ভারতের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত গোপন তথ্য পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগে ভারতীয় বায়ুসেনার এক উইং কমান্ডারকে গ্রেফতারের পর তদন্তের পরিধি দ্রুত বাড়ছে। দিল্লি পুলিশের সন্দেহ, ঘটনাটি হয়তো কোনও একক অফিসারের বিচ্ছিন্ন কাণ্ড নয়। এর পিছনে থাকতে পারে পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের পরিচালিত একটি বড়সড় গুপ্তচর চক্র, যার নিশানায় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর কর্মীরা।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় দু’মাস আগে ওই অফিসারকে গ্রেফতার করা হলেও তদন্তের স্বার্থে বিষয়টি এত দিন প্রকাশ্যে আনা হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’-এর আওতায় মামলা হয়েছে। এখন তাঁর মোবাইল ফোন, ডিজিটাল যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন এবং সন্দেহভাজন পাকিস্তানি যোগাযোগের সূত্র ধরে গোটা নেটওয়ার্কের ছবি তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
শুরুটা কি ‘হানি ট্র্যাপ’?
তদন্তকারীদের সন্দেহ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ফাঁদেই প্রথমে জড়ানো হয়েছিল ওই বায়ুসেনা অফিসারকে। ভুয়ো পরিচয়ে যোগাযোগ তৈরি, ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো এবং তার পর সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ—গুপ্তচরবৃত্তিতে এই কৌশল বহু পুরনো। ডিজিটাল যুগে অবশ্য তার হাতিয়ার বদলে গিয়েছে। সমাজমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগই হয়ে উঠেছে নতুন দরজা।
এই মামলায় তাই পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—প্রথম যোগাযোগ কে করেছিল? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কি নিজের পরিচয় গোপন করেছিলেন? যোগাযোগটি সরাসরি পাকিস্তান থেকে পরিচালিত হয়েছিল, নাকি মাঝখানে অন্য কোনও ব্যক্তি বা নেটওয়ার্ক ছিল?
উত্তর মিললেই হয়তো বোঝা যাবে, এটি নিছক ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঘটনা, নাকি শুরু থেকেই ছিল পরিকল্পিত গুপ্তচরবৃত্তির ছক।
সহকর্মীর ফোনেও ঢোকার চেষ্টা?
তদন্তে উঠে আসা আরও গুরুতর অভিযোগ হল, ধৃত অফিসার তাঁর এক সহকর্মীর মোবাইলে তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সফ্টওয়্যার ইনস্টল করেছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
পুলিশ খতিয়ে দেখছে, ওই সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে কোনও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল কি না। হয়ে থাকলে সেই তথ্য কোথায় গিয়েছিল, সেটিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অভিযোগটি সত্যি হলে মামলাটি আরও গভীর মাত্রা পাবে। কারণ তখন প্রশ্ন উঠবে, শুধু একজন অফিসারের কাছ থেকে তথ্য নেওয়াই লক্ষ্য ছিল, নাকি তাঁর মাধ্যমে আরও সামরিক কর্মীর ফোন ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঢোকার চেষ্টা চলছিল।
অর্থাৎ, একজনকে ফাঁদে ফেলে তাঁকেই বৃহত্তর গুপ্তচর নেটওয়ার্কের প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সেটিও এখন তদন্তকারীদের নজরে।
কী তথ্য বাইরে গেল?
