বাংলাস্ফিয়ার:ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে প্রায় আড়াই সপ্তাহ ধরে জমতে থাকা ক্ষোভ সোমবার কার্যত আছড়ে পড়ল রাজ্য বিধানসভার দুয়ারে। হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী ও ছাত্রছাত্রীর ‘বিধানসভা ঘেরাও’ কর্মসূচি আটকাতে রাঁচিতে পুলিশকে লাঠিচার্জ, জলকামান এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে হল। একের পর এক ব্যারিকেড ভেঙে আন্দোলনকারীরা বিধানসভার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সংঘর্ষে বেশ কয়েক জন আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ। আর এই উত্তেজনার মধ্যেই আরও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা—ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা জেপিএসসি-র প্রাক্তন চেয়ারম্যান এল খিয়াংতেকে নিয়োগ পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের তদন্তে গ্রেফতার করেছে রাজ্যের সিআইডি।
সোমবার সকাল থেকেই রাঁচির চেহারা ছিল অন্য রকম। বিধানসভার অধিবেশন চলায় প্রশাসন আগে থেকেই নিরাপত্তার একাধিক বলয় তৈরি করেছিল। ব্যারিকেড, কাঁটাতারের বেড়া এবং বিপুল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। কিন্তু সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দিক থেকে চাকরিপ্রার্থীরা জমায়েত হতে শুরু করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল বিধানসভা পর্যন্ত পৌঁছে সরকারের উপর সরাসরি চাপ তৈরি করা। গত কয়েক দিনের আলোচনায় কোনও চূড়ান্ত সমাধান না হওয়ায় আন্দোলনকারীরা আগেই ঘোষণা করেছিলেন, তাঁরা বিধানসভা ঘেরাও করবেন।
ব্যারিকেড ভেঙে বিধানসভার দিকে
আন্দোলনকারীদের মিছিল এগোতে শুরু করলে প্রথমে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের আটকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু জনতার চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে। কয়েকটি জায়গায় ব্যারিকেড সরিয়ে বা টপকে আন্দোলনকারীরা এগিয়ে যান। শেষ দিকের নিরাপত্তা বলয়ের কাছে পৌঁছনোর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পুলিশ প্রথমে জলকামান ব্যবহার করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। তাতেও মিছিল থামানো না গেলে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত লাঠিচার্জ করা হয়। রাস্তায় আন্দোলনকারীদের ছোটাছুটি, পুলিশের ধাওয়া, জলকামানের প্রবল স্রোত এবং কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় বিধানসভা সংলগ্ন এলাকা। কয়েক জন আন্দোলনকারী আহত হওয়ার দাবি করেছেন।
এই সংঘাত হঠাৎ তৈরি হয়নি। জেপিএসসি এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে অনিয়ম, স্বচ্ছতার অভাব এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে বেশ কিছু দিন ধরেই রাঁচিতে বিক্ষোভ চলছিল। জেপিএসসি-র ১৪তম কম্বাইন্ড সিভিল সার্ভিসেস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। ১০৩টি শূন্যপদের জন্য ২,২০৪ জনকে পরবর্তী পর্যায়ের জন্য বাছাই করা হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়া নিয়েই পরীক্ষার্থীদের একাংশ গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
অনশন থেকে বিধানসভা অভিযান
প্রথম দিকে আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়াম। সেখানে কয়েক জন চাকরিপ্রার্থী অনশনেও বসেন। ক্রমশ রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে পরীক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা এসে আন্দোলনে যোগ দিতে শুরু করেন। সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের একাধিক দফা আলোচনা হলেও অচলাবস্থা পুরোপুরি কাটেনি।
সরকার ১৪তম জেপিএসসি কম্বাইন্ড সিভিল সার্ভিসেসের প্রাথমিক পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, তাঁদের দাবি শুধুমাত্র একটি পরীক্ষা বাতিল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়োগ ব্যবস্থার সামগ্রিক সংস্কার, অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং ভবিষ্যতের পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন তাঁরা।
সেই কারণেই সোমবারের বিধানসভা অভিযানকে আন্দোলনের একটি নির্ণায়ক পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছিল। প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যক আন্দোলনকারী বিধানসভার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় সরকারের উপর চাপ আরও বেড়েছে।
