রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে ভারতের উপর মার্কিন চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হল। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা বিল বিপুল ভোটে পাশ হয়েছে মার্কিন সেনেটে। ৮৬-১১ ভোটে অনুমোদিত এই বিলের নতুন নাম ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’।
বিলটি আইনে পরিণত হলে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলির পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ক্ষমতা পাবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে রুশ তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা ভারতও এর আওতায় আসতে পারে।
তবে আপাতত একটি বিষয় স্পষ্ট—১০০ শতাংশ শুল্ক স্বয়ংক্রিয় ভাবে চাপবে না। আইন কার্যকর হলে শুল্ক বসানো হবে কি না এবং হলে কতটা, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে প্রেসিডেন্টের হাতে।
কেন চিন্তায় ভারত
চিনের পর ভারতই রুশ অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা। ফলে নতুন মার্কিন আইনের সম্ভাব্য প্রভাব ভারতের উপর পড়ার আশঙ্কা যথেষ্ট।
রুশ তেল কেনার কারণেই ২০২৫ সালের অগস্টে ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছিল ওয়াশিংটন। এর ফলে কিছু ভারতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে মোট মার্কিন শুল্ক ইতিমধ্যেই ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে।
নতুন আইনে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্কের পথ খুলে গেলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের উপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
বিলে কী আছে
নতুন আইনে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের পাঁচ বৃহৎ আমদানিকারক দেশ—চিন, ভারত, আজারবাইজান, হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া—থেকে আমদানি করা পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
শুধু রাশিয়াই নয়, ইরানকেও নিশানায় রাখা হয়েছে। ১৯৯৬ সালের ‘ইরান স্যাংশনস অ্যাক্ট’-এর মেয়াদ ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ক্রেমলিন-ঘনিষ্ঠ ধনকুবের, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধেও নতুন নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তবে বিলটি পাশ হলেই সবকিছু কার্যকর হয়ে যাবে না। সেনেটের অনুমোদনের পর এখনও প্রতিনিধি পরিষদের সিলমোহর প্রয়োজন। তার পরেই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের প্রশ্ন আসবে।
রুশ তেল ছাড়ছে না দিল্লি
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়ার উপর পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞা জারি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক কম দামে রুশ অপরিশোধিত তেল পাওয়া শুরু হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগায় ভারতের শোধনাগারগুলি।
কম দামে তেল পাওয়ায় ভারতের জ্বালানি খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে রুশ তেল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর সেই নির্ভরতাও আরও বেড়েছে।
মার্কিন চাপ সত্ত্বেও নয়াদিল্লি রুশ তেল কেনা বন্ধ করেনি। ২০২৬ সালের জুনে রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি ৩৪ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড স্তরে পৌঁছেছিল।
ভারতের অবস্থান বরাবরই এক—দেশের জাতীয় স্বার্থ ও জ্বালানি নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই তেল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন মার্কিন চাপ এলেও নয়াদিল্লি সেই যুক্তিই সামনে রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
আমেরিকাতেও আপত্তি
বিলটি বিপুল ভোটে পাশ হলেও এর শুল্ক-সংক্রান্ত অংশ নিয়ে আমেরিকার অন্দরেই প্রশ্ন উঠেছে।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য গ্রেগরি মিকস ও ডন বেয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই আইন ট্রাম্পকে অত্যন্ত ব্যাপক হারে শুল্ক বসানোর ক্ষমতা দিয়ে দিতে পারে। তাঁদের মতে, এতে রাশিয়ার উপর চাপ বাড়ার বদলে আমেরিকার অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সংঘাতই তীব্র হতে পারে। শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়তে পারে মার্কিন ভোক্তাদের উপরও।
রিপাবলিকান সেনেটর র্যান্ড পল এবং ডেমোক্র্যাট সেনেটর রন ওয়াইডেনও ১০০ শতাংশ শুল্কের প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, ভারতের উপর এমন চাপ তৈরি হলে ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লির কৌশলগত সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, অথচ ভারতের জ্বালানি নীতিতে বড় কোনও পরিবর্তন নাও আসতে পারে।
অন্য দিকে বিলের সমর্থকদের যুক্তি, রাশিয়ার অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করা দেশগুলির উপর চাপ না বাড়ালে মস্কোর উপর কার্যকর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা কঠিন।
এ বার প্রতিনিধি পরিষদের পালা
সেনেটে অনুমোদনের পর বিলটি এখন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সামনে যাবে। ৩১ অগস্ট অধিবেশন শুরু হলে সেখানে বিলটি বিবেচনা করার কথা রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদেও অনুমোদন পেলে সেটি যাবে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য।
এর মধ্যে চূড়ান্ত আইনে কিছু দেশের জন্য সীমিত ছাড় রাখা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। বিশেষ করে অল্প পরিমাণে রুশ গ্যাস আমদানি করা দেশগুলির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠেছে।
তাই ভারতের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ শুল্ক এখনই অবধারিত নয়। কিন্তু ৮৬-১১ ভোটে সেনেটে বিল পাশ হওয়া একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—রুশ তেল নিয়ে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির টানাপড়েন আপাতত কমছে না, বরং আরও জটিল হওয়ার পথে।