ঠিক কোন ধরনের প্রতিরক্ষা তথ্য পাচার হয়েছে, তা এখনও প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় জড়িত থাকায় তদন্তকারীরাও এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভাবেই সতর্ক।
তবে অভিযুক্ত অফিসারের কাছে কোন স্তরের গোপন তথ্য পৌঁছনোর সুযোগ ছিল, তিনি কত দিন ধরে সেই দায়িত্বে ছিলেন এবং সেই সময়ে কোন কোন সংবেদনশীল তথ্য তাঁর নাগালে এসেছিল—সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সামরিক ঘাঁটি, মোতায়েন, কর্মী, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা কৌশলগত পরিকল্পনা সংক্রান্ত কোনও তথ্য বাইরে গিয়েছে কি না, তারও সন্ধান চলছে।
তদন্তকারীদের কাছে তাই শুধু ‘কী তথ্য পাচার হয়েছে’ প্রশ্নটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কত দিন ধরে, কার কাছে এবং কতটা তথ্য গিয়েছে—এই তিনটি প্রশ্নই সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা বোঝার চাবিকাঠি।
টাকার খোঁজেও তদন্ত
গুপ্তচরবৃত্তির মামলায় আর্থিক লেনদেনও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠতে পারে। সেই কারণেই অভিযুক্ত অফিসারের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং অন্যান্য আর্থিক কার্যকলাপ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তথ্য পাচারের বিনিময়ে তিনি কোনও অর্থ বা সুবিধা পেয়েছিলেন কি না, তারও সন্ধান চলছে।
তবে ‘হানি ট্র্যাপ’-এর ক্ষেত্রে টাকা সব সময় প্রধান অস্ত্র নয়। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আবেগ, আপত্তিকর ছবি বা কথোপকথন সামনে আনার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করার মতো কৌশলও ব্যবহার করা হতে পারে।
ফলে পুলিশের কাছে আর্থিক লেনদেনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত যোগাযোগের ধরনটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০১৮-র মামলার ছায়া
ভারতীয় বায়ুসেনাকে ঘিরে এমন অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১৮ সালে বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন অরুণ মারওয়াহাকে দিল্লি পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। তাঁর বিরুদ্ধেও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের কাছে সংবেদনশীল প্রতিরক্ষা তথ্য পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
সেই মামলায় তদন্তকারীদের দাবি ছিল, সমাজমাধ্যমে ভুয়ো মহিলা পরিচয় ব্যবহার করে মারওয়াহার সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা হয়েছিল। পরে সেই যোগাযোগ ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছয় এবং তার সুযোগ নিয়ে গোপন তথ্য সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
বর্তমান মামলাতেও যদি একই ধরনের কৌশলের প্রমাণ মেলে, তা হলে ভারতীয় সামরিক কর্মীদের নিশানা করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানি গুপ্তচর নেটওয়ার্কের পুরনো কৌশল নতুন করে সামনে আসবে।
গুপ্তচরবৃত্তি এখন পকেটের ভিতর
এক সময় গুপ্তচরবৃত্তি মানেই ছিল গোপন নথি চুরি, সামরিক ঘাঁটির ছবি তোলা কিংবা অর্থের বিনিময়ে কাউকে তথ্যদাতা বানানো। স্মার্টফোন ও সমাজমাধ্যম সেই ছবিটাই বদলে দিয়েছে।
একটি ফোনের মধ্যেই এখন থাকে যোগাযোগের তালিকা, ছবি, নথি, অবস্থান, ব্যক্তিগত কথোপকথন এবং পেশাগত যোগাযোগের বিপুল তথ্য। ফলে একজন সামরিক কর্মীর ফোনে ঢুকতে পারলে শুধু তাঁর তথ্যই নয়, তাঁর সঙ্গে যুক্ত আরও অনেক ব্যক্তির সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া সম্ভব।
এই কারণেই সহকর্মীর ফোনে সফ্টওয়্যার বসানোর অভিযোগটি তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’-এর গুরুত্ব
ধৃত অফিসারের বিরুদ্ধে ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’-এ মামলা হওয়ায় অভিযোগের গুরুত্ব স্পষ্ট। প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত গোপন তথ্য অননুমোদিত ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ এই আইনের আওতায় পড়তে পারে।
তবে তদন্তের এই পর্যায়ে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। পুলিশ যে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করছে, সেগুলি আদালতে যাচাই হওয়ার পরই অভিযোগের চূড়ান্ত আইনি পরিণতি নির্ধারিত হবে।
এক অফিসার, নাকি বড় জাল?
এখন তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—এই ঘটনা কি শুধু একজন বায়ুসেনা অফিসারকে ঘিরে, নাকি তাঁর মাধ্যমে ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আরও গভীরে পৌঁছনোর চেষ্টা হয়েছিল?
কার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল, সেই ব্যক্তিদের আসল পরিচয় কী, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, কতটা তথ্য বাইরে গিয়েছে এবং আরও কোনও সামরিক কর্মী একই চক্রের নিশানায় ছিলেন কি না—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
যদি দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি সত্যি হয়, তা হলে এটি আর শুধুই একটি ‘হানি ট্র্যাপ’-এর মামলা থাকবে না। এটি হয়ে উঠতে পারে ভারতীয় সামরিক কাঠামোয় ডিজিটাল অনুপ্রবেশ এবং তথ্য সংগ্রহের একটি পরিকল্পিত নেটওয়ার্কের তদন্ত।
তাই আপাতত পুলিশের নজর শুধু ধৃত উইং কমান্ডারের উপর আটকে নেই। তাঁর ফোন, ডিজিটাল পদচিহ্ন, আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগের তালিকা এবং সন্দেহভাজন বিদেশি যোগাযোগ—সবকিছুর সূত্র জুড়ে একটি বড় ছবিই খোঁজা হচ্ছে।
প্রশ্ন এখন একটাই—ফাঁদটি কোথায় পাতা হয়েছিল, আর তার সুতো শেষ পর্যন্ত কার হাতে গিয়ে মিশছে?