আন্দোলনের দিনেই খিয়াংতে গ্রেফতার
তবে সোমবারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা সম্ভবত জেপিএসসি-র প্রাক্তন চেয়ারম্যান এল খিয়াংতের গ্রেফতারি। তিনি শুধু কমিশনের প্রাক্তন প্রধানই নন, ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যসচিব এবং ১৯৯৭ ব্যাচের আইএএস আধিকারিক। নিয়োগ পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে কথিত অনিয়মের তদন্তে সিআইডি তাঁকে গ্রেফতার করেছে।
তদন্তকারীদের নজরে বিশেষ ভাবে রয়েছে পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব একটি সংস্থাকে দেওয়ার প্রক্রিয়া। অভিযোগ, নিয়ম মেনে দরপত্রের মাধ্যমে সংস্থা নির্বাচনের বদলে কালো তালিকাভুক্ত একটি সংস্থাকে পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। খিয়াংতেকে এর আগে একাধিক দফায় দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। তদন্তে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে নথি এবং বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলেও খবর।
ফলে তাঁর গ্রেফতারি আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে। এত দিন চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পরীক্ষার ফল, প্রশ্নপত্র, মূল্যায়ন এবং কমিশনের ভূমিকা। এখন কমিশনের প্রাক্তন সর্বোচ্চ কর্তার গ্রেফতারি আন্দোলনকারীদের অভিযোগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
কেন এত ক্ষোভ
ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী বছরের পর বছর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। একটি নিয়োগ পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়া, বাতিল হওয়া বা তার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার অর্থ তাঁদের কাছে শুধু একটি পরীক্ষা হারানো নয়—জীবনের কয়েকটি মূল্যবান বছর নষ্ট হয়ে যাওয়া।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বারবার সমস্যা দেখা দিলেও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাঁদের দাবি, শুধু পরীক্ষা বাতিল করে নতুন পরীক্ষা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোথায় এবং কী ভাবে অনিয়ম হয়েছে, কারা দায়ী এবং ভবিষ্যতে একই ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—সরকারকে তার স্পষ্ট উত্তর দিতে হবে।
সোমবারের পুলিশি ব্যবস্থা সেই ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষত আন্দোলনকারীদের দাবি, তাঁরা চাকরি এবং স্বচ্ছ পরীক্ষার দাবিতেই রাস্তায় নেমেছিলেন। অন্য দিকে প্রশাসনের যুক্তি, অধিবেশন চলাকালীন বিধানসভার নিরাপত্তা বলয় ভাঙার চেষ্টা হলে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশকে ব্যবস্থা নিতেই হয়।
হেমন্ত সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা
ঘটনাটি এখন মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সরকারের জন্য নিছক নিয়োগ-সংক্রান্ত প্রশাসনিক সমস্যা নয়। এটি ক্রমশ যুবসমাজের আস্থা এবং সরকারের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন হয়ে উঠছে। হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীকে রাস্তায় নামতে দেখা এবং তাঁদের উপর লাঠিচার্জের ছবি বিরোধীদের হাতেও বড় রাজনৈতিক অস্ত্র তুলে দিতে পারে।
অন্য দিকে খিয়াংতের গ্রেফতারি দেখিয়ে সরকার বলতে পারে, অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে না এবং তদন্ত তার নিজের গতিতেই এগোচ্ছে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা এখন তদন্তের শেষ পর্যন্ত যেতে চান। তাঁদের প্রশ্ন—একজন প্রাক্তন চেয়ারম্যানের গ্রেফতারিতেই কি তদন্ত থামবে, নাকি গোটা নিয়োগ ব্যবস্থার দায় নির্ধারণ করা হবে?
সোমবার তাই ঝাড়খণ্ডের ছাত্র-চাকরিপ্রার্থী আন্দোলনের মোড় ঘোরানো দিন। জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামের অনশন মঞ্চ থেকে শুরু হওয়া ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে বিধানসভার নিরাপত্তা বলয় পর্যন্ত। এক দিকে লাঠি, জলকামান, কাঁদানে গ্যাস; অন্য দিকে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীর অনড় দাবি—পরীক্ষা এবং নিয়োগে স্বচ্ছতা চাই। তার মধ্যেই প্রাক্তন জেপিএসসি চেয়ারম্যানের গ্রেফতারি বুঝিয়ে দিল, এই আন্দোলন আর শুধু পরীক্ষার ফল নিয়ে অসন্তোষে সীমাবদ্ধ নেই। ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই এখন কাঠগড়ায়।