তান সফরের সময়ও এয়ার ফোর্স ওয়ানকে সম্ভাব্য ‘টোপ’ রেখে তাঁকে একটি চিহ্নহীন ছোট বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে সে বার সংবাদমাধ্যমের কয়েক জন প্রতিনিধি পরিকল্পনাটি জানতেন।
এ বার বিতর্কের জায়গাটা সেখানেই। সাংবাদিক থেকে শুরু করে সরকারি কর্মী—যাঁরা বিমানে ছিলেন, তাঁদের কাউকেই নাকি জানানো হয়নি যে তাঁদের বিমানটি প্রেসিডেন্টের প্রকৃত বিমান নয়। এমনকি নিরাপদে পৌঁছনোর পরও ঘটনাটি কয়েক সপ্তাহ গোপন রাখা হয়েছিল।
হোয়াইট হাউসের বক্তব্য, আমেরিকার বহু শত্রুই প্রেসিডেন্টকে নিশানা করতে চায়। তাই ট্রাম্পকে সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সিক্রেট সার্ভিস অবশ্য অভিযানের নির্দিষ্ট খুঁটিনাটি নিয়ে মুখ খোলেনি।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—রাষ্ট্রপ্রধানের প্রাণ বাঁচাতে গোপন ছক কতটা গোপন রাখা যায়? আর সেই ছকে সাধারণ কর্মী ও সাংবাদিকদের অজান্তে ‘টোপ’ বানানোর সীমা কোথায়?
এই উত্তরগুলিই এখন কংগ্রেসের কাছে চাইছে ওয়াশিংটনের বিরোধী শিবির। ট্রাম্পকে বাঁচানোর অপারেশন সফল হয়েছিল কি না, তার উত্তর এক রকম পরিষ্কার। কিন্তু সেই সাফল্যের দাম কে দিয়েছিল—